কথায় আছে, ‘পানিই জীবন, পানিই মরণ।’ সেই পানি নিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের মানুষ। অভিন্ন ৫৪ নদীর উৎসমুখ চীন, ভারত ও নেপাল। ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় তিস্তাসহ অন্যান্য নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানির বড়ই অভাব। সেচভিত্তিক চাষাবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রক পানি এখন আর নদী-নালা-খাল-বিল দিয়ে পূরণ হয় না। একমাত্র ভরসা ভূগর্ভস্থ পানি। ফলে ভূগর্ভে পানিশূন্যতা, নদীর পানিতে লবণাক্ততায় দিন দিন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার সূতিকাগার এখন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা। কারণ সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে উত্তরাঞ্চল এখন ধান, গম উৎপাদনে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। উত্তরাঞ্চলের উৎপাদিত ধানে দেশের মোট চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হয়ে আসছে। সেই উত্তরাঞ্চল এখন পানির অভাবে মরুকরণের দিকেই যাচ্ছে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদী শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদী মানুষ এখন হেঁটেই পাড়ি দেয়। নদীতে পানি না থাকায় দুচোখ যে দিকে যায়, দেখা যায় ধূ-ধূ বালুচর। এমনকি এখন এসব নদীর বুকে নানা জাতের ফসলেরও চাষাবাদ হয়।
বছরে বোরো ও আমন দুই মৌসুমেই ধানের বেশি চাষাবাদ হয়। মূলত বোরো ধানের চাষাবাদই মুখ্য। বোরো মৌসুমে সেচভিত্তিক উচ্চফলনশীল জাতের ধান আবাদ হয়ে থাকে। ফলে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য নদীর পানি, বৃষ্টির পানির বড়ই প্রয়োজন। দুর্ভাগ্য, শুষ্ক মৌসুমে সেচের সময় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মায় পানি থাকে না। বৃষ্টিরও দেখা মেলে না। ফলে চৈত্রের খরতাপে বোরো ধানের ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে যায়। ফলে কৃষকেরও চিন্তার শেষ নেই! এরই মধ্যে তিস্তা নদী উজানের ঢলে যৌবন ফিরে পেয়েছে। এখন তিস্তায় টইটম্বুর পানি। প্রাণ ফিরেছে ধানচাষিদের। জেলেরা মহাখুশি। ভরা তিস্তায় মাছ ধরছেন জেলেরা, মাছও পাওয়া যাচ্ছে প্রচুর। সেখানে জেলেদের খুশি থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তিস্তা ব্যারেজ সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে উজান থেকে প্রচুর পানি এসেছে। ফলে তিস্তায় এখন ১৮ হাজার কিউসেকের বেশি পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অথচ এর আগে তিস্তায় পানিপ্রবাহ ছিল মাত্র ১ হাজার ৪০০ কিউসেক। গত ১ এপ্রিল তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল ৪৯ দশমিক ৭০ মিটার, যা এখন ৫১ দশমিক ৩৫ মিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় পানির অভাবে তিস্তা সেচ প্রকল্পের অবস্থা ছিল নাজুক। দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা। এই তিস্তা ব্যারেজের কমান্ড এলাকার নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুরের ১২ উপজেলায় ৬৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়। উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতায় সেচকার্যক্রম ঠিকঠাকমতো চালানো অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। অথচ মৌসুমের শেষ সময়ে এসে সেচ ক্যানেলগুলো পানিতে ভরে গেছে। তবে বোরোর শেষ সময়ে হলেও এ পানি দিয়ে ভালোভাবে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষকরা এখন বেজায় খুশি!
মূলত তিস্তা ব্যারেজের ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা ব্যারেজ প্রকল্প নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। ফলে প্রতি বছরই সেচ মৌসুমে তিস্তা সেচ প্রকল্পে পানির কহর পড়ে। এ বছরের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এ বছর চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে গজলডোবা জলকপাট খুলে দেওয়ায় হুহু করে আসছে উজানের পানি। ফলে যৌবন ফিরে এসেছে তিস্তা নদীর। এজন্য তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের অতীব জরুরি। আমাদের ছোট্ট ভূখণ্ডের বাংলাদেশ। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়তই কমে আসছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ। বসতবাড়ি, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অথচ মানুষ বাড়ছে হুহু করে। আবার ভৌগোলিক সীমারেখাও কার্যত স্থির। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ভৌগোলিকভাবে এক বিশাল ভূখণ্ডের মালিক। ভারত বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। ভারতের মোট আয়তন ৩২ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ বর্গকিলোমিটার। ভারত ৩৬টি প্রদেশ নিয়ে গঠিত। আর বাংলাদেশের আয়তন মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার বা ৫৪ হাজার বর্গ মাইল, যা আয়তনের ভিত্তিতে বিশ্বের ৯০তম অবস্থানে। সেই উজানের দেশ ভারত যদি পানি আটকে রাখে, তাহলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি চাষাবাদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ঠিকঠাকমতো রক্ষা করতে পারবে না। এজন্য বাংলাদেশের মানুষের দাবি, ভারত যেন তিস্তার পানি চুক্তি করে তিস্তার ন্যায্য হিস্যা ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ভারতে সরকার আসে, সরকার যায় প্রতিশ্রুতিও আসে সত্য! কিন্তু তিস্তার চুক্তির সমাধান হয় না। উল্টো ভারত ও নেপাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ পানিকে ঘিরে তাদের উন্নয়নে পানি প্রকল্প গ্রহণ করছে। তাদের প্রচুর পানির প্রয়োজন। ফলে তিস্তা চুক্তিতে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। যদি কেন্দ্রীয় সরকার কখনো সম্মতি দেয়, সেখানে রাজ্য সরকার একেবারেই না করে বসে।
বঙ্গোপসাগরই আমাদের ভাটির অবস্থান। সেখানকার লবণাক্ত পানি, সাগরের নানা দুর্যোগ আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সাগরেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সে অর্থে আমরা ভাগ্যবানও বটে। কারণ সম্ভাবনার নীল অর্থনীতি ও সমুদ্রতলের প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের সমৃদ্ধির প্রতীক হতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে, পানি একটি সম্পদ। এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ব্যতীত আমরা সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারব না। যে কারণে পানিকে ঘিরেই চাষাবাদ। আর সেচভিত্তিক উচ্চফলনশীল জাতের খাদ্যশস্যের চাষাবাদ না হলে বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো না। যে কারণে তিস্তা সেচ প্রকল্পের অবদান অনস্বীকার্য। বাস্তব এ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় তিস্তা সেচ প্রকল্পের পরিধি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তিস্তা সেচ প্রকল্প এরিয়ার ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের পানি পৌঁছে দিতে ৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সেকেন্ডারি আর টারসিয়ারি সেচ ক্যানেল নির্মাণে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। এতে প্রকল্পটি নীলফামারী জেলার সদর, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, ডিমলা ও জলঢাকা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, খানসামা ও চিরিরবন্দর এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া, সদর, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জে বাস্তবায়িত হবে। এই প্রকল্পের আওতায় খাল ও সেচ কাঠামো শক্তিশালীকরণ, ৭২ কিলোমিটার সেচ পাইপ স্থাপন, ১৭ হাজার ৮৫টি সেচ কাঠামো নির্মাণ ও মেরামত করা হবে। বাস্তবে এ প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম হবে। কারণ তিস্তায় নদী ধরে রেখে সেচকার্য সম্পন্ন করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। এমনকি বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণেরও প্রকল্প হাতে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে না পারলে নিকট ভবিষ্যতে পানির অভাবে জীবন-জীবিকা, চাষাবাদ, বিশুদ্ধ পানির অভাবে জনজীবন বিপন্ন হবে।
লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক
ahairanju@gmail.com