বিশ্বে গরিবের নাগালের বাইরে করোনার টিকা

চলতি সপ্তাহকে মহামারী প্রতিরোধী উদ্যোগের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। কারণ, এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনটি ওষুধ কোম্পানির করোনা টিকা ৯০ শতাংশের বেশি সফল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বুধবারের ঘোষণায় চীনের টিকাকেও সফল বলা হচ্ছে। যে টিকাগুলোকে সফল বলা হচ্ছে, সেগুলোর গণউৎপাদনও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এই উৎপাদিত টিকার পুরোটাই যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফলে বিশ্বের গরিব দেশগুলো কবে নাগাদ টিকা পাবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ধনী দেশগুলো টিকা আবিষ্কার হওয়ার আগেই বিভিন্ন প্রকল্প মারফত ২০২১ সালের মধ্যে টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার এবং বায়োটেক তাদের উৎপাদিত টিকার প্রথম চালান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বের করবে। আর এই প্রথম চালান যাবে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি রাজ্যে। ওষুধ এজেন্সিগুলো ইতিমধ্যেই জনগণকে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী বছর নাগাদ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডোজ টিকা প্রস্তুত হবে।

তৃতীয় ট্রায়ালে যে কয়েক হাজার রোগীর শরীরে টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে, তাদের শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। করোনায় আক্রান্ত একজন ব্যক্তির শরীরে ফাইজারের দুই ডোজ টিকা দিতে হবে। আর প্রতি ডোজ টিকার দাম ৪০ ডলার। দামের কারণেও অনেক গরিব দেশ এই টিকা ব্যবহার করতে পারবে না। অক্সফোর্ডের নুফিল্ড ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিনের দ্য গ্লোবাল হেলথ নেটওয়ার্কের প্রধান ট্রুডি ল্যাং এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের যদি শুধু ফাইজারের টিকাই একমাত্র সমাধান হয়ে থাকে, তাহলে এটা সত্যিই নৈতিক উভয় সংকটের জন্ম দেবে।’

অনুমোদিত যেকোনো করোনা টিকার সামঞ্জস্যপূর্ণ বিতরণ নিশ্চিতে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্স গঠন করেছে। এই সংস্থার অধীনে বিশ্বের সরকারগুলো, বিজ্ঞানীরা, সিভিল সোসাইটি এবং বেসরকারি খাত রয়েছে। তবে ফাইজার কিন্তু এই সংস্থার আওতায় নেই। কোম্পানিটির এক মুখপাত্র অবশ্য জানান, সবার জন্য টিকার সম্ভাব্য সরবরাহ নিশ্চিতে কাজ করার আগ্রহ আছে ফাইজারের।

সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের নীতিনির্ধারক র‌্যাচেল সিলভারম্যানের মতে, টিকার প্রথম ব্যাচ দরিদ্র দেশগুলোতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, শুরুর সব টিকাই অগ্রিম ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় বিক্রি হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডোজ টিকা কিনে নিয়েছে ধনী দেশগুলো। জাপান ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশ আগেই টিকার অর্ডার দিয়ে রেখেছে কোভ্যাক্সের আওতায়। কোভ্যাক্সের আওতায় টিকা সরবরাহ করা হলে কিছু উন্নয়নশীল দেশ হয়তো টিকা পেতে পারে। ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র ৬০০ মিলিয়ন ডোজের অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রেখেছে। তবে আশা করা যায়, বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতা নেওয়ার পর নীতির কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।

গরিব দেশগুলো যদি কোনো মতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতেও সক্ষম হয়, তবুও টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি অনিশ্চিত। আর এর কারণ অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। যেমন ফাইজারের আরএনএভিত্তিক টিকা যে অবস্থায় সংরক্ষণ করতে হয় সেই সুবিধা অনেক দরিদ্র দেশেরই নেই। ফাইজারের টিকা অবশ্যই মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে, তা না হলে টিকা নষ্ট হয়ে যাবে। দরিদ্র দেশগুলোর অধিকাংশ হাসপাতালেই টিকা সংরক্ষণে যে সুবিধা আছে তা মাত্র মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার।