শুভ্র সরকারের ‘বাবা ও দৃষ্টিঘোড়া’ সিরিজ থেকে সাতটি কবিতা

কবি শুভ্র সরকার ১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছায় জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বিষণ্ণ স্নায়ুবন (২০২০) ও দূরে, হে হাওয়াগান (২০২১)। কাব্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সম্পাদনা করেন সাহিত্যভিত্তিক কাগজ—মেরুদণ্ড

 

বাবা ও দৃষ্টিঘোড়া

১.

কখনো কখনো আমি বাবার মুখের দিকে

তাকিয়ে থাকি, চোখ নামালেই কিছু পাবো বলে

 

এবং বুঝি, এই তাকানো কতটা অপলক

 

এখন শেষ বিকেল

সূর্যাস্তের দিকে তাকানো

আমি আর সূর্য পূর্বাপর বুঝি

 

একটা টিয়া পাখির সবুজ আয়ূঘন

যেন সবুজের ভেতর সচরাচর দেখছি

 

কখনো কখনো আমি বাবার শরীর হতে

খুলে রাখা জামাটাতেও হাত রাখি, শিখতে

তাতে দায়িত্ব ঝুলে আছে কতখানি

 

২.

রোদের দাগ কাটতে কাটতে

মরিচ গাছের পাতারা অবনত, কেবল স্থির

 

যেন আলোময় দৃশ্যসকল, দুপুর এপ্রিল

 

এ বেলা বাবার আর কোথাও যাওয়া

হয় না, যাওয়ার ভেতরে মরে

 

সত্যি বলতে বাবার কোনো

আড্ডার মানুষ নাই

যারা জীবন ঠেকিয়ে বলতে পারবে

চল আরও ঘন হই

লবঙ্গ ফুলের মতো

 

৩.

চাদের বক্রতা নিয়ে মা হঠাৎ

বাবাকে বললো

দ্যাখো ফুলগুলো কত লাল!

 

যেন সূর্যাস্তের শেষ থেকে ছুঁড়ে দেওয়া

এই সকল লাল

কতটা জেনে নিতে পারছে আর গাছ

 

জানলাম না হয়তো

বাবা, শুধু নৈঃশব্দ্যে

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে

এঁকেছিল কত শত

লালের প্রবাহন—

 

৪.

পূজার ঘর, কী যেন দেবদেবীবিষয়ক

 

আগরবাতির সুঘ্রাণ নিকটবর্তী

জানি গন্ধের মুখস্থ ছড়ানো

 

আগরবাতির কোনো বেড়ে ওঠা নেই।

যেহেতু আগরবাতি নিজেই পুড়ে যাওয়া

এক আগুনের বন।

 

অথচ বাবা দেবদেবীদের চরণে

নিবেদনের মতো কিছু জুড়ে দিতে গিয়ে

ছিঁড়ে ফেলছে অনুন্মোচিত

ফুলগুলোরও আংশিক

 

৫.

এই চৈত্রে—

কৃষিখেতের হাওয়া ঢুকে পড়ছে

আমাদের বাড়িতে মুহুর্মুহু

 

পুকুরে ঢলে পড়া শিমমাচার মায়া

 

তাজা জলে ভাসছে লোকনাথ পঞ্জিকা

১৪২৬ বর্ষ

 

রোদের আলোতে কতকিছুর সাথে

কতকিছুর ভাসা নিয়ে ভাবছিলাম

বাবা না হয় ভাসালেন

একশো পুণ্যের মিরাজ

 

৬.

উত্তম-সুচিত্রার একখান ছবি

ঝকঝক করছে আমাদের ছোট্ট বারান্দায়

 

হাত রেখে দেখলাম তাতে

এখনো কেউ কাউকে কেমন রেখেছে মনে

 

বাহির বাড়িতে

সাইকেলের বেল বাজছে অযথা

এও আরেক আনন্দ যেন

শিশুদের কাছে

 

বাঁশফুল ঝরে মুতখানায়।

তাতে কি?

আমি তো দেখি বাঁশফুলেরা ফুলে থাকে

কি অদ্ভুত ঘোলা হয়ে

 

বাতাস নাই কোথাও

ঘুমিয়েছে স্থির বাতাস

বাবার মনোকারাগারে

 

বাবা এখন আর ছবি আঁকে না।

 

৭.

সুষম পূর্ণিমার রাত মজে আছে

ঘাস ও গাছে

 

কান পাতলেই শুনতে পাই

কিছু সিঁকি শব্দ, শব্দেরা বেশি দূর

এগোয় না। একটা বাঁশঝাড় ঘুরে আছে

সেই অভিমুখে। আমার হাততালি বেজে উঠলে

বকেদের সংসার আঁতকে ওঠে।

 

এখনো হাততালি দিতে গেলে

জানাশোনার মধ্যে সেই বকেদের মনে পড়ে।