নিয়ন্ত্রণ করতে হবে স্বভাবকেও

ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার অবশেষে দেশজুড়ে সাত দিনের কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে। ১ জুলাই থেকে এই লকডাউন শুরু হয়েছে। এবারের লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসারের সঙ্গে সেনাবাহিনীকেও নামানো হয়েছে। জনসাধারণ ও যানবাহন চলাচল এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। তারপরও কিছু মানুষ বিধি ভঙ্গ করে রাস্তায় নামছে। সবাই যে প্রয়োজনে বা পেটের তাগিদে পথে নামছে, তা কিন্তু নয়। অনেকে নানা অজুহাত দেখিয়ে, এমনকি লকডাউন দেখতেও পথে নামছে। ব্যাপক প্রচার প্রোপাগাণ্ডা, প্রায় দেড় বছর ধরে দেশ-বিদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষের অসহনীয় কষ্ট, মৃত্যুর মিছিল দেখেও আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। আর স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে।

সারা দেশ আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। জোড়া সংকট করোনায়। সংকট জীবনের, জীবিকারও। জীবন-জীবিকা বাঁচাতে, হাসপাতালমুখী মানুষের স্রোত ঠেকাতে লকডাউন না দিলে আরও বড় বিপদের মধ্যে পড়তে হবে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। আবার অর্থনীতিবিদরা বলছেন (আমরা সাদা চোখেও দেখতে পাচ্ছি), এই লকডাউনের কারণে অনেক মানুষেরই রুটি-রুজির ক্ষেত্রে চরম অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। তাতে করে দেশে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের সমস্যা প্রকট হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও টিকা সংগ্রহে ব্যর্থ সরকার আপাতত মানুষকে ঘরে আটকে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জই গ্রহণ করেছে। কাঁকড়াকে খোলা জায়গায় আটকে রাখা, আর মানুষকে ঘরে রাখা, দুই-ই অত্যন্ত কঠিন কাজ। কোনো মানুষেরই ঘরে মন বসতে চায় না। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে মুরগির মতো টইটই করে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে আপাতত ঘরে থাকার কোনো বিকল্প নেই। সেই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সবাই অস্থির হয়ে পড়েছেন। এমনিতেই আইন বা নিয়ম মানার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের রয়েছে চরম উদাসীনতা। নিতান্ত বাধ্য না হলে মোটা অঙ্কের জরিমানা, জেল খাটার ভয় কিংবা পুলিশের মারের আশঙ্কা না থাকলে কেউ-ই আইন মানে না। নিয়ম তো আরও না। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের দোদুল্যমানতা, দায়িত্বহীনতা এবং একশ্রেণির মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও দৃঢ়তার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে লকডাউন, আংশিক লকডাউন, সীমিত পরিসরে লকডাউন, কঠোর লকডাউন ইত্যাদি নানা পদক্ষেপের কথা সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো লকডাউনই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকি মানুষকে মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করার ব্যাপারেও সরকার কঠোর হতে পারেনি। ফলে মানুষের মধ্যে করোনা, মাস্ক পরা কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিয়ে এক ধরনের উদাসীনতা, ঠাট্টা-তামাশার ভাব বিরাজ করছে।

মাস্ক ব্যবহার, করোনার উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষা করা, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকাএসব ব্যাপারে বেশির ভাগ মানুষ ন্যূনতম নিয়মও মানেনি। এমনকি করোনা আক্রান্ত হয়েও অনেকে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছে, এখনো বেড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তাদের আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবরা বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করছে না। অনেক ব্যক্তিই অকল্পনীয় ও অমার্জনীয় দায়িত্ববোধহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এই দায়িত্বহীনতা এক বিপুল বিপদের সংকেত বহন করছে। কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে প্রশাসনের দায়িত্ব প্রচুর। চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও। কিন্তু এই দুর্বিপাক রোধ করতে সবার প্রাণপাত চেষ্টাও বিফল হতে পারে, যদি নাগরিকরা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে। দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশের নাগরিকদের মধ্যে সেই সচেতনতার অভাব প্রকট। এমনকি বিপর্যয়ের এই চরম লগ্নেও। কোয়ারেন্টাইন এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া, সংক্রমিত অবস্থায় গণপরিবহনে ঘুরে বেড়ানো, স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার মতো ঘটনাগুলো নিয়মিত ঘটছে। যারা এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দিচ্ছে, তাদের অনেকে প্রথাগত অর্থে উচ্চশিক্ষিত, অনেকেই সমাজের উঁচুতলার বাসিন্দা। তাদের শুধু এই বোধটুকু নেই যে সংক্রমিত অবস্থায় তারা যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানে, তবে আরও অজস্র মানুষকে তারা বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটা শুধু স্বার্থপরতা নয়, নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ। চরম স্বার্থপর মানুষও জানে যে, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর আয়তন সীমিত, একটি নির্দিষ্ট সীমার অধিক চাপ বহনে সেই পরিকাঠামো অক্ষম। নিজে সংক্রমিত অবস্থায় অনেকের সংস্পর্শে এলে তাদের সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়বে, সীমিত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর চাপ বাড়বে। ফলে, ওই স্বার্থপর মানুষের নিজের যথাযথ স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার সম্ভাবনা কমবে। অতএব সংক্রমিত হলে স্বার্থবোধসর্বস্ব মানুষেরও চেষ্টা করা উচিত, যাতে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়।

স্বার্থবোধের ধারণাটি প্রকৃতপক্ষে সামাজিক মূল্যবোধ ও অভ্যাস থেকেই জন্মায় এবং তার দ্বারাই লালিত হয়। সংকীর্ণ স্বার্থ থেকে বৃহত্তর স্বার্থে উত্তরণের জন্য যথাযথ সামাজিক আদর্শ ও নীতিবোধের অনুশীলন দরকার। দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের দেশে সেই অনুশীলনের লেশমাত্র নেই। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন, তারাও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেন না। তাদের উদাসীনতা, উপেক্ষা, সত্যকে গোপন করার অভ্যাস, আত্মপ্রশংসা, আত্মতুষ্টি, অদূরদর্শিতা প্রবাদতুল্য। তারা আনুগত্য ছাড়া নাগরিকদের তেমন কিছুই শেখান না। ফলে এ দেশের নাগরিকরাও সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ নয়। বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও নাগরিক জানে না তার কর্তব্য কী। তারা এইটুকুও বোঝে না যে এই কঠিন সময়ে প্রতিটি নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেই হবে। কোয়ারেন্টাইনে থাকতে যদি অসুবিধাও হয়, তবু তা মেনে নিতে হবে। মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। নাগরিকের মধ্যে এই প্রাথমিক দায়িত্ববোধটুকু গড়ে না ওঠাটা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের চরম ব্যর্থতা। আজ না হোক পরশু বা তারপর হয়তো করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমবে। কিন্তু নাগরিকের দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে, সেই আশা ক্ষীণতর। এই দুঃসময়ে আসলে আমরা সবাই খুব বিপদে আছি, দুশ্চিন্তায় আছি। মানুষের সব অহংকার, সব বড়াই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। করোনাভাইরাস এরই মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে, সভ্যতা এগোলেও মানুষের আদিম অসহায়ত্ব এখনো ঘোচেনি। একটা অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে উন্নয়ন-অগ্রগতি, মহাকাশ গবেষণা, যুদ্ধবিমান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, অর্থবিত্ত-ক্ষমতা কতটা অসার! মিথ্যে অহংকারে ঠাসা একটা কৃত্রিম জীবন আমরা যাপন করছি। পুরোটাই যান্ত্রিক। কোথাও প্রাণের ছোঁয়া নেই। এই অভ্যস্ত জীবন আমাদের এতটাই দেউলিয়া বানিয়েছে যে, আমরা এখন সময় কাটাতেও পারি না। রুটিনের বাইরে গিয়ে বাঁচার উপায় যেন ভুলে গেছি!

করোনাভাইরাস আমাদের নতুন করে জীবনযাপন করতে শেখাচ্ছে! জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবাচ্ছে! এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষকে ঘরে থাকতে হবে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ যেন না ঘটে সেজন্য নিজেকে আলাদা রাখা, ঘরে থাকা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাকেই তাই আপাতত করোনা থেকে রেহাই পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য কষ্ট করে হলেও আমাদের ঘরে থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি ঘোষণা মেনে চলতে হবে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকেও প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। পুরো ব্যাপারটিকে মানুষের ‘সচেতনতা’র ওপর ছেড়ে দিলে বিপদ বাড়তে পারে। কারণ জাতি হিসেবে আমরা জাপানিদের মতো ভদ্র, সভ্য ও নম্র নই। আমরা হলাম, খেয়ালি, অপরিণামদর্শী, বেপরোয়া ও বিদঘুটে স্বভাবের। ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না’ বিজ্ঞাপন দেখলে আমরা ব্যাকুল হয়ে উঠি সেখানে প্রস্রাবের জন্য। ‘হাত দিবেন না’ লেখা দেখলে যাওয়ার সময় পা দিয়ে একটা গুঁতা মারার চেষ্টা করি। আমাদের যেটা নিষেধ করা হয়, সেটা করতে আমরা আগ্রহী হই বেশি। এমন স্বভাব যাদের, তাদের বলে-কয়ে, অনুরোধ করে তেমন কোনো উপকার পাওয়া যায় না। তবে এ দেশের মানুষ লাঠি আর বন্দুককে ভয় পায়। র‌্যাব কিংবা সেনা সদস্যদের দেখলে তাই অতি বড় ঘাড়ত্যাড়া বেয়াদবও মাথা নিচু করে কথা বলে, সোজা হয়ে পথ চলে। কারণ ওই বাহিনীগুলো পশ্চাৎদেশে লাঠি ও লাথি বসাতে খুব একটা সময় নেয় না। ‘যেমনে খুশি তেমনে চলি’ স্বভাবের বঙ্গসন্তানদের মোক্ষম দাওয়াই হচ্ছে প্যাদানি! বাধ্য না করলে, প্যাদানি না দিলে কেউ-দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে আগ্রহ দেখায় না!

কাজেই এখন শুধু ‘নাগরিক সচেতনতা’র ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। প্রয়োজনে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। করোনা মোকাবিলায় নাগরিকদের ব্যাপক টিকাকরণ ও স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হবে। যত দিন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে টিকা সংগ্রহ করা না যাবে, তত দিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরই নির্ভরশীল হতে হবে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com