মহামতি লেনিনের মৃত্যুর পরে প্রখ্যাত রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন যে, লেনিনের মধ্যে ‘প্রতিভা’ নামক বিষয়টি হৃদয়গ্রাহীভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছিলো। সেই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘এই মানুষটি ছিলেন দূরদর্শী এবং বিজ্ঞ।... বহুদূর অবধি তিনি দেখতে পেতেন’।
সিরাজ সিকদার রুশ দেশের লেনিন নন, তিনি বাংলার লোক, আরও সুনির্দিষ্টভাবে যদি বলি, তার জন্ম হয়েছিলো এই পূর্ব বাঙলায়। কিন্তু একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে লেনিনের ওই গুণাবলির অনেক কিছু তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। তার রচনাসমগ্রের প্রথম পঞ্চাশ পৃষ্ঠা কেউ যদি নিবিড়ভাবে পাঠ করেন, তাহলে আমাদের কথার সত্যতা বিচার করতে পারবেন।
২.
মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘লাল সন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’ (বাতিঘর : ফেব্রুয়ারি ২০২১) বইতে যেসব ঘটনার বিবরণ পেশ করেছেন, এই প্রজন্মের পাঠক কিংবা বিপ্লবী কমিউনিস্টদের পক্ষে ধরে-ধরে সেসব প্রতিটি ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন কাজ। কারণ সময়ের ব্যবধানকে আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারি না।
লেখকের বিবরণে পাই কমরেড সিরাজ সিকদার শুধু একে মেরেছেন, তাকে মেরেছেন, ওকে মেরেছেন। আদতেই তারা কী কারণে মারা গিয়েছেন, এতো বছর পরে, এই প্রজন্মের কারো পক্ষে সেসব যাচাই করাটা এখন অসম্ভব একটা ব্যাপার। এটা তারাই পারবেন, যারা সে-সময় পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তাহলে আমরা কী করতে পারি?
৩.
আমরা একটা ধারণা তুলে ধরতে পারি। সেটা হচ্ছে, এই বইতে লেখক এমন সব মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সেই পার্টির প্রতি যাদের মনোভাব আজ চূড়ান্তভাবে নেতিবাচক। আমরা বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গেলে যদি একাত্তরের বিরোধী পক্ষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাতে মুক্তিযুদ্ধকে যেমন খণ্ডিত করে প্রচার করা হয়, তেমনই সিরাজ সিকদার সম্পর্কে বই লিখতে গিয়ে বিরোধী পক্ষকে যদি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাতে মূল্যায়নের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এই বইটাতে সেটাই নানাভাবে আমরা দেখতে পাই।
৪.
আমরা রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে সবাই কম-বেশি জানি। তারা জনগণ ও কমিউনিস্টদের ওপর কী পরিমাণ জুলুম-নির্যাতন করেছেন, সেটা গোটা দেশের মানুষ জানেন। অথচ এই লাল সন্ত্রাস বইটাতে এমন একজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যিনি রক্ষীবাহিনীর একসময়ের বড় হর্তাকর্তা।
৫.
এই বইটার সবচেয়ে বড়ো দুর্বল দিক হচ্ছে, সিরাজ সিকদারের পতাকা বহনকারী দলের সঙ্গে বর্তমানে নিবিড়ভাবে জড়িত, এমন একজনকেও তিনি তার বইতে হাজির করতে পারেননি। গবেষক হিসেবে এর চেয়ে বড়ো ব্যর্থতা তো আর হয় না।
আর একটা বিষয়, সিরাজ সিকদারকে হত্যার ব্যাপারে গোটা দেশের জনগণের মধ্যে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে, সেইসঙ্গে আছে তার প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ।
লেখক খুব চতুরতার সঙ্গে সেই হত্যাকাণ্ডকে এক ধরনের বৈধতা দিয়েছেন, আর সেই সময়কার শাসকগোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেবার চেষ্টা করেছেন।
আরেকটু দেখি : ‘তার (সিরাজ সিকদার) মৃত্যু নিয়ে তখন বিভিন্ন পত্রিকায় সত্য-মিথ্যা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে হত্যার সঙ্গে রক্ষীবাহিনীকে জড়ানোর চেষ্টা করে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এ ব্যাপারে রক্ষীবাহিনীর বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা ছিলো ন।।‘
স্পষ্টভাবে এ-কথা লেখককে কে বলেছেন? বলেছেন জনাব আনোয়ার উল আলম। আনোয়ার উল আলম কে? তিনি ছিলেন রক্ষীবাহিনীর উপপরিচালক! এই হচ্ছে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীদের পরিচয়! এ-রকম নানাজনের সঙ্গে কথা বলে লেখক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন: ‘আসলে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কিছুটা নারীঘটিত কারণে সিরাজ সিকদার ধরা পড়েন’। (পৃ. ১৯৯)
সে তো বুঝলাম কিন্তু হত্যা করা হলো কার আদেশে? তার কোনো জবাব নেই এই বইতে। শুধু তা-ই নয়। তখনকার ক্ষমতসীন ও তাদের পাইক-পেয়াদাদের দায়মুক্তি দিতে গিয়ে লেখক আরেক জায়গায় বলেছেন :
‘কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সিকদার সম্ভবত (খেয়াল করুন পাঠক : ‘সম্ভবত’) ভেঙে পড়েন এবং অস্ত্রশস্ত্র লুকানো আছে এমন জায়গায় পুলিশকে নিয়ে যেতে রাজি হন। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সাভারের একটা জায়গায় পুলিশকে নিয়ে যান। সেখানে পুলিশের গাড়ি থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।‘ (পৃ. ১৯৪)। গবেষণার নামে কী অসম্ভব চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন লেখক। নিজের বয়ানের সঙ্গে পুলিশের বয়ান মিশিয়ে দিয়ে যেটা বলতে চেয়েছেন, সেটা হচ্ছে, পালাতে গিয়ে সিরাজ সিকদার নিহত হন।
আবার সরকারি প্রেসনোটের দোহাই নিয়ে বলেছেন, জায়গাটি নাকি ‘মানিকগঞ্জের দিকে’ (পৃ. ১৯৯)।
সিরাজ সিকদার হত্যার দায়মুক্তি দিতে গিয়ে কীভাবে পাঠককে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন, তার নজির এই বইয়ের পাতায়-পাতায়। আপাতত আর উদাহরণ বাড়াচ্ছি না।
তাহলে সিরাজ সিকদারকে হত্যার জন্য, পুলিশ নয়, রক্ষীবাহিনী নয়, কে দায়ী? ধরা পড়েছেন নারী আসক্তির কারণে সেটা তো বুঝেছি কিন্তু এই বিচারবহির্ভূত হত্যার দায়টা কার? সিরাজ সিকদার কি পুলিশ প্রহরার মধ্যে নিজেই নিজেকে হত্যা করেছিলেন? এটা বলতে পারা গেলে হয়তো ভালো হতো, কিন্তু লেখক অতোটা সাহস পাননি!
৬.
এইসব করতে গিয়ে তিনি সিরাজ সিকদারের সারাজীবনের অবদানকে নাকচ করে দিয়ে তার একান্ত ব্যক্তিজীবনকে নানাজনের মুখ দিয়ে বের করে এনে সিরাজ সিকদারকে একজন নীতিহীন, যৌনতাড়িত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে নানান কসরৎ করেছেন।
কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন, এ-রকম কোনো ব্যক্তির পক্ষে শাসকগোষ্ঠীর পায়ের তলার মাটিকে কাঁপিয়ে দেওয়া অসম্ভব। একজন নেতার ও তার পার্টির মত ও পথের লক্ষ্য সঠিক না হলে যেমন কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠে না, তেমনই সেই নেতা ও তার সহযোদ্ধাদের ব্যক্তিগত আচরণে বলিষ্ঠতা ও চারিত্রিক সততা ছাড়া কোনো পার্টিই বিকশিত হতে পারে না। সাধারণ জনগণের কাছে সেই নেতা ও তার দলের কোনো আবেদন থাকে না, গ্রহণযোগ্যতাও বিনষ্ট হয়। সিরাজ সিকদারের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।
৭.
সিরাজ সিকদার যদি সত্যি তেমন কোনো অসৎ চরিত্রের ব্যক্তি হতেন, তাহলে ক্ষমতাসীনদের হাতে ধরা পড়ার আগে তার নিজের দলের নেতাকর্মীদের হাতে, দেশের জনগণের হাতেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো। বাস্তবে সেটা হয়নি। বরং শাসকগোষ্ঠী কদর্যভাবে বিচার-বহির্ভূত পথে সিরাজ সিকদারকে পরাস্ত করতে চেয়েছে।
৮.
আরও একটা ব্যাপার। এই বইতে লেখক যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাদের কারোরই বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সামগ্রিকভাবে দেশ ও জনগণের পক্ষে নয়। এরা প্রত্যেকেই নানাভাবে বিতর্কিত এবং বেশ খানিকটা বিভ্রান্তও বটে।
৯.
এইসব কারণ পর্যালোচনা করে তা থেকে আমরা বলতে পারি, একজন গবেষকের নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে লেখক মূলত সিরাজ সিকদার ও তার দলের ক্ষতি সাধনের অপতৎপরতায় হাজির হয়েছেন। এটাকে কোনোভাবেই গবেষণা বা ইতিহাস-চর্চা বলে না।
১০.
আমরা জানি, লেখকের রাজনৈতিক চেতনা আওয়ামী ছাত্রলীগ, জাসদের ঐতিহ্যের গণ্ডির মধ্যে দিয়ে বিকশিত হয়েছে। তিনি যতই নিরপেক্ষতার ভান করুন, নিজের ওই ঐতিহ্য থেকে তিনি সরে আসতে পারেননি। সেইসঙ্গে এটাও ভুলে গেলে চলবে না বর্তমানে তার রাজনীতির ওই ধারাটি ক্ষমতাসীনদের নৈকট্য লাভের জন্যে ভীষণভাবে কাতর। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বৃহৎ জোটেও এখন অবস্থান করছে তারা।
১১.
অতীতের সমস্ত কিছু ভুলে যাওয়ার, অস্বীকার করবার প্রবণতা সেই ধারাটির মধ্যে দেখতে পাই। আরও দেখতে পাই, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের শাসকগোষ্ঠীর প্রধানকে একনায়কের স্বরূপ থেকে বের করে এনে একটা উদার, গণতান্ত্রিক, জনদরদি চেহারায় তাকে অধিষ্ঠিত করবার নিরন্তর নিষ্ফল প্রয়াস। সেই প্রয়াস 'লাল সন্ত্রাসে'র লেখকের সাম্প্রতিক সময়ের বইগুলোতেও খুবই বিকটভাবে প্রকাশিত।
১২.
লেনিন বলতেন, বিপ্লব নিয়ে ‘লেখার চাইতে বিপ্লবের অভিজ্ঞতা লাভ করাটাই বেশি প্রীতিকর ও হিতকর’। এই বাংলাদেশে একমাত্র সিরাজ সিকদারের মধ্যেই বিপ্লবের সেই অভিব্যক্তি চূড়ান্তভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছিল।
১৩,
অনেকেই প্রশ্ন করবেন, তাহলে তিনি ব্যর্থ হলেন কেন? বৈপ্লবিক ব্যর্থতা কোনোভাবেই প্রচলিত ধারার ব্যর্থতা নয়, এটা একটা ‘শিক্ষা’। ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় বিপ্লবের ব্যর্থতার পর কমরেড লেনিন যে সার-সংকলন করেছিলেন, তাতে এই কথাটা খুব জোর দিয়ে তিনি বলেছিলেন। সেই ‘ব্যর্থ বিপ্লব’ থেকে শিক্ষা নিতে পেরেছিলেন বলেই লেনিনের পক্ষে ১৯১৭ সালে একটি সফল বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো।
১৪.
সিরাজ সিকদারের দুর্ভাগ্য, তিনি সেই সুযোগটা পাননি। তাতে করে কিন্তু তার লালিত স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটেনি, ঘটবেও না। বরং সেটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবহমান রয়েছে।
১৫.
এ-রকম দুই-চারটে ‘লাল সন্ত্রাস’ বই দিয়ে সিরাজ সিকদারের নাম মুছে ফেলা কঠিন, অসম্ভব-প্রায়। কারণ ‘সিরাজ সিকদার’ বিপ্লবী চেতনার বিদ্রোহের রক্তবিন্দু দিয়ে লেখা একটি নাম। যে-নাম যুগে-যুগে মানুষের চেতনায় এক বৈপ্লবিক তাগিদের জন্ম দেয়। যে-জন্ম, যে-মৃত্যু কখনো বিফলে যায় না, এ-এক বিনাশহীন বিপ্লবী চেতনা!
সবাইকে ধন্যবাদ।
সৌভিক রেজা: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।