নারায়ণগঞ্জে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া হয় আদালতে এমনটাই জবানবন্দি দেন অভিযুক্ত ৩ আসামি। এ ঘটনার ৪৫ দিন পর ফিরে এসেছে সেই শিক্ষার্থী। গত রবিবার সেই শিক্ষার্থী (১৪) নিজেই নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় এসে হাজির হয়। দেড় মাস পর মেয়েকে জীবিত পেয়ে খুশিতে আত্মহারা তার মা-বাবা। তবে ‘ধর্ষণের পর হত্যার শিকার’ শিক্ষার্থীর এভাবে ফিরে আসা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। সে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।’ কিন্তু গ্রেপ্তার তিন যুবকের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ পাক্কারোড এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকের ছোট মেয়ে ওই শিক্ষার্থী। সে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। গত ৪ জুলাই থেকে সে নিখোঁজ হয়। ৬ আগস্ট তার বাবা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। তিনি মামলায় উল্লেখ করেন, এলাকার যুবক আব্দুল্লাহ তার মেয়েকে স্কুলে যাওয়া আসার পথে বিভিন্ন সময় প্রেমের প্রস্তাব দিত। এতে বাধা দিলে মেয়েকে অপহরণের হুমকি দেয়। গত ৪ জুলাই সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ ফোনে ঠিকানা দিলে তার মেয়ে সেই ঠিকানায় যায়। পরে তাকে গাড়ি দিয়ে অপহরণ করে আব্দুল্লাহ ও তার সহযোগীরা। এর পর থেকেই তার মেয়ের কোনো সন্ধান পায়নি তার পরিবার।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শামীম জানিয়েছেন, মেয়েটির মায়ের মোবাইলের কললিস্ট চেক করে রকিবের সন্ধান পায় পুলিশ। রকিবের মোবাইল নম্বর দিয়ে আব্দুল্লাহ সেই কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করত। ঘটনার দিনও ওই নম্বর দিয়ে কল করে আব্দুল্লাহ। এ ঘটনায় আব্দুল্লাহ (২২), রকিব (১৯) ও নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গত ৯ আগস্ট দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মিল্টন হোসেন ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ হুমায়ুন কবিরের পৃথক আদালতে গ্রেপ্তার তিনজনকে জবানবন্দি দেওয়ার জন্য হাজির করে পুলিশ। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনজন বলে কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে তারা।
এরপর গত রবিবার দুপুর আড়াইটার সময় বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকার একটি মোবাইল ফোনের দোকান থেকে কিশোরী তার মাকে ফোন করে জানায়- সে বেঁচে আছে, ভালো আছে। তবে কিছু টাকার প্রয়োজন। এমন কথায় টাকা পাঠিয়ে উল্লিখিত এলাকায় দোকানটিতে ছুটে যান কিশোরীর মা-বাবা। এছাড়াও এ অবিশ্বাস্য ঘটনায় মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামীম আল মামুনকে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর তার বাবা-মা ছুটে যান বন্দর থানাধীন নবীগঞ্জ এলাকার সেই মোবাইল ফোনের দোকানটিতে। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর মেয়েকে চোখের সামনে দেখে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা ও বাবা।
কিশোরীর মা বলেন, ‘আমি চাই না কোনো পরিবার এমন শাস্তিভোগ করুক। আমি আমার মেয়েকে একবার দেখার জন্য দেড় মাস ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। আমার মেয়ে কি আসলেই মরে গেছে না বেঁচে আছে। আসামিরা জবানবন্দি দিলেও আমার মেয়ের কোনো হদিস না পেয়ে হতাশায় ভুগছিলাম। আজ মেয়েকে পেয়ে আমি অনেক খুশি। আমি আমার মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চাই। আমি আর আদালতে দাঁড়াতে চাই না। থানায় এসে ঘুরতে চাই না।’
তিনি আরও বলেন, দারোগা শামীম মেয়েকে নিয়ে থানায় আসতে বললে আমরা সন্ধ্যার পর থানায় যাই।
কিশোরীর বাবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ বলেছিল আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নির্দোষ ৩ জনকে আটক করেছে তারা। কিন্তু এই দেড় মাসে আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু মেয়ে নিজে থেকেই আজ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে আমরা থানায় নিয়ে আসি।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামীম আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইকবাল ও কিশোরী একে অপরের পরিচিত ছিল। গ্রেপ্তার তিন আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিল। রবিবার কিশোরীর তথ্য মেলে, সে ইকবাল নামে এক যুবকের সঙ্গে ছিল। পুলিশ ইকবালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে।’
যদিও এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শামীম আল মামুন অভিযুক্তদের জবানবন্দি প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, কিশোরীর সঙ্গে আবদুল্লাহ তার বন্ধু ইজিবাইক চালক রকিবের মোবাইল দিয়ে ৩ মাস প্রেম করেছে। ঘটনার দিন ৪ জুলাই ঘোরাফেরার কথা বলে তাকে ইস্পাহানি ঘাটে ডেকে নেয় আবদুল্লাহ। এরপর বন্দরের বিভিন্ন স্থানে রকিবের ইজিবাইক দিয়ে ঘোরাফেরা করে। পরে রাত ৮টায় ইস্পাহানি ঘাটে এসে খলিলুর রহমানের নৌকায় উঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘুরতে থাকে। একপর্যায়ে নৌকার মধ্যেই আবদুল্লাহ প্রথমে কিশোরীকে ধর্ষণ করে। এরপর মাঝি খলিলুর রহমানও মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। এতে কিশোরী তর্কাতর্কি করলে ক্ষিপ্ত হয়ে খলিলুর রহমান আর আবদুল্লাহ গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। তারপর লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝখানে ফেলে দেয়।