বই রিভিউ

গুহার বাস্তবতায় আলোকপাত

কথাসাহিত্যিক সিরাজুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পূর্বপরিচয় আছে। তাই ভেবেছিলাম ‘গুহা’ উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে একটি পরিচিত গল্প-আবহ ও কথনভঙ্গি পাব। তবে পাঠের গভীরে যেতে যেতে পষ্ট হয়ে উঠল যে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের একটি গভীর সমাজ সমীক্ষা পেতে চলেছি।

সুশীল বাবুদের ঘরবারান্দায় পাকিস্তানি মিলিটারিদের হাতে খুন হয়ে যাওয়া পিতার লাশের পাশে বসা উপন্যাসের মূল চরিত্র মশিউলের আত্মসন্দর্শনের টুইস্টটি হতেই ধারণাটি পোক্ত হতে শুরু করেছিল। তারপর গল্প এগিয়েছে টানটান টার্ন এবং টুইস্টের মাধ্যমে। উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের অতিপরিচিত ও বহু লিখিত ক্লিশে ঘরানা ছাড়িয়ে একেবারেই অন্যরকম সমাজপাঠ হতে পেরেছে নিশ্চিত।

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করা যুবকদের যেমন সংগ্রাম ছিল, যোগদান করতে না পারা অসংখ্য যুবকদেরও অন্যরকম অনন্য সংগ্রাম ছিল। এই সংগ্রাম অন্ত্যজ শ্রেণির সম্ভাবনাময় যুবকদের ক্ষেত্রে আরও জটিল রূপ নিয়েছিল। যে সকল যুবকের সামনে ছিল হতদরিদ্র ও অসম্মানময় গ্লানিকর জীবন-অভিজ্ঞতা ছাড়িয়ে একটি সচ্ছল ও সম্মানজনক ভবিষ্যতের প্রত্যাশার হাতছানি— তাদের বেলায় এই টানাপোড়েন নিঃসন্দেহে অনেক তীব্র ছিল।

লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম, আবার পরিবার ও স্বজনের প্রতি দায়িত্ববোধ কোনোটিই তাদের অ-আরাধ্য ছিল না। ভালোবাসা পাবার উদগ্র কামনাও তাদের চলার পথের শক্তি জোগাত। ক্ষণে প্রতিক্রিয়াশীলতা, ক্ষণে আত্মবিসর্জন, ক্ষণে চলতি হাওয়ার পন্থী হয়ে পড়া সকলই আসলে অন্ত্যজ শ্রেণির টিকে থাকার কৌশল মাত্র। সংবেদনশীল সাহিত্যকর্মীরাই শুধু এই সত্যের গুহায় আলো ফেলতে পারেন। যেমনটি পেরেছেন কথাসাহিত্যিক সিরাজুল ইসলাম।

গল্পের মূল চরিত্র মশিউল। ফকির চান নামের হতদরিদ্র কাঠমিস্ত্রি বাবার সন্তান। পিতা ও মাতার নিত্যদিনের কলহে মায়ের যেচে মার খাবার দৃশ্য দেখে এসেছে সে। ফলে নিজের অন্ত্যজ পারিবারিক পরিচয়ের ওপর প্রচ্ছন্ন ঘৃণা ও নিরাসক্তি দুই-ই আছে। কিন্তু সে মেধাবী। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বৃত্তিধারী। উচ্চাভিলাষ আছে। হলে থাকে। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও সে এই সময়ে তার করণীয় নিয়ে দ্বিধান্বিত থাকে। তার ভবিষ্যৎ-ভাবনাও অস্পষ্ট। রাজনীতি-সচেতনতাও একেবারেই প্রাথমিক স্তরের।

কিন্তু সুশীল বাবুরা কলকাতা চলে গেলে বাড়িটির দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা ফকির চান মিলিটারির হাতে খুন হলে খুলতে শুরু করে অন্য এক মশিউল। সংসার বা সমাজযুদ্ধ কিছুই এড়িয়ে যায় না সে। লাশটি সরায় না, শেষকৃত্য করে না, যাতে পুরো মহল্লাবাসী নিরাপদ থাকে। মিথ্যা অভিনয় দিয়ে খাবার-বাজার জোগাড়ও করে যা তার স্বভাবসুলভ নয়। নিজের মধ্যে মারমুখী বাবার স্বভাবের আগমন দেখে আনন্দ পায়। আবার মা ও ছোট বোনের নিরাপত্তার প্রয়োজনে নিজে উপযাচক হয়ে মা’র বিয়ের ব্যবস্থাও করে দেয় সচ্ছল বদি মহাজনের সঙ্গে।

সম্পত্তির লোভে শ্যালক বশির হানাদার সেনাদের সহযোগী হয়ে বদি মহাজনকে বাধ্য করে মশিউলের মাকে তালাক দিতে। ফের মা ও ছোট বোনের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে মাকে গৃহকর্মীর কাজে লাগিয়ে দেয় বনেদি পরিবারে। সেই ধনাঢ্য পরিবারের একটি কন্যাকে দূর হতে দেখেই প্রেমে পড়ে, কল্পনার জাল বোনে, কিন্তু বাস্তবতা বিস্মৃত হয় না মোটেই। একসময় না জেনেই সহোদর জয়নুলের বন্ধুদের আশ্রয় দেয় সুশীল বাবুর পরিত্যক্ত ঘরে। জানে না তার ভাই জয়নুলও এই দলে ভিড়েছে। আবার সব কূল রক্ষা করতে গিয়ে বদি মহাজনের মাধ্যমে হানাদারদের হাতে তাদের ধরিয়েও দেয়। মুক্তিযোদ্ধার দলটি জীবিত ধরা দেয় না। যুদ্ধ করেই মরে।

শুধু এই আঙ্গিকে দেখলে অবশ্য উপন্যাসটির প্রতি সুবিচার করা হয় না। অন্ত্যজ শ্রেণির একজন সম্ভাবনাময় যুবকের আত্মপরিচয় নির্মাণের যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ একাকার হয়ে ওঠার চমৎকার দৃশ্যকল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে উপন্যাসটির সমস্ত শরীরে। মশিউলের অ্যাভাটার বা প্রতিরূপ হয়ে হয়ে উপন্যাসে এসেছে মশিউলেরই স্বনির্মিত একটি ভূত চরিত্র। তার সঙ্গে আলাপচারিতা আসলে মশিউলের নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া। ঘরে-বাইরে কী ঘটছে তার সুনিপুণ বিশ্লেষণ যা সে অন্য কোনোভাবেই করার সুযোগ পায় না।

উপন্যাসে মিনি, ঝিনুক, দেলোয়ার, শামসুদ্দীন, গণি ভাই, জয়নুল প্রতিটি চরিত্রের উপস্থিতি অত্যন্ত পরিমিত ও বাস্তবানুগ।

গুহা একটি সমাজ সমীক্ষণধর্মী সুপাঠ্য উপন্যাস। আশা করি উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয় হবে।

লেখক: হেলাল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক; সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোসিওলজি. নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি