মার্চে উদ্বোধন রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প

কক্সবাজার বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কার্যাদেশ পেয়েছে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশান কোং (সিসিইসিসি)। গতকাল রবিবার দুপুরে চূড়ান্ত কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান। এর মধ্যদিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা শেষে চূড়ান্ত রূপরেখা পেতে যাচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দর।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নোটিফিকেশন এওয়ার্ড (এনএ) দেবে সিসিইসিসি। পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে বেবিচক ও সিসিইসিসির মধ্যকার চুক্তি (পারফরম্যান্স গ্যারান্টি) সম্পন্ন করার কথা। এ দুটি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মার্চের মাঝামাঝি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে মার্চে গ্রাউন্ড ব্রেকিং উদ্বোধন এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষে রানওয়ে সুপরিসর বিমান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী বারবার এ বিমানবন্দরকে রিজিওনাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তার স্বপ্ন থেকেই এটিকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নির্মাণকাজ করা হবে। আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শুরু ও শেষ করা সম্ভব হবে। অতীতে এ নিয়ে যাই ঘটুক না কেন এখন আর পেছনে ফেরার অবকাশ নেই।’

বেবিচকের সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলোর অগ্রাধিকার মেগাপ্রকল্পের মতো সব প্রক্রিয়া শেষে প্রায় ১৫শ’ কোটি ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকার কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প ক্রয় কমিটিতে ঠাঁই পায়। প্রকল্পের আওতায় প্রথমবারের মতো সমুদ্রের ভেতরে ব্লক দিয়ে রানওয়ে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে সমুদ্রের নীলাভ জলরাশি ভেদ করে কক্সবাজারে অবতরণ করবে এ-৩৮০-এর মতো বিশালাকৃতির উড়োজাহাজ।

অগ্রাধিকার প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও এটি বারবার হোঁচট খেয়েছে। দরপত্র প্রতিযোগিতায় স্বার্থান্বেষী মহল কাজ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একটি গোষ্ঠীর তুচ্ছ অজুহাতের কারণে প্রথম দফায় দরপত্র সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। এবার বেবিচক ও মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। ফলে গত ২৯ ডিসেম্বর সব প্রক্রিয়া শেষে সরকারের ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে ঠিকাদার কোম্পানি হিসেবে অনুমোদন পায় সিসিইসিসি।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী বলেন, ‘দেশের প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারে একটি যুগোপযোগী বিমানবন্দর করার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম অগ্রাধিকার এ প্রকল্পের অধীনে একটি অত্যাধুনিক রানওয়ে নির্মাণ করা হবে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে যাতে কাজ শেষ করা যায়, সেজন্য সবাইকে কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দফার কাজ প্রায় শেষের পথে। আগামী মাসের মধ্যে ইনস্ট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম ইনস্টলে দ্রুত কাজ করা হচ্ছে। এটি হলে দিবারাত্রি উড়োজাহাজ ওঠা-নামার জন্য বিমানবন্দর উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’

বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মালেক বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার জন্য নিজের স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেন। তার আগ্রহ ও নির্দেশনায় প্রকল্পটি গুরুত্ব সহকারে করা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প দুই ভাগ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম পর্যায়ের সম্প্রসারণ কাজ শেষ হয়েছে, যা উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। যদিও স্থানীয় বসতভিটা উচ্ছেদসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছুটা সময় লাগছে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের অত্যাধুনিক রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার কার্যাদেশ আজ (গতকাল) হয়েছে।’

বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, কক্সবাজার বিমানবন্দরে বর্তমানে ৯ হাজার ফুট রানওয়ে রয়েছে। এটিকে মহেশখালী চ্যানেলের দিকে আরও ১ হাজার ৭০০ ফুট বাড়িয়ে মোট ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হচ্ছে। বর্ধিত রানওয়ের ১৩শ’ ফুটই থাকবে সাগরের পানির নিচে। দেশে প্রথমবারের মতো সমুদ্রের ভেতরে ব্লক তৈরি করে রানওয়ে নির্মাণ হচ্ছে। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে অত্যাধুনিক এজিএল পদ্ধতিতে রানওয়ে করা হবে, যাতে অন্ধকারে উড়োজাহাড় উড্ডয়ন-অবতরণের সময় নৈসর্গিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এজন্য বিমানবন্দরের নির্মাণশৈলীও মনোমুগ্ধকর করা হয়েছে। এয়ার ফিল্ড লাইটিং সিস্টেমে সমুদ্রের জলাবদ্ধতা রক্ষা, সমুদ্র পুনরুদ্ধার, নমনীয় ফুটপাথ, যথাযথ আলোক ব্যবস্থাসহ দৃষ্টিনন্দন বস্তুর সমাহার ঘটানো হবে।

জানা যায়, কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রথম দফা প্রকল্পে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার ফুটে উন্নীত করা এবং সমুদ্রের ভেতর বাতিঘরের মতো নান্দনিক কিছু কাজ করার কথা ছিল। প্রথমপর্বের কাজের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য ২০১৯ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বেবিচক। এতে শর্ত দেওয়া হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর রানওয়ে নির্মাণের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে। এ দরপত্র সরকারের ক্রয় কমিটিতে অনুমোদন না পাওয়ায় বাতিল করে দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় ৭টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সান ইঞ্জিনিয়ারিং, লটি এএমএল জেভি, এইচডি এনডিই জেভি, সিএইচইসি মির আখতার জেভি, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কো, সিওয়াইডব্লিউবি-সিসিইসিসি জেভি ও সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। এদের মধ্যে শেষের দুটি প্রযুক্তিগত মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হলেও আর্থিক প্রস্তাবে টিকে যায় সিসিইসিসি।