আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^র প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে অষ্টম হলেও রপ্তানিতে বিশে^র ২০টি দেশের মধ্যে দেশটির কোনো অবস্থান নেই। অথচ স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধে বিশ্বের বহু দেশে বাংলাদেশের আমের প্রচুর চাহিদা ও সুখ্যাতি রয়েছে।
জামদানি ও ইলিশের পর বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশকপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি আম। সুস্বাদু এ আম বাজারে ‘হিমসাগর’ নামে অধিক জনপ্রিয়। ‘ক্ষীরশাপাতি’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের অত্যন্ত সুস্বাদু আম। বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদিত আমের শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগই হচ্ছে ক্ষীরশাপাতি। এ জাতের আম প্রতি বছর রপ্তানি হওয়া আমের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের আম। ক্ষীরশাপাতি আমের বিপুল সম্ভাবনা বিবেচনা করে এর জিআই নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জিআই নিবন্ধনের জন্য বিশ^বাজারে এটি ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি আম’ নামে পরিচিতি পাবে। এর ফলে এ আমের আবাদ বাড়াতে বাগান মালিকরা আগ্রহী হবেন। এতে করে একদিকে আমের উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আমকেন্দ্রিক অর্থনীতি জোরদার হবে। এই সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় আমচাষি, ব্যবসায়ী, কৃষিভিত্তিক শিল্প উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবেন। এ বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জেয় আমবাগানের পরিমাণ ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর, গাছের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে আড়াই লাখ টন।
দেশের চাহিদা মিটিয়ে কয়েক বছর ধরেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে রাজশাহীর আম। এ বছরও ইউরোপের চার দেশে রপ্তানি হবে রাজশাহীর সুস্বাদু আম। ব্যাগিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত এসব আমে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়নি। বেসরকারি উদ্যোগে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে যাবে রাজশাহীর আম। বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড আ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন নামক একটি সংগঠন আম রপ্তানি করবে। রাজশাহীর বিভিন্ন আমের জাতের মধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও তোতাপুড়ি আম রপ্তানি হবে। এজন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩৩ টন। রাজশাহীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে আম রপ্তানি করতে ২৬টি শর্ত মানতে হয়। তবে ব্যাগিং করা না হলেও আমের মান ভালো হলে রপ্তানি করা যায়। এজন্য রপ্তানিকারকরা আম ঢাকার শ্যামপুর প্ল্যান কোয়ারেন্টাইন উইং সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউজে নিয়ে যান। সেখানে আমের মান ভালো হলে প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র দেয় কর্তৃপক্ষ। এরপরই বিমানে করে আম বিদেশে যায়। এর আগে ২০১৯ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৫ কট টন আম রপ্তানি হয়েছিল। এর মধ্যে গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও হিমসাগর ছিল। করোনার কারণে ২০২০ সালে রাজশাহী থেকে সরকারিভাবে কোনো আম রপ্তানি হয়নি। তবে বাঘা উপজেলা থেকে বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ৯ টন এবং অন্যান্য উপজেলা থেকে ১২ টন আম রপ্তানি করে।
নিরাপদ আম উৎপাদন আমের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি, কীটনাশক প্রয়োগের খরচ কমানো ও বিদেশে রপ্তানিযোগ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে উত্তরের দুই জেলা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ব্যবহার। চলতি মৌসুমে আমরাজ্য হিসেবে খ্যাত রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে অন্তত ১১ কোটি আম নিরাপদ ও বিষমুক্ত করা হবে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের মাধ্যমে। এবার শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই প্রায় ১০ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহীতে আরও এক কোটি আমেও করা হবে ফ্রুট ব্যাগিং। চলতি বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি পিস ফ্রুট ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত। অভিযোগ উঠেছে, আমচাষিদের চাহিদাকে পুঁজি করে নিম্নমানের ফ্রুট ব্যাগ বাজারজাত করে সাধারণ কৃষককে ঠকাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাই কৃষকের দাবি, ফ্রুট ব্যাগ ও তার কাঁচামালকে প্রকৃত কৃষিজাত পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে অধিক হারে বাজার মনিটরিং করা। এতে একদিকে যেমন নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে লাভবান হবেন আমচাষি, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা। রপ্তানিকারকদের কথা, আমের ওজন ১০০ গ্রাম হলেই ফ্রুট ব্যাগ পরানো হয়। এতে করে কৃষক অন্তত ১০ বার কীটনাশক প্রয়োগের হাত থেকে রক্ষা পান। এ ছাড়া ব্যাগিং করা আম আকর্ষণীয়, দাগহীন ও পুরোপুরি কীটনাশকমুক্ত হয়। তাই অমচাষি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও ভোক্তার স্বার্থে ফ্রুট ব্যাগকে কৃষিপণ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন আম রপ্তানিকারকরা। আম গবেষকদের মতে, আমের ওজন ৫০ গ্রাম হলেই ফ্রুট ব্যাগিং করা উচিত। এতে ব্যাগিং করা আম অধিক পরিমাণে হলুদ রং ধারণ করে। এ ছাড়া আম পরিপক্ব হওয়ার আগে-পরে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে আমের গায়ে ছত্রাক দেখা দেয়। ফ্রুট ব্যাগিং করলে তা হওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ ধরনের কাগজের এই ব্যাগে দুটি আস্তরণ থাকে। বাইরের আস্তরণটি বাদামি রঙের আর ভেতরেরটি কালো রঙের। গত বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাড়ে ৭ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছিল। ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ফলে আমের বাহ্যিক রং খুব আকর্ষণীয় হয়। এতে ক্রেতা আকৃষ্ট হন। এ ছাড়া শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত হয়।
আমাদের বিজ্ঞানীরা উন্নত জাতের আম ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। ফলে আমের বাণিজ্যিক উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমের উৎপাদন এখন আর দেশের উত্তর-পশ্চিমের কটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আম চাষ ছড়িয়ে পড়েছে সুদূর পার্বত্য এলাকা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত । বর্তমানে দেশে প্রতি বছর ১৫ লাখ টনের বেশি আম উৎপাদন হচ্ছে। সরকার এখন আমের রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। এ লক্ষ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আম উৎপাদন এলাকায় সরকারের চারটি ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আমের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি পাবে। রপ্তানি সহজতর হবে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। এ ছাড়া সরকার আমচাষি ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাত্র চার শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ ও আমবাগান করতে বিনামূল্যে উন্নত জাতের আমের চারা বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
এবার প্রথমবারের মতো স্থানীয় জাত হিসেবে সাতক্ষীরার গোবিন্দভোগ আম যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ জার্মানিতে। সচরাচর হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি জাতের আম রপ্তানি হলেও এবারই প্রথমবারের মতো রপ্তানি তালিকায় যুক্ত হলো সাতক্ষীরার গোবিন্দভোগ আম। সম্প্রতি (৮ মে ২০২১) সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কেরেলকাতা ইউনিয়নের পুটুনি এলাকার চাষি দাউদ মোল্লা বাগানের গোবিন্দভোগ আম পেড়ে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে চলতি মৌসুমে বিদেশে আম রপ্তানি কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। মাটি ও আবহাওয়াজনিত কারণে অন্যান্য জেলার তুলনায় সাতক্ষীরার আম আগে পাকায় এবং স্বাদে, গুণে ও মানে অনন্য হওয়ায় কয়েক বছর ধরেই সাতক্ষীরার ল্যাংড়া, হিমসাগরও আম্রপালি আম রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। গত মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে রপ্তানি বিঘিœত হলেও কৃষি বিভাগের প্রচেষ্টায় এবং বেসরকারি সংস্থা উত্তরণ ও সলিডারিডাডের সহযোগিতায় চলতি মৌসুমে আবারও রপ্তানি শুরু হয়েছে সাতক্ষীরার আম। জেলায় এ বছর ১৩ হাজার ১০০ জন চাষি ৫ হাজারের বেশি বাগানে আম চাষ করেন। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪০ হাজার টন। অন্যান্য জেলার তুলনায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে সাতক্ষীরার আম পাকে। তাই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পেছনে ফেলে রপ্তানিবাজারে বিশেষ গুরুত্ব পায় সাতক্ষীরার ল্যাংড়া, হিমসাগর ও আম্রপালি আম। এ বছর এই তালিকায় যুক্ত হলো গোবিন্দভোগ। এ ছাড়া সারা দেশে রয়েছে সাতক্ষীরার আমের বিপুল চাহিদা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা থেকে অন্তত ৫০০ টন আম রপ্তানি হবে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে। চলতি মৌসুমের শুরুতে রপ্তানির লক্ষ্যে জেলার কলারোয়া, সাতক্ষীরা সদর, তালা, আশাশুনি ও দেবহাটা উপজেলায় ৩৫০ জন চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব চাষি পরিবেশসম্মত উপায়ে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করছেন। রপ্তানিকারকরা আমচাষিদের বাগান থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা মণ দরে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে আমচাষিরা আমের ন্যায্যমূল্য পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এবং আম উৎপাদনে তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্জিত হচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন
netairoy18@yahoo.com