চড়া দামে সার, ডিলারের হাতে জিম্মি কৃষক

পঞ্চগড়ে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন ডিলাররা। এমনকি নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিচ্ছেন তারা। আর নিরুপায় কৃষকরা অতিরিক্ত দাম দিয়েই সার কিনে জমিতে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে সার দিচ্ছেন না ডিলাররা। চাষিদের অভিযোগ, ডিলাররা নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে সার সংকটের ধুয়ো তুলে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন।

তারা আরও বলছেন, ডিলারদের ওই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন পঞ্চগড় চেম্বারের সাবেক সভাপতি এবং বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক আবদুল হান্নান শেখ। সার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষকের কষ্টের টাকা খোয়া গেলেও পকেট ভরছে ডিলারদের। প্রায় এক মাস ধরে এ অবস্থা চললেও স্থানীয় কৃষি বিভাগকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

গত ২৪ জানুয়ারি কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ সফরে এলে কৃষকরা তার কাছে সারের দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেন। মন্ত্রী জবাবে বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থার আশ্বাস দেন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ভরা বোরো মৌসুমে এ অবস্থা চলছে।

সরেজমিন দেখা যায়, দিনক্ষণ অনুযায়ী এখন উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলি জমিতে চলছে চাষাবাদের প্রস্তুতি। আলু, টমেটো, গম, ভুট্টা ও মরিচসহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষাবাদের জন্য জমি তৈরি করছেন চাষিরা। ঠিক এ সময়ে হঠাৎই ডিলাররা সব ধরনের সারের দাম বাড়িয়ে দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারের সরকার নির্ধারিত মূল্য হলো ইউরিয়া প্রতি বস্তা ৮০০ টাকা, এমওপি প্রতি বস্তা ৭৫০, ড্যাপ প্রতি বস্তা ৮০০ এবং টিএসপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ১০০ টাকা।চাষিদের অভিযোগ, ডিলাররা বস্তা প্রতি ইউরিয়ায় ১০০, এমওপি ২০০, ড্যাপ ১০০ এবং টিএসপি প্রকারভেদে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। কৌশলগত কারণে ক্রেতাদের আবার সরকার নির্ধারিত মূল্যই বিক্রিয় রসিদে লিখে দিচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তার কাছে সার বিক্রি করছেন না তারা। দোকানে অল্প কিছু সার প্রদর্শনীর জন্য রাখলেও বেশিরভাগ ডিলার তাদের গুদাম থেকে গোপনে সার বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ কৃষকদের।

জানা যায়, ওই সার সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন পঞ্চগড় চেম্বারের সাবেক সভাপতি এবং বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক আবদুল হান্নান শেখ। জেলায় বিএডিসির ১৬০ এবং বিসিআইসির ৪৭ জন ডিলার থাকলেও সার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন এই হান্নান শেখসহ অল্প কয়েকজন ডিলার। অনেক ডিলারের নামে তারা সার তুলে বিক্রি করে থাকেন। বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা আদায় করে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে মুনাফা করছেন তারা। নিরুপায় কৃষকরা তাদের কষ্টের টাকা দিয়ে অতিরিক্ত দামেই সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেক কৃষক জানেনই না সারের সরকারি দর। প্রায় এক মাস ধরে ডিলাররা চাষিদের এভাবে হয়রানি করলেও স্থানীয় কৃষি বিভাগের কোনো নজরদারি দেখা যায়নি। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা একাধিকবার কৃষি বিভাগের উপপরিচালককে বিষয়টি জানালেও তিনি দায়সারাভাবেই এড়িয়ে গেছেন বারবার।

চাষিরা অভিযোগ করে বলেন, সারের কোনো দোকানেই মূল্য তালিকা ঝোলানো নেই। তারা যেমন দাম চায়, সেই দামেই কিনতে হয়। অতিরিক্ত দাম নিলেও কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। সবসময় কৃষকরাই ঠকে থাকেন। কৃষকদের পকেট কেটে লাখ লাখ টাকা মুনাফা করছেন ডিলাররা। আর এটা যেন দেখার কেউ নেই। প্রত্যেকটা সারেই ডিলাররা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছেন টিএসপি সারে। টিএসপি (তিউনেশিয়া) সারের সরকারি মূল্য প্রতি বস্তা ১ হাজার ১০০ টাকা হলেও কৃষকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকা করে। ডিলাররা এই সারের সংকটের অজুহাতে বেশি দাম নিচ্ছেন। কৃষকরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

সারের বাড়তি দামে ক্ষোভ প্রকাশ করে পঞ্চগড় সদর উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার কিনতে পারলে আমরা চাষাবাদ করে সুবিধা পাইতাম। ডিলাররা তাদের ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে। সব ডিলার মিলে দিনদুপুরে এমন ডাকাতি করলেও কেউ বিষয়টি দেখছে না।’

তবে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুল হান্নান শেখ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই। সারেরও কোনো সংকট নেই। আমরা সরকার নির্ধারিত দরেই সার বিক্রি করছি। আমাদের কাছ থেকে কিনে হাতবদল হয়ে ছোট ব্যবসায়ীরা বেশি দামে বিক্রি করছে। তবে টিএসপির একটু চাহিদা বেশি।’ আর পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এমনটা হওয়ার কথা নয়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক ড. সাবিনা ইয়াসমিন বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়টি শুনেছেন জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার কানেও এসেছে। আমি সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছি। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’

পঞ্চগড় জেলায় চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ২৭৭ মেট্রিক টন টিএসপি, ৮ হাজার ৮৫৩ মেট্রিক টন ডিএপি, ১৪ হাজার ৩২৫ মেট্রিক টন এমওপি এবং ৩৯ হাজার ৯৮২ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা জেলার ৪৭ জন বিসিআইসি ডিলার এবং ১৬০ জন বিএডিসির ডিলারের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে।