ছিনতাইয়ের ফাঁদ প্রাইভেট কার যাত্রী হিসেবে তুলে লুট করছে সব

রাজধানীর খিলক্ষেত, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকা থেকে ভুলতা-গাউছিয়া ও এয়ারপোর্ট থেকে ময়মনসিংহ, শেরপুর সড়কে ওত পেতে থাকছে ছিনতাইকারী চক্র। রাজধানীর গণপরিবহন সংকটের সুযোগে পথচারীদের টার্গেট করছে ছিনতাইকারীরা। গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে যাত্রীদের প্রাইভেট কারে তুলে লুট করছে সর্বস্ব। এরা কখনো যাত্রীর গলায় ইলেকট্রিক তার পেঁচিয়ে, গামছা দিয়ে চোখ ও হাত বেঁধে, মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে ছিনতাই করছে। কখনো আগ্নেয়াস্ত্র ও গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব লুট করে নির্জন স্থানে ফেলে দিচ্ছে। ছিনতাইয়ে বাধা দিলে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। এমন এক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগ।

গত বুধবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলো সংঘবদ্ধ চক্রের প্রধান মো. মানিক মিয়া, জাকির হোসেন, মো. আরিফ, মো. হযরত আলী ও মো. জাহিদ হোসেন।

গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, একটি মোবাইল ফোন, একটি ছুরি, একটি গামছা, একটি খাকি রঙের স্কচটেপ, লাল-কালো রঙের ইলেকট্রিক তার ও একটি স্ক্রু-ড্রাইভার উদ্ধার করা হয়। আরিফুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগীর করা মামলার তদন্তে নেমে এ চক্রের সন্ধান পায় ডিবি।

আরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কুড়াতলী বিআরটিসি বাস কাউন্টারের সামনে ভুলতা-গাউছিয়াগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সেখান থেকেই ছিনতাইকারী চক্র আমাকে টার্গেট করে। বাস না পাওয়ায় তাদের প্ররোচনায় পড়েই আমি প্রাইভেট কারে উঠি। কিন্তু ওঠার পরপরই তারা আমার হাত বেঁধে ফেলে। আমি বাধা দিলে মারধর করে। গলায় ছুরি চেপে ধরে সব ছিনিয়ে নিয়ে চোখে স্প্রে দিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছিনতাইকারীদের ভুল টার্গেট ছিলাম আমি। কারণ তারা বারবার বলছিল আমার কাছে ৩ লাখ টাকা আছে, কোথায় সেই টাকা। তারা নিশ্চিত ছিল আমার কাছে টাকা আছে। আমি তাদের বারবার বলেছিলাম আমার কাছে এত টাকা কোথা থেকে আসবে। আপনারা ভুল টার্গেট করেছেন। কিন্তু এ কথা শুনে তারা আমাকে অনেক মারধর করে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগী আরিফুল ইসলাম গত ২০ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুড়াতলী বিআরটিসি বাস কাউন্টারের সামনে ভুলতা-গাউছিয়াগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তখন একটি সাদা রঙের প্রাইভেট কার আরিফুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। তিনি ওই প্রাইভেট কারে ওঠেন। প্রাইভেট কারটি গাউছিয়ার উদ্দেশে রওনা করে প্রায় ২০০ মিটার যাওয়ার পর পেছনের সিটের আরিফুলের দুই পাশে বসা দুজন যাত্রী তার হাত চাপ দিয়ে ধরে। ভিকটিমকে গামছা দিয়ে বেঁধে কিল-ঘুসি মারতে থাকে এবং গলায় ছুরি চেপে ধরে ভয় দেখায়। এ সময় তার কাছে থাকা মোবাইল সেট, নগদ অর্থ ও ব্যবহৃত বিকাশ অ্যাকাউন্টের পিন কোড জোর করে ছিনিয়ে নেয়। রাত সোয়া ১০টার দিকে আরিফুলকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানা এলাকায় চোখে স্প্রে করে নামিয়ে দেয়। আরিফুল তখন বুঝতে পারেন প্রাইভেট কারে থাকা সবাই ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য। পরে বাসায় গিয়ে দেখতে পান ওই ছিনতাইকারীরা তার বিকাশ নাম্বারে থাকা টাকা সেন্ড মানি করে নিয়েছে। এ ঘটনায় তিনি খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন। থানা পুলিশের পাশাপাশি মামলাটি ছায়া তদন্ত  শুরু করে গোয়েন্দা বিমানবন্দর জোনাল টিম। এ মামলার ঘটনা তদন্তে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করে গোয়েন্দা টিম। গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সিটি ফিলিং স্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের বিমানবন্দর জোনাল টিম।

তিনি আরও বলেন, দুই কোটি লোকের বাস এই ঢাকা শহরে। দেখা গেছে এখানে ছিনতাইকারীরা ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং রাত ৯টা থেকে ১১-১২টা পর্যন্ত বেশি সক্রিয় থাকে। অনেকে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েও থানায় কোনো অভিযোগ করেন না। এতে অপরাধীরা আনডিটেকটেড থাকে। আমি অনুরোধ করব কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হলে অবশ্যই আমাদের জানাবেন।

ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) কাজী শফিকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ছিনতাইকারী চক্রে আরও সদস্য রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তাররা পেশাদার ছিনতাইকারী। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে। তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ড শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।’