আসামি হত্যার দায় স্বীকার করলেও পুলিশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে আত্মহত্যা। সোমবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চক শিয়ালকোল এলাকার নিজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সিরাজগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম।
তিনি জানান, প্রায় তিন বছর পর সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়া গ্রামের চাঞ্চল্যকর তাঁত শ্রমিক নূর ইসলাম (৪৮) হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে সিরাজগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দেন আসামি ওমর ফারুক (২৫)।
তিনি আরো জানান, ২০১৮ সালের ২৮ জুন বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়া গ্রামের একটি বরই গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় নূর ইসলামের লাশ উদ্ধার করে বেলকুচি থানা পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মনো বেগম বাদী হয়ে ওমর ফারুক ও তার পরিবারের চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যার বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. ফয়সাল আহম্মেদ নিহত নূর ইসলামের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। ময়নাতদন্ত শেষে একে আত্মহত্যা উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
পিবিআই জানায়, ওই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল আলীম তদন্ত শেষে নূর ইসলাম মৃত্যুর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা উল্লেখ করে প্ররোচনার অভিযোগে তিন আসামীকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর বাদী ওই চার্জশিটের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেন। ফলে মামলাটি তদন্তের জন্য আদালত সিরাজগঞ্জ পিবিআইকে নির্দেশ দেন। সিরাজগঞ্জ পিবিআই মামলাটি হাতে নিয়ে প্রধান আসামি ওমর ফারুককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায়। এ অবস্থায় গত ১ এপ্রিল আসামি ওমর ফারুক আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর সিরাজগঞ্জ পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কামরুল হাসান আদালতে আসামির রিমান্ডের আবেদন করেন। বিচারক দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আসামী ওমর ফারুক এ হত্যার দায় স্বীকার করেন। আসামি বলেন, নূর ইসলাম তাকে দিয়ে জোরপূর্বক যৌন সঙ্গম করতে বাধ্য করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে গলাটিপে হত্যা করেন।
এ সংবাদ সম্মেলনে হাজির থেকে ওমর ফারুক জানায়, তিনি বেকার থাকায় নূর ইসলাম তাকে টাঙ্গাইলে তাঁত শ্রমিকের কাজ নিয়ে দেয়। কাজের সুবাদে তারা একসঙ্গে থাকতেন। একই খাটে ঘুমাতেন। এ সময় নূর ইসলাম তাকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে বাধ্য করে। একপর্যায়ে নূর ইসলাম তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু এতে তিনি বিব্রত বোধ করেন ও মনে মনে ক্ষুব্ধ হন।
আসামি আরো বলেন, ঘটনার আগের দিন রাতে তিনি নূর ইসলামকে নিয়ে নিজ বাড়িতে চলে আসেন। তারা রাতে একসঙ্গে এক ঘরে ঘুমান। রাত দেড়টার দিকে নূর ইসলাম তার সঙ্গে যৌন সঙ্গমের জন্য চাপ দেয়। এতে তিনি অস্বীকার করলে উভয়ের মধ্যে তর্কাতর্কি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে তিনি নূর ইসলামকে ঘরের মেঝেতে ফেলে গলাটিপে হত্যা করেন। এরপর নূর ইসলামের লাশ টেনে বাড়ির পাশের ক্ষেতের মধ্যে একটি বরই গাছে নিয়ে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। একা কাজটি করতে না পেরে তিনি তার বাবা আব্দুর রহমান ও মা নাজমা খাতুনকে ডেকে এনে বরই গাছে ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে যান।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, অনেক পুরনো ঘটনা। তাই কাগজপত্র না দেখে বলতে পারছি না। কাগজপত্র দেখতে দেরি হবে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এমন হওয়ার কথা নয়। তবে এ বিষয়ে মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট আরো ভালো বলতে পারবেন।