বিদ্বেষের বিষ যেভাবে ছড়ায়

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অনেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখছেন। সমাজে তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যেমন শান্তিপূর্ণ চর্চা প্রয়োজন, তেমনি উসকানির মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধ করাও জরুরি। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সেই রকম প্রকাশ, যা কোনো ব্যক্তিকে বা গোষ্ঠীকে তাদের সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্য জাতি, ধর্ম, নৃগোষ্ঠী, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, যৌন প্রবণতা, লিঙ্গ পরিচয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শ ওপর ভিত্তি করে আক্রমণ করে। দেশে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

দেশের একটি স্কুলে ঘটা সাম্প্রতিক একটি ঘটনা করছি। ঘটনাটা জেনেছি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে, যিনি একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত। তার ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। একদিন টিফিন বিরতির সময় ছেলেটির এক সহপাঠী তাকে ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথা বলে। আমার বন্ধুর ছেলে ভয় পেয়ে যায় এবং কান্নাজড়িত অবস্থায় বাড়ি ফেরে। এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে ধরার কোনো অবকাশ নেই, কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানানভাবে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে। দেশে যেমন সংখ্যালঘুরা এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিদ্বেষের শিকার তেমনি ভারতেও, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে অনুরূপ ঘটনা ঘটছে এই অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার গোষ্ঠীগুলোর ওপর দমন-পীড়ন ও অধস্তনতা বজায় রাখার একটি অস্ত্র হিসেবে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি কেবল কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মানসিক ও আবেগকে আঘাত করে না, বরং তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা ও মানবসত্তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংখ্যালঘুরা যেন বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের সহজ লক্ষ্যবস্তু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভুল তথ্য ছড়ানো এবং সহিংসতায় উসকানি দেওয়া আরও সহজ হয়ে উঠেছে। বর্তমানের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অতীতের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন। এটি ফেসবুক, ইউটিউব এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, ঘণ্টায় অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং কখনো কখনো সহিংসতাসহ মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দেয়।

আমাদের স্মরণে আছে, ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে একটি বিকৃত ফেসবুক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বৌদ্ধ মন্দির ও ঘরবাড়িতে হামলা হয়, দেশের নানান জায়গায় সহিংসতা ঘটে। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো, গুজব কিংবা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে মানুষের শান্তিপূর্ণ সামাজিক জীবন ধ্বংস হয়, বাড়ে প্রতিহিংসা আর অসন্তোষ। নাসিরনগর, ভোলাসহ অনেক স্থানে এমন ঘটনা অতীতে ঘটেছে। আমাদের রাজনীতিতে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য যেন একটি সাধারণ বিষয়। প্রায় সব রাজনৈতিক দলের অনেকেই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করেন। ক্ষমতাসীনরা মহলের কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলে যেন তাদের কাছে চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রয়োগ করেন, আবার বিরোধী পক্ষ থেকেও সরকার ও অন্যান্য পক্ষের একই ভাষায় জবাব আসে। এটাও নতুন কিছু নয়, দুঃখজনকভাবে এই কদর্যতাই রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভার্জিনিয়া উলফ তার ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘আ রুম অব ওয়ানস ওন’ গ্রন্থে যুক্তি দেন, ‘নারীদের সৃষ্টিশীল হওয়ার জন্য নিজস্ব একটি স্থান প্রয়োজন। প্রায় এক শতাব্দী পরও নারীর সামাজিক অবস্থান মূলত অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। মনে রাখা উচিত, আমাদের চারপাশে নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের শিকার নারীরা কারও না কারও বোন, কারও মেয়ে, কারও বন্ধু।’ ২০১৩ সালে দেশের একটি ইসলামি দলের এক নেতা যুক্তি দিয়েছিলেন, কোরআন অনুসারে নারীদের ঘরে থেকে পরিবার ও সন্তানদের দেখাশোনা করা উচিত। চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণির পর মাদ্রাসাছাত্রীদের স্কুলে না পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি এও বলেছিলেন, এতে মেয়েরা অবাধ্য হয়ে উঠতে পারে ও পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে যেতে পার। এই মন্তব্যের কারণে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। আমাদের সমাজে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রতিরোধে স্পষ্ট, কার্যকর আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা, গুজব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রকাশ ও প্রচার রোধে জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিকৃত ছবি, প্রেক্ষাপটবিহীন ভিডিও এবং গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুখে মুখে ছড়িয়ে ভুল তথ্য ও ঘৃণার দুষ্টচক্র তৈরি করে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এমনভাবে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন মানুষ অবচেতন মনেই যার যার আদর্শিক জায়গা থেকে বিদ্বেষ পোষণ করছে। বাড়ছে পারস্পরিক হিংসা, ক্ষোভ, অশ্রদ্ধা ও ঘৃণা। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বিত পদক্ষেপ। রাষ্ট্রের উচিত সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত আইন প্রণয়ন করা, যা সুরক্ষিত মতপ্রকাশ ও সহিংসতায় উসকানির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে এবং এর অপব্যবহার রোধে আইনি সুরক্ষা থাকে। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলা ভাষার কনটেন্ট মডারেশনে বিনিয়োগ করতে হবে, স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে হবে এবং সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্টের জন্য দ্রুত অভিযোগ প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে।

নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে যাচাই-বাছাই করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত ও সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। ধর্মীয় ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের নৈতিক কর্র্তৃত্ব ব্যবহার করে সংকটের সময় উত্তেজনা প্রশমন এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির আলো ছড়াতে উৎসাহিত করতে পারেন। সচেতন নাগরিকদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। উদারনৈতিক মনোভাব এ ক্ষেত্রে খুব জরুরি। শুভবোধসম্পন্ন সবাইকে এ জন্য সক্রিয় ও সজাগ থাকতে হবে। বর্তমান বিশ^ একটি বৈশি^ক গ্রাম, যেখানে প্রতিটি ধর্ম, প্রতিটি জাতি, প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিকল্প নেই।

লেখক : নির্বাহী সদস্য, পেন বাংলাদেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত