বাংলা ভাষার কিংবদন্তি লেখক ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফার বইয়ের কপিরাইট নিয়ে দেখা দিয়েছে বিরোধ। বিরোধ নিরসনে কপিরাইট বোর্ড একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে আহমদ ছফা রচনাবলি প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেয়।
গত ৪ এপ্রিল হাওলাদার প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মো. মাকসুদের আপিলের নিষ্পত্তি করে কপিরাইট বোর্ড এ আদেশ দেয়।
এর আগে গত বছরের ২৪ মার্চ ‘লেখক আহমদ ছফা রচনাবলির কপিরাইট: নূরুল আনোয়ার বনাম মো. মাকসুদ, স্বত্বাধিকারী হাওলাদার প্রকাশনী’ অভিযোগের রায় ঘোষণা করে কপিরাইট নিবন্ধক। ওই আদেশে অসন্তুষ্ট হয়ে মো. মাকসুদ ওই বছরের ২০ জুলাই কপিরাইট বোর্ডে আপিল দায়ের করেন।
আদেশে কপিরাইট নিবন্ধক নিরপেক্ষ কমিটির তিনটি কাজের কথা উল্লেখ করে। ১. প্রকাশক নির্বাচন ও রচনা প্রকাশের অনুমতি সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন ২. রয়্যালটির হার নির্ধারণ ও প্রকাশকের কাছ থেকে তা সংগ্রহ ৩. প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তদারকি এবং প্রাপ্ত রয়্যালটি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রাপ্যতা অনুযায়ী বণ্টন।
জানা যায়, আহমদ ছফার বইয়ের কপিরাইট নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে তার ভাতিজা নূরুল আনোয়ার, বোনের নাতি মনজুরুল ইসলাম এবং হাওলাদার প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মো. মাকসুদের সঙ্গে।
এসব বিষয়ে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে জানতে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো-
নূরুল আনোয়ার
আহমদ ছফার বই বাজারে ছিল মাত্র ১২ বা ১৪টা। আমি ২০০৭ সালে এসে আমি আহমদ ছফার রচনাবলীতে হাত দিই। তার আগে আমার ফুফু বিলকিস খাতুনের (আহমদ ছফার বোন) কাছ থেকে আমি লিখিতভাবে নিই। তার লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে আমি ২০০৭ সালে এটাতে (রচনাবলি) হাত দিই। এরপর আমি অনেক পরিশ্রম করেছি, আমার ওয়াইফও করেছে। আমার ওয়াইফ বাংলায় পিএইচডি। তখন আমি তিনজন মানুষের কাছে গিয়েছিলাম। একজন সলিমুল্লাহ খান, একজন মোর্শেদ শফিউল হাসান, আরেকজন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আমি রিকোয়েস্ট করেছিলাম সলিমুল্লাহ খানকে যে আপনি (আহমদ ছফা) রচনাবলিটা সম্পাদনা করেন। উনি বলছেন যে আমাকে মাসকবারি লোক দিতে হবে, তাহলে সম্ভব, না হলে সম্ভব না। কিন্তু তখন আমার নিজের খাওয়ার মতো টাকা ছিল না। তারপর আমি ফোন করলাম জাফর ইকবালকে, জাফর ইকবাল বললেন, আহমদ ছফা ভাইকে ধারণ করার মতো ক্ষমতা আমার নাই। ওই রকম একটা বই আমি এ পর্যন্ত লিখতে পারি নাই। মোর্শেদ শফিউল হাসান বললেন, আমি বছরে একটা করে দিতে পারি।
তার আগে একটা কথা বলি, আহমদ ছফা রচনাবলি যখন আমি ছাপতে যাচ্ছিলাম, কোনো প্রকাশকই রাজি হয়নি। আমি খান ব্রাদার্সকে অনেক কাকুতি-মিনতি করি। এবং যদি লস হয়, সে লসের দিকটা স্বীকার করে নিয়ে আমি ওদের এটাও বলছি, যদি লস হয় এর দায়িত্ব আমি নেব। ২০০৮ সালে এ রচনাবলি প্রকাশ হয় আট খণ্ড। তখন আহমদ ছফাকে নিয়ে এত আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। পরে ২০১১ সালে আমি আরেক খণ্ড বের করি। ২০১৩ সালে এসে আমি যেগুলো বের করি সেগুলো হাইজ্যাক হয়ে যায়।
এর আগে আহমদ ছফা বেঁচে থাকা অবস্থায় একটা কি দুটা খণ্ড সন্দেশ প্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে আরো দুই খণ্ড প্রকাশ হয়। কিন্তু আহমদ ছফা মারা যাওয়ার পর থেকে (২৮ জুলাই, ২০০১) এই যে ২০ বছর একটা টাকাও রয়্যালটি দেয় নাই। এটা নিয়ে আমি বিরক্ত ছিলাম। আমরা একটা ট্রাস্টও গঠন করতে চাইছিলাম। কিন্তু তখন আমরা পারি নাই নানা কারণে, এর একটা ইতিহাস আছে।
তারপর ২০১৩ সালে এসে মাকুসদ (হাওলাদার প্রকাশনী) বইগুলো ছেপে দেয়। যেগুলো বিক্রি হবে বাজারে সেই বইগুলো ছেপে দেয়। তার মধ্যে সে তিনখণ্ড ছাপে। এর একটা প্রবন্ধ সমগ্র, একটা উপন্যাস বাদ দিয়ে শ্রেষ্ঠ উপন্যাস নামে আরেকটা বই ছেপে দেয়। একটা উপন্যাস বাদ দিয়ে কি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হয়? আর তা ছাড়া আহমদ ছফা কখনো বলেছিলেন, আমার এ উপন্যাসগুলো শ্রেষ্ঠ? বলেন নাই। তারপর আহমদ ছফার অনেকগুলো গল্প বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো ছিল, সেগুলো আমি সংগ্রহ করি, সেসব গল্প নিয়ে সে (মাকসুদ) আরেকটা গল্প সমগ্র বের করে ফেলল। মাকসুদ জানায়, সে বই প্রকাশের অনুমতি নিয়েছে ড. মো. আমিনের কাছ থেকে। সেই আমিন নিজেকে ভাইয়ের ছেলে পরিচয় দিয়েছিল। সেই মো. আমিন তাকে বই ছাপানোর টাকা দিয়েছিল বলে মাকসুদ জানায়।
এসব ঘটনায় বাংলাবাজারে তোলপাড় হয়ে গেল। তখন আমি তাকে ১০ লাখ টাকার উকিল নোটিশ দিয়েছিলাম ১৫ দিনের। এক-দুই মাস পরেও সেই উকিল নোটিশের কোনো জবাব দেয়নি। তখন আমি সূত্রাপুর থানায় বিষয়টা জিডি করে জানালাম। যখন সূত্রাপুর থানা তাকে (মাকসুদ) অ্যারেস্ট করার জন্য পুরো প্রস্তুতি নিল। তখন ওই যে আমি উকিল নোটিশ পাঠাইছি সে এর পাল্টা চাঁদাবাজ হিসেবে আমার নামে একটা মামলা করে দেয়। তার সেই মামলা প্রথমে সূত্রাপুর থানা তদন্ত করে, পরে পিবিআই এরপরে সিআইডি। তিন জায়গায় সে (মাকসুদ) মিথ্যা প্রমাণিত হয়। পরে মামলা খারিজ হয়ে যায়। সেখানে সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলে যে, নূরুল আনোয়ারের সঙ্গে আমার আপস হয়ে গেছে। তার কাছ থেকে একটা স্বাক্ষরও নিয়ে নেয় বিচারক।
এর মধ্যে মাকসুদ কপিরাইট অফিস থেকে দশটা বইয়ের কপিরাইট তুলে নেয় তিন শ টাকার স্ট্যাম্পে বন্ড দিয়ে। যেটা নিয়ে কপিরাইট অফিস এ নির্দেশনা দিয়েছিল। এরপর ওই মো. আমিন, যিনি আমার বড় ভাই তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছ থেকে দশটি বই প্রকাশের অনুমতি নিয়ে আসে মাকসুদ ২০০৫ সালে। অথচ ২০০৫ সালে মাকসুদ বই প্রকাশ শুরু করে নাই। সে বই প্রকাশ শুরু করে ২০১৩ সালে। সে নোটারি করে ২০১৭ সালে। মাকসুদ আমার কাছ থেকেও অনুমতি চাইছিল। বাংলাবাজারে তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অনেক অভিযোগ আগে। অনেকের বই সে এভাবে ছাপছে। যেসব বইয়ের বিক্রি বেশি সেগুলো সে এভাবে ছাপছে।
সে চাইছিল হাতেপায়ে ধরে, কান্নাকাটি করে আমার সম্মতি নিতে। কিন্তু আমি নত হই নাই। যত আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা আহমদ ছফার ওয়ারিশ না, তাদের কাছে সে দেনদরবার করছে। বাই দ্য বাই ব্যাপারগুলো আমার কাছে আসছে। তখন আমি তাদের (ছফার আত্মীয়) বলি, তোমরা (মাকসুদকে) বলবা প্রত্যেকটা বইয়ের দায়িত্ব আমরা নূরুল আনোয়ারকে দিয়েছি, আমাদের কাছে আর আসার দরকার নাই। এ বিষয়ে আমি যখন রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়েছি, তখন তারা বলেছে, আপনার কাছেই পাওয়ার, ওদের কাছে পাওয়ার নাই। মনজুরুলরা আমাকে পাওয়ার দিয়েছে। যদিও পাওয়ার (বইয়ের কপিরাইট) দেওয়ার নিয়ম তাদের নাই। তারপরও আমি কাজটা করেছিলাম, কারণ আহমদ ছফা অনেকের পড়াশোনার খরচ চালাইতেন। আমি তো গরিব মানুষ, আমার ওরকম টাকাও ছিল না, আর আমি বই বেঁচে পয়সাও পাই নাই। তারপরও আমি নিজের থেকে অনেকের পড়াশোনার খরচ দিয়েছি। তাদের কিন্তু পঞ্চাশ পারসেন্ট পাওয়ার দিয়েছি। যেটা কপিরাইট অফিস পঞ্চাশ পারসেন্ট তাদের জন্য নির্ধারণ করেছে। আর আমার যেটা সেই পঞ্চাশ পারসেন্ট, অন্যান্য ফুফুদের যে ছেলেমেয়েরা তাদের আমি দিয়ে দিয়েছি।
এই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়ার এক মাস দশ দিন পরে আমি ওই ছেলেকে (মনজুরুল ইসলাম) দশ হাজার টাকাও দিয়েছি। এর আগেও ওর বাবা (জামাল উদ্দিন) যখন মারা যান, তখন এর দাফন-কাফনের সব খরচ প্রায় এক লাখ টাকা আমি দিয়েছি তারা গরিব বলে। তখন কিন্তু আহমদ ছফার বই বাজারে ছিল না।
আরো একটা ব্যাপার, ওর (মনজুরুল ইসলাম) দাদি (আহমদ ছফার বোন বিলকিস খাতুন) কিন্তু প্রায় সময় আমাদের বাড়িতে থাকত, ওর দাদার সঙ্গে বনিবনা হতো না, সে জন্য প্রায় সময় আমাদের বাড়িতে এসে থাকত। প্রায় সময় আমরা ধান-চালও দিছি। মারা যাওয়ার আগেও কিন্তু তিনি তার জায়গা-সম্পত্তি লিখে দিতে চাইছিলেন, কিন্তু আমার কাছে তখন অত টাকা-পয়সা ছিল না।
আর আমাদের জায়গা-জমি নিয়ে কিন্তু কিছু সমস্যা আছে। আমার বাবা যখন ছোটকালে মারা যান, তখন আমাদের জমিগুলো বেহাত হয়ে গিয়েছিল। এগুলো সব এখনো আমরা উদ্ধার করে পারি নাই। ম্যাক্সিমাম জায়গা-জমি নানাজনের নামে চলে গেছে। এসব জমি ইচ্ছা করলেও বিক্রি করার মতো অবস্থা নাই। আমরা দু-একটা মামলা করেছিও সেগুলা কিন্তু ঝুলে আছে।
২০১৮ সালে যখন আমি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিলাম, তখন মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। সে বলেছিল কাকা, জায়গা তো বিক্রি করা যাবে না, আমাদের আপনি এক কানি জমি ছেড়ে দেন লিখিতভাবে। আমার আর কোনো কিছুর দাবি-দাওয়া নেই। আমি তার কাছ থেকে আরো চার লাখ টাকা পাই জমি-সংক্রান্ত ব্যাপারে, তার জমি বিক্রি করবে আমাদের কাছে। এই টাকা কিন্তু আমরা নেই নাই এখনো। কারণ জমি আমরা কিনতে পারি নাই নানা জটিলতার কারণে।
তখন মাকসুদ কী করেছে, ওই যে আমিনের মাধ্যমে মাঝে মাঝে পাঁচ হাজার, বিশ হাজার টাকা দিয়ে মনজুরুলকে প্ররোচিত করেছে। এটা জানার পর আমি বিরক্ত হয়েছি। বিরক্ত হয়ে যোগযোগ বন্ধ করে দিয়েছি। আমি ধরে নিয়েছি যে, আহমদ ছফার বই তো বিক্রি হচ্ছে না, কিন্তু ও তো অনেক বই ছেপে দিয়েছে, প্রকাশকরা হতাশ হয়ে গেছে। এখন ব্যবসা করবে প্রকাশকরা আর আমি করব মামলা। তিন বছর মামলা চালাইলাম। এখন বুঝেন, আমার মতো একটা মানুষ। বাজারে আমার বই আছে। সমাজে আমার মান-সম্মান আছে।
এখন মাকসুদ কী করেছে আমার বিরুদ্ধে আশি লাখ টাকার একটা উকিল নোটিশ দিয়েছে মনজুরুল ইসলামের নামে। কপিরাইট অফিসে মনজুরুল জানায়, এ নোটিশ আমি করি নাই এটা মাকসুদ করেছে।
এরপর আমি কপিরাইট অফিসের দ্বারস্থ হই। তারা কয়েক মাস ধরে বিষয়টার তদন্ত করল। সবাইকে ডাকল।
মাকসুদ কী করেছে আমি যেখান থেকে বই কম্পোজ করিয়েছি, সেখান থেকে সে হুবহু সেসব কপি সংগ্রহ করল। তখন এগুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে অনুরোধ করল বই না প্রকাশ করতে। সে সেটা উপেক্ষা করল। এরপর সে আপিল করল। আমি উকিলও নিয়োগ দেই নাই। কারণ আমার এত টাকা নাই।
আহমদ ছফার বই আমি ছাপছি ব্যবসা করার জন্য না। আহমদ ছফাকে সবার কাছে প্রেজেন্ট করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আহমদ ছফা আমাকে মানুষ করেছেন, একজন লেখক বানানোর জন্য আমাকে চেষ্টা করেছেন, সে জন্য আমি তার বইয়ের কাজ করেছি।
মনজুরুল ইসলাম
আমরা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছি দয়ার টাকায়। আমরা খুব করুণ অবস্থায় আছি। মানুষের সামনে মাথানত করে একটা সরু গলি দিয়ে আমাদের বের হতে হয়। অথচ আমার বাবা মায়ের দিক দিয়ে দুই কানি জমির মালিক। আহমদ ছফারগুলো বাদ দিলেও। এগুলা আমাদের কিছু নাই।
আমার মা কখনো নূরুল আনেয়ারদের বাড়িতে ছিলেন না। আমার দাদা মারা যান যুদ্ধের এক বছর আগে। আমার দাদি বনেদি বংশের মেয়ে ছিলেন। তিনি কখনো কারো কাছে হাত পাততে পারতেন না। কয়েকবার তিনি গলায় দড়ি দিতে চেয়েছেন, বিষ খেতে চেয়েছেন, যেহেতু তিনি মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন না।
আমার বাবা মানুষের কাছ থেকে চাল-ডাল খুঁজে আনতেন এবং আমাদের খাওয়াতেন। আমার একটা ফুফু মানুষের বাড়িতে কাজ করতে করতে পঙ্গু হয়ে গেছে। এখনো তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। ওই ফুফু আমাদের লালন-পালন করতেন। এখনো আমরা মানুষের দয়ায় বেঁচে আছি।
আমার কাছে চিঠি আছে আহমদ ছফার। চিঠিগুলো হৃদয়বিদারক। তিনি লিখেছিলেন, জামাল (মনজুরুল ইসলামের বাবা) আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারি নাই। তোমাকে আমি ঢাকায় নিয়ে এসে লেখাপড়া করাতে পারি নাই, তোমার ছেলেকে লেখাপড়া করাব। আহমদ ছফা মারা যাওয়ায় দুর্ভাগ্যক্রমে আর কিছু হয় নাই।
আহমদ ছফা বংশের কেউ লেখাপড়া করে নাই বিধায় নূরুল আনোয়ার একচ্ছত্র ছড়ি ঘুরাইছিল। এখন তো আমরা মোটামুটি লেখাপড়া করছি, আমার ভাই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।
আমরা কখনো সম্পত্তির লোভী ছিলাম না। চাইলে বাংলাবাজার থেকে অনেক টাকা আনতে পারতাম। কিন্তু আমরা যে দরিদ্র ছিলাম, সেই দরিদ্র রয়ে গেছি। আমি একটা কিন্ডার গার্টেনে চাকরি করতাম, তিন হাজার টাকা বেতনে। বর্গা জমিতে চাষ করতাম। করোনার কারণে আমার চাকরি চলে যায়। এখন মাকসুদ মাঝে মাঝে কিছু টাকা দেয়। শুরুর দিকে বিশ হাজার টাকা দিয়েছিল।
আমার বাবার যখন ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসা খরচ একটা বিরাট বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তখন আমার বাবা থেকে সম্পত্তি কিনে নেয়ার আশ্বাসে দুই-তিন লাখ টাকার মতো চিকিৎসা খরচ দিয়েছিলেন নূরুল আনোয়ার। কথা ছিল এক মাসের মধ্যে সব টাকা পরিশোধ করে জায়গাগুলো কিনে নেবে। তবে সেটা নেয়া হয়নি।
আমরা বইয়ের রয়্যালটির হিসাব বুঝতাম না। আহমদ ছফার বইগুলো যে একটা সম্পদ সেগুলো হাওলাদার আমাদের শিখাইছে। এর আগ পর্যন্ত আমরা জানতাম না যে বইগুলো একটা সম্পদ এগুলোর সঙ্গে একটা টাকার বিষয় আছে।
আহমদ ছফার সম্পত্তিগুলো নূরুল আনোয়ার ভোগ করছেন। আপনারা জানেন, বাংলাদেশে বাবার বাড়ির সম্পদ মেয়েরা পায় না, আনতে পারে না। বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়েদের প্রতি সমস্ত দায়িত্ব শেষ।
ওদের চার ভাইয়ের বিরোধের কারণে আহমদ ছফার বইয়ের কপিরাইটের বিষয়টি আমরা জানতে পারি। চার ভাইয়ের দুই ভাই হাওলাদারের পক্ষে এবং অপর দুই ভাই অন্য প্রকাশনীর পক্ষে অবস্থান করে। তারা তারপর আমার কাছে আসছে।
সে বলে যে, তোমাদের খুঁজে বের করতে আমার লাখ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তোমাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তো আমি তাকেও কিছু বলতে পারি না। যেহেতু নূরুল আনোয়ার আমাদের মালিক বলে স্বীকার করতেছে না, আরেকজন আমাদের মালিক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই করতেছে।
হাওলাদারের (প্রকাশনী) সঙ্গে কোনো অভিযোগ নাই। হাওলাদার কোনো ভুল করে থাকলে সেটা আমরা বুঝব। হাওলাদারের সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্ক।
তবে নূরুল আনোয়ার বিষয়ে অভিযোগ হলো, নূরুল আনোয়ার আমাদের দেখাশোনা করার কথা ছিল। যেমন আমার মা মারা গেছেন ২০০৮ সালে, এরপর আমাদের দেখাশোনার কথা ছিল। আহমদ ছফার রয়্যালটির টাকা থেকে আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বটা উনি নেন নাই।
নূরুল আনোয়ার আমরা যেন হাওলাদার প্রকাশনীর সঙ্গে চুক্তি করতে না পারি সে জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। হাওলাদারের সঙ্গে আহমদ ছফার বই প্রকাশের চুক্তি হয়েছিল আপন দুই ভাইয়ের সঙ্গে। পরে যখন হাওলাদার আমাদের সঙ্গে চুক্তি করতে চাইলেন, তখন নূরুল আনোয়ার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেন। তিনি চেয়েছিলেন, আমাদের তার পক্ষ নিয়ে হাওলাদারকে বের কের দিই। তিনি আমার কাছ থেকে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) নিয়েছিলেন। আমি তখন বলেছিলাম, আপনি যখন আমার কাছ থেকে আমমোক্তারনামা নিয়েছেন আপনি আমার পরামর্শ মতো কাজ করবেন। আমার পরামর্শ ছিল, আহমদ ছফার সাহিত্য নিয়ে কাউকে হয়রানি করা যাবে না। যেহেতু ওই লোকটা নিরপরাধ (মাকসুদ), ওই লোকটাকে আপনার ভাই বই দিয়েছিল বিধায় বই ছাপানো হয়েছিল। এ বিষয়ে মীমাংসায় আসতে হবে। তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে কোনো মীমাংসায় যাব না। আমি বলেছিলাম, আহমদ ছফার বই ছাপানোর কারণে কাউকে আমি পথের ভিখারি বানাতে পারব না।
শামসুল আরেফিনের অন্দরমহল বইয়ে রেখা আছে আহমদ ছফার সমস্ত সম্পত্তির মালিক বিলকিস খাতুন।
আহমদ ছফার একুশে পদক বিলকিস খাতুনের নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা নিয়েছেন নূরুল আনোয়ার সেটা করেন নাই।
নূরুল আনোয়ার চাইছে আহমদ ছফার বংশে কেউ লেখাপড়া না করুক।
আমি নিরপেক্ষ কমিটিকে স্বাগত জানাই। নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে নতুনভাবে প্রকাশক নির্ধারণ করে নতুন করে রয়্যালটি নির্ধারণ করতে বলছে। তবে আহমদ ছফার জীবদ্দশায় একমাত্র ওয়ারিশ ছিলেন তার বোন বিলকিস খাতুন। বিলকিস খাতুনের ওয়ারিশদের প্রাধান্য দিতে হবে।
আমি কপিরাইট অফিসে নূরুল আনোয়ারকে বলেছিলাম, যেহেতু আপনাদেরও অধিকার আছে, আমাদেরও অধিকার আছে, সেহেতু আপনারা আমাদেরটা স্বীকার করে নেন, আমি আপনাদেরটা স্বীকার করে নিই। আমি বলছি, প্রতিটা মানুষ সুখে থাকুক, মানুষ শান্তিতে বেঁচে থাকুক।
মো. মাকসুদ
নূরুল আনোয়ারের দুই ভাই, বিলকিস খাতুনের এক ছেলে, এক মেয়ে হাওলাদার প্রকাশনীকে বই প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন, সে হিসাবে আমরা বই প্রকাশ করছি। আমাদের বইয়ের স্বত্ব হিসাবে লেখা আছে আহমদ ছফার উত্তরসূরিরা। সে হিসেবে নূরুল আনোয়ারও এসব বইয়ের কপিরাইট পান। আমরা তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়েও দিতে চেয়েছি।
ওনার বিরুদ্ধে আশি লাখ টাকার উকিল নোটিশ মনজুরুল ইসলামই করেছেন। আমরা প্রকাশক হিসেবে সেটা নূরুল আনোয়ারের কাছে পাঠিয়েছি। আমরা যার বই প্রকাশ করি আমরা তারই লোক।
আহমদ ছফার জীবিত থাকাকালীন পাঁচ খণ্ডে তার রচনাবলী সন্দেশ থেকে বের হয়েছিল। সেগুলো শেষে হয়ে গেলে পরে নূরুল আনোয়ার খান ব্রাদার্স থেকে পুনরায় প্রকাশ করেন। সেখানে নূরুল আনোয়ার নিজের ভূমিকা যুক্ত করেন এবং স্বত্ব নিজের করে নেন। সন্দেশ থেকে প্রকাশিত বইগুলোর স্বত্ব ছিল আহমদ ছফার নামে। যে পাঁচ খণ্ড তিনি জীবিত থাকাকালে প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলোই তার মৃত্যুর পর নূরুল আনোয়ার নয় খণ্ডে প্রকাশ করেন।
নূরুল আনোয়ার খান ব্রাদার্স বিষয়ে যে কথাগুলো বলেন, তাও পুরোপুরি সত্য নয়। খান ব্রাদার্স আহমদ ছফা জীবিত থাকা অবস্থায় তার বই প্রকাশ করে। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বইও আহমদ ছফার অনুরোধে খান বাদ্রার্স প্রকাশ করেছিল, যা সবার জানা।
আমাদের কাছে দশ লাখ টাকা দাবি করে উকিল নোটিশ দিয়েছিলেন নূরুল আনোয়ার। এরপর তিনি আমাকে হুমকিও দিতেন। এ জন্য আমরা চাঁদাবাজির মামলা করি। পরে ২০১৯ সালে কপিরাইট অফিসের অনুরোধে সবপক্ষের মামলা প্রত্যাহার হয়।
আহমদ ছফার যে ১০ বইয়ের কপিরাইট নিয়ে সংকট
‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’, ‘বাঙালী মুসলমানের মন’, ‘গাভী বৃত্তান্ত’, ‘সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস’, ‘অলাতচক্র’, ‘আহমদ ছফা গল্পসমগ্র’, ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস-আহমদ ছফা’, ‘প্রবন্ধসমগ্র আহমদ ছফা’ (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড)।
কপিরাইট অফিসের রায়
কপিরাইট অফিস আহমদ ছফার সান্নিধ্য লাভ করেছেন এমন কয়েকজন লেখকের মতামত গ্রহণ করে। তার মধ্যে রয়েছেন ড. সলিমুল্লাহ খান, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ও মাহমুদুল নিজামী। তারা একমত হন যে আহমদ ছফার শক্তিশালী সমাজদর্শন, তত্ত্বসমৃদ্ধ ক্ষুরধার লেখা এ দেশের অমূল্য সম্পদ। তার কালোত্তীর্ণ রচনা মানবকল্যাণ, দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তাই দেশ ও জনগণের স্বার্থে কোনোভাবেই আহমদ ছফার রচনাবলি প্রকাশ বন্ধ করা সমীচীন হবে না। বরং তার লেখা কীভাবে সহজলভ্যভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই উপায় বের করা জরুরি।
পাশাপাশি তারা এ অভিমতও ব্যক্ত করেন যে আহমদ ছফার বোনের উত্তরাধিকারীরা অত্যন্ত হতদরিদ্র। দীনহীন অসহায় অবস্থায় দিনযাপন করছেন তারা। মুসলিম আইন অনুযায়ী যেহেতু তারা উত্তরাধিকারী, তাই প্রাপ্য রয়্যালটি থেকে তাদের বঞ্চিত করা ঠিক হবে না।
এ অবস্থায় নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে বই প্রকাশ করার বিষয়ে মত দেন কপিরাইট নিবন্ধক। কপিরাইট ডেপুটি রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রামের চন্দনাইশের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ড. সলিমুল্লাহ খানের মতো খ্যাতিমান গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, নূরুল আনোয়ার কিংবা আহমদ ছফার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে নিয়ে এ কমিটি গঠন করা যেতে পারে বলে মত দেওয়া হয়।