ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিন দিনের হেফাজতের তান্ডবের ঘটনায় একের পর এক মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৪৮টি মামলায় ২৮৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩৫ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযান চালিয়ে এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৫ জনকে। তবে মামলায় এখনো পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, কোনো মামলায় তাদের নাম উল্লেখ করেও করা হয়নি আসামি।
এদিকে এই ঘটনায় হেফাজতের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়া এবং সংগঠনটির নেতাদের ‘মিথ্যাচারের’ বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা ছাত্রলীগ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনটির জেলা শাখার ভাষ্য, হেফাজতের কেউ তান্ডবে জড়িত নয়এ বক্তব্য নিছক মিথ্যাচার ও অপরাজনীতি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২৬ মার্চের শহরজুড়ে তান্ডব, ২৭ মার্চ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, হামলা এবং এর আগে-পরের ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ৪৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত ২৮৮ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩৫ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৪ দিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাত্র ৫৫ জনকে।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইও-১ পরিদর্শক ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের সহিংসতার ঘটনায় মোট ৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় ৪৩টি, আশুগঞ্জ থানায় ৩টি ও সরাইল থানায় ২টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ২৮৮ জনসহ অজ্ঞাতনামা ৩৫ হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ মার্চের পর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৫ জনকে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) রইছ উদ্দিন জানান, স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এসব আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের ধরতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদের অনেকেই এখন পলাতক। ভিডিও ফুটেজগুলো দেখে অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা করছি। আসামিদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন : গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেলের সভাপতিত্বে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন শোভন। লিখিত বক্তব্যে শোভন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তান্ডব নিয়ে হেফাজতে ইসলাম মিথ্যাচার করেছে। হেফাজত নেতারা ঘটনার শুরু থেকেই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। হেফাজতের কেউ তান্ডবে জড়িত নয়আমরা তাদের এ বক্তব্যকে নিছক মিথ্যাচার ও অপরাজনীতি বলে মনে করি। তিনি বলেন, ২৬ থেকে ২৮ মার্চের সকল তান্ডবের ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। হেফাজতের হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র আমাদের সবার কাছেই আছে।
এ সময় ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল হেফাজতের চালানো তান্ডবের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। তিনি মিথ্যাচার করায় হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেন। যদি ক্ষমা না চাওয়া হয়, তাহলে সংগঠনটির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহিতার আইনে মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক যোবায়ের মাহমুদ শাবণ, জেলা ছাত্রলীগ নেতা আবদুল আজিজ অনিক, রুহুল আমিন আফ্রিদি, রাসেল আহমেদ, মনজুর মাওলা ফারানিসহ জেলা ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
খোলা আকাশের নিচেই দায়িত্ব নিল নতুন পৌর পরিষদ : পোড়া গন্ধ আর ছাইয়ের ওপর দাঁড়িয়েই পৌরবাসীর সেবার দায়িত্ব নিতে হলো নতুন পৌর পরিষদকে। করা হলো নতুন পৌর পরিষদের প্রথম সভা। গত বৃহস্পতিবার হেফাজতের ধ্বংসলীলায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই দায়িত্ব নিতে গিয়ে অনেকে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তান্ডবের নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তোলেন তারা। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার পৌর পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠান খোলা আকাশের নিচে হচ্ছে, এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসে জমায়েত হয়। তারাও হেফাজতি তান্ডবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরবভন ধ্বংসের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানান।
গত ২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালের দিনে অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পৌরসভা কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসময় পুড়িয়ে দেওয়া হয় সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনটিও। এতে পৌরসভার শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত চিঠি ও প্রেস ব্রিফিংয়ে দাবি করে পৌর কর্র্তৃপক্ষ।
দ্বিতীয়বারের মতো পৌর মেয়রের দায়িত্ব নিয়ে পৌর মেয়র নায়ার কবির বলেন, দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠান আনন্দের হলেও এটি নস্যাৎ করে দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম নামের ধর্ম ব্যবসায়ীরা। তারা গানপাউডারের মাধ্যমে অগ্নিসংযোগ করে ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভাটিকে প্রাণহীন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। সব নথিপত্র, রেকর্ড ও দেড়শ বছরের ঐতিহ্যকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পৌর ভবনের মতো একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে এভাবে ভস্মীভূত করে দেবেএটা কখনো ভাবা যায় না।’
তিনি বলেন, হেফাজতের তান্ডবের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে পৌর নাগরিকরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেজন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে নাগরিক সেবা চালুর চেষ্টা চলছে।