খানকা হলো ফকিরের প্রার্থনাস্থল। যেখানে তিনি অনুসারীদের সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ও পরামর্শ দেন। এমনই একটি স্থান হলো ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের খানকা হাউজ, স্থানীয়ভাবে যেটি পীরের বাড়ি নামেও পরিচিত।
খুব সাধারণ, অথচ অনন্য এক স্থাপত্যকলার নিদর্শন বলা যায় একে। খানকার আধ্যাত্মিকতা আর আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের মূল সুরটি ধরে রেখেই এর নকশা করা হয়েছে।
এই পীর বাড়ির পেছনে একটি গল্প রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, গফরগাঁওয়ের এক ফকিরের সন্ধান পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ওই ফকিরের ভক্ত হন। তার জন্যই তিনি এই খানকা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। আর এর দায়িত্ব দেয়া হয় আর্কিগ্রাউন্ড লিমিটেডকে।
আর্কিগ্রাউন্ড লিমিটেডের প্রধান স্থাপত্যবিদ লুতফুল্লাহিল মজিদ এসব তথ্য দেশ রূপান্তরকে জানান।
দেশ রূপান্তরের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে ওই ফকির বাবার পরিচয় হয় সিলেটে। শামীম ওসমান সাংবাদিকদের কাছে বিভিন্ন সময় তার গল্প করেছেন। সোমবার পারিবারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় খানকা বা পীরের বাড়ি বিষয়ে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থাপত্যবিদ লুতফুল্লাহিল মজিদ বলেন, স্থানটির ভাবগাম্ভীর্য কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানানসই করে ভবনটি নির্মাণ করতে এখানে খুব আলংকারিক কিংবা বড় ধরনের কোন নকশা রাখা হয়নি। প্রায় ৩৬০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে খানকা। এর পুব দিকে রাস্তা, আর উত্তর-পশ্চিমে ধান খেত দিয়ে ঘেরা। বর্ষায় এই ধানখেত আবার পানি জমে পরিণত হয় জলাভূমিতে।
তিনি বলেন, প্রকৃতির এই জটিল সমন্বয়কে ধরে রেখেই তৈরি করা হয়েছে পীরের জন্য বাসভবন, নামাজঘর, আর পীরের জন্য আগাম তৈরি করা কবর, বা মাজার। নামাজঘরেই মুরিদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পীর। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের আবাসস্থলের সঙ্গেই এমন একটি গণজমায়েতের স্থান তৈরি করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল স্থাপত্যবিদদের।
তিনি জানান, অনেকটা গ্রামের বাংলাঘরের আদলে, সাশ্রয়ী গ্রামীণ স্থাপত্যকলার অনুসরণেই এটি নির্মাণ করেন তারা। দুটি উঠান আছে, একটি বাইরের লোকদের জন্য, আরেকটা পরিবারের মানুষদের ব্যবহারের জন্য, ভেতরের দিকে। উত্তর-পশ্চিম কোনায় ছিদ্র ছিদ্র ইটের দেয়াল তৈরি করে আরেকটি উঠানের মতো অংশ রাখা হয়েছে, যেটা আসলে রান্নাঘর হিসেবেই ব্যবহার হয়। গ্রামের ঐতিহ্য মেনে, টয়লেট তৈরি করা হয়েছে মূল ভবন থেকে দূরে, আলাদাভাবে।
লুতফুল্লাহিল মজিদ বলেন, ভবন নির্মাণে স্থানীয়ভাবে তৈরি ইটই ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাণকাজেও স্থানীয় শ্রমিকদেরই নিয়োগ দিয়েছে আর্কিগ্রাউন্ড। ঘর, নামাজঘর আর ঢালাই করা ছাদে মেটাল ফ্রেম আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিট ব্যবহার করা হয়েছে। স্যান্ডউইচ সিলিং প্যানেলটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো, মেটাল ফ্রেমের পাশাপাশি নারকেলের ছোবড়া আর ফেরো সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এটি। মেঝেতেও ইট ব্যবহার করা হয়েছে৷ ভবনের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ক্ষেত্রেও মেটাল ফ্রেম আর মেহগনি কাঠের সরল আর সাধারণ আসবাব তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যখন আমরা এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করি, তখন আমরা এমন সব উপাদান ব্যবহারের কথা ভেবেছিলাম যেগুলো প্রকৃতির সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়। পরিবেশের ওপর যত কম হস্তক্ষেপ করা যায়, সে বিষয়টিই আমার মাথায় ছিল।
ইসলামি ঐতিহ্য মেনে নির্মিত খিলান, জালি কাটা ইটের দেয়াল, দেয়ালে বাঁধানো কাঠের ফ্রেমে আঁকা ক্যালিগ্রাফি, সব মিলে গফরগাঁওয়ের এই পীরবাড়ি এলাকার মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে প্রার্থনা, ইসলামি ভ্রাতৃত্বের চর্চা আর বিশ্রামের এক পবিত্র স্থানে।