মানবাধিকার কমিশন

ফলেই মিলে বৃক্ষের পরিচয়

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

মানবাধিকার হলো মানুষের জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আমরা মনে করি, মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই মানবাধিকারের মূল লক্ষ্য। কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়, প্রতিটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে চর্চায় তা প্রতিভাত হবে, এটিই সংগত। মানবাধিকার কমিশন ‘লাইফ সাপোর্টে’ শিরোনামযুক্ত ২২ জুলাই দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, মানবাধিকারের সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠিত এই কমিশন দিয়ে আমরা কী করব! প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী, কার্যকর, স্বাধীনভাবে পরিচালনার জন্য সংস্কার ও গতিশীল করার তাগিদ ছিল, তার একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘রাজনৈতিক’ সিদ্ধান্তের বলি এই প্রতিষ্ঠান এখনো মুমূর্ষু অবস্থায় ‘লাইফ সাপার্টে’ রয়েছে। কমিশনের কার্যক্রম গত ২১ মাস ধরে বন্ধ। এই অনিশ্চয়তা কবে কাটবে, এরও নেই কোনো সদুত্তর।

‘সব মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদায় ও অধিকারের দিক দিয়ে সমান’ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছিল যে মহৎ লক্ষ্যে, সেই প্রতিষ্ঠানটি কার্যত একটি সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে! আমরা জানি, লঙ্ঘিত মানবাধিকারের প্রতিকার-প্রতিবিধানের উদ্দেশে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠিত হয়।  পরে এটি ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’-এর অধীনে পুনর্গঠিত ও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু অনভিপ্রেত হলেও সত্য, যে সংস্থাটি একটি অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশা জাগিয়েছিল ভুক্তভোগীদের শেষ পর্যন্ত আশ্রয় ও প্রতিকার পাওয়ার একটি ক্ষেত্র তৈরি হলো তা পূর্ণতা পেল না বিভিন্ন সরকারের সদিচ্ছার অভাবে! সংস্থাটি কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি, এই অভিযোগ নতুন নয় এবং ভবিষ্যতেও পারবে না এই জনসন্দেহও প্রীতিকর নয়।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা মানবাধিকার কমিশন এখন বলতে গেলে স্থবির। নামমাত্র ‘রুটিন ওয়ার্ক’-এর মধ্যে এর কার্যক্রম সীমিত। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থকরণে জাতীয় এই সংস্থাটি কখনো কখনো কদর্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে এর গঠন ও উদ্দেশ্য দুই-ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিভিন্ন মহল থেকে সংস্থাটিকে জনবান্ধব করার প্রত্যয়ে সংস্কারের দাবি বারবার উত্থাপিত হয়েছে বটে, কিন্তু এর বিপরীতে দায়িত্বশীলদের তরফে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ভিন্ন কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি ফের তা-ই সামনে নিয়ে এলো। স্ট্যাটাস পরিবর্তন তো দূরের কথা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও প্যারিস নীতিমালার শর্ত পূরণের ঘাটতি রয়েছে এই অভিমত মানবাধিকারকর্মীদের।

পৃথিবীজুড়ে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (জিএএনএইচআরআই)’ ২০১৫ সালে ১১৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার  কমিশনকে ‘বি’ স্ট্যাটাস দেয়। ১১ বছর পরও সেই স্ট্যাটাসের বৃত্তমুক্ত হতে পারেনি সংস্থাটি! অথচ এই অঞ্চলের দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মানবাধিকার কমিশন চলছে ‘এ’ স্ট্যাটাস নিয়ে। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতায় এও আছে, জনস্বার্থ কিংবা অধিকারের সুরক্ষায় স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের বাইরে রাখা যায়নি। এমতাবস্থায় জনকল্যাণ তো পরের কথা, উপরন্তু তা জনবিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এমন নজিরও কম নেই। আমরা আশু এর নিরসন চাই। চাই কার্যকর মানবাধিকার কমিশন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত