মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র হচ্ছে

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

রিক্রুটিং এজেন্সির স্বার্থ বিবেচনা না করে দেশ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দেশ-বিদেশে নানামুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সময়মতো শ্রমিক পাঠাতে না পারলে মালয়েশিয়া সরকার অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নিয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করবে। ফলে বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তকরণ, সঠিক তথ্য উপস্থাপন ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বায়রা সদস্যদের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বায়রার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় শ্রমিক প্রেরণের নানা উদ্যোগের ফলে মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়া শ্রমিক অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কর্মীদের কোনো অভিযোগ নেই। তারপরও যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক তালিকাভুক্ত হয়নি তারা মিটিং-মিছিল, সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন প্রভৃতির মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়াটিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি দুদেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও বিধিবিধান অনুসরণ করার পরও প্রতিদ্বন্দ্বী রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের মতো মামলা-মোকদ্দমা করে শ্রমবাজারটি উন্মুক্তের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিগত ২০২২-২৪ মেয়াদে তালিকাবহির্ভূত কিছু এজেন্সি, যাদের মালয়েশিয়া কর্মী প্রেরণের অনুমোদন ছিল না; তারা ডামি ডিমান্ড লেটারের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত এজেন্সির নামে ব্যবসা করেছে, তারাই অন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে মিলে অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধিপূর্বক পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে দেশের টিআইপি কিংসহ জনশক্তি রপ্তানি সেক্টরের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে  অধিকসংখ্যক কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি তাদের সবার মূল বেতন ন্যূনতম ১৭০০ রিঙ্গিত নির্ধারণ করেছে। এতে একজন কর্মীর মূল বেতন-ভাতা এবং ওভারটাইমসহ মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে প্রকৃতপক্ষে দ্বিগুণেরও বেশি। এই কারণে বাংলাদেশের সাধারণ কর্মীরা মালয়েশিয়া গমনের জন্য অধিক আগ্রহী। মালয়েশিয়া সরকারের ইকোনমিক প্ল্যানিং ইউনিটের নির্ধারিত ২৫ লাখ বিদেশি কর্মীর সিলিং অতিক্রম করায় ওই দেশের সরকার ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ সব সোর্স কান্ট্রির বিদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে। অতঃপর মালয়েশিয়া সরকার ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে পুনরায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেয়।

তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের এই সিদ্ধান্তের সুযোগ গ্রহণ করে সোর্স কান্ট্রিগুলো এবং বিশেষত আমাদের প্রতিবেশী দেশ, নেপাল ও মিয়ানমার উল্লেখযোগ্য হারে কর্মী প্রেরণ শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশ এই সুযোগ গ্রহণে সমর্থ হয়নি। একই সময়ে বাংলাদেশ কর্মী প্রেরণ শুরু করতে পারলে এতদিনে অন্ততপক্ষে ১ লাখ কর্মীর অভিবাসন সম্পন্ন হতো। পরে গত বছরের ২৭ অক্টোবর  মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে সুনিদিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী বাংলাদেশী বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা প্রেরণের অনুরোধ করে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা পাঠায়। গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় সেখানকার প্রধানমন্ত্রী দাতোশ্রী আনোয়ার বিন ইব্রাহিমের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার পর উভয় সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার করে দ্রুত কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেন।

তিনি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার করে দ্রুত কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেন। অতঃপর মালয়েশিয়া সরকার ক্রাইটেরিয়া পূরণ করা ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে বোয়েসেলসহ ২৬টি মূল এজেন্সি এবং সহযোগী ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অবিভাসন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট করে। মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে ওই এজেন্সিগুলোর মধ্যে কোটা বরাদ্দ শুরু করেছে। ওই বরাদ্দকৃত কোটার কর্মীদের জন্য অনলাইনে ই-অ্যাম্বাসি সফটওয়্যার মডিউলে কুয়ালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের এটেস্টেশনসহ পরবর্তী কার্যক্রম চলমান পর্যায়ে রয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দুদেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনার পর যখনই কর্মী নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে বায়রার কিছু সদস্য এজেন্সি এবং মধ্যস্বত্বভোগী, যারা ইতিপূর্বে নামে-বেনামে ব্যবসা করা সত্ত্বেও অভিবাসন প্রক্রিয়াটিকে বাধগ্রস্ত করেছে। তারা গণমাধ্যম ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং আন্দোলন, মিটিং-মিছিল, মানববন্ধন ও ক্ষতিকর কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটিকে আবার বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। অতীব দুঃখের বিষয় যে, এসব ব্যক্তি দেশ এবং কর্মীদের স্বার্থ বিবেচনা না করে তাদের নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে বড় করে দেখছেন। ইতিমধ্যে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু এজেন্সি বর্তমান অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে ডিম্যান্ড লেটার সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং বিভিন্ন কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে আমাদের কর্মীদের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান বন্ধ বা সংকুচিত হওয়ায় সম্ভাবনাময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি আমাদের জন্য আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর উচিত হবে শুধু নিজস্ব স্বার্থকে বিবেচনা না করে দেশের স্বার্থ ও কর্মীদের কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনা করে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটির সুযোগ গ্রহণ করা। অন্যথায় মালয়েশিয়া সরকার অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগপূর্বক তাদের চাহিদা পূরণ করবে। ফলে বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আল আকাবা অ্যাসোসিয়েটের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান বিশ্বাস। এ সময় বায়রার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত