অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে পরিবর্তন এনে নিম্নপর্যায়ের ক্যাডার পদের সংখ্যা কমিয়ে তার পরিবর্তে বাড়তি উচ্চপদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে বাহিনীটির পক্ষ থেকে। পুলিশ সুপার (এসপি) ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (এএসপি) কিছু পদ বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়তি পদ সৃষ্টির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে পুলিশ। গত ২ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত বিদ্যমান বিভিন্ন ইউনিটের কাঠামো হতে বিভিন্ন পদবির ক্যাডার পদ বিলুপ্ত করে ঊর্ধ্বতন ধাপে সমসংখ্যক ক্যাডার পদ সৃষ্টি করতে হবে। তার মধ্যে এসপির ২০টি ও এএসপির ২০৮টিসহ ২২৮টি পদ বিলুপ্ত করে অতিরিক্ত আইজিপির ৪টি, ডিআইজির ১৮টি, অতিরিক্ত ডিআইজির ১০০টি, এসপির ২০টি ও অ্যাডিশনাল এসপির ৮৬টি পদ সৃষ্টি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ২০টি এসপি পদ বহাল রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে। এমন খবরে বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারাসহ বাহিনীটির ননক্যাডার কর্মকর্তারা হতাশা প্রকাশ করলেও ক্যাডার কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত এই সংস্কারের পক্ষে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পদ সৃষ্টি হলে বাহিনীর কাজে জবাবদিহি আরও বাড়বে। পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত পদোন্নতি পাবেন। কোনো ধরনের জটলা তৈরি হবে না। পাশাপাশি পুলিশের কাজের গতিও বেড়ে যাবে। তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করছেন নিচের পদগুলো বিলুপ্ত করলে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পদোন্নতির সমস্যা হবে। এতে বঞ্চিত হবেন অনেকেই।
পুলিশের জনবল কাঠামোতে সংস্কারের এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে পুলিশ প্রশাসনে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। এ প্রসঙ্গে গতকাল রাতে তিনি টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিচের পদ বিলুপ্ত করে উচ্চপর্যায়ের পদ সৃষ্টি করলে পুলিশ প্রশাসনে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে। পর্যাপ্তসংখ্যক ননক্যাডার পদ থাকা জরুরি। কারণ তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্ত করে থাকেন। কর্মকর্তাদের নতুন পদ সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু নিচের পদ বিলুপ্ত করে নয়।’
পুলিশের জনবল কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবের চিঠিটি পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সঙ্গে তাদের আলোচনা হবে। কীভাবে বিষয়টির সমাধান করা যায় তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ও আলাদাভাবে আলোচনা করবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশকে জনগণের পুলিশ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ চলছে। এই করোনাকালে পুলিশের প্রতিটি সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। পুলিশে নতুন পদ সৃষ্টি হলে পুলিশ লাভবান হবে নাকি বঞ্চিত হবে তা পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশের যাতে মঙ্গল হয় সেই দিকটিই আমরা বিবেচনায় রাখব।’
প্রস্তাবিত এই সংস্কারের পক্ষে রয়েছেন পুলিশ বাহিনীর ক্যাডার কর্মকর্তারা। পুলিশের ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চপর্যায়ে নতুন পদ সৃষ্টি হলে পুলিশের জন্য ভালো। নিচের পদ বিলুপ্তি হলে কোনো সমস্যা হবে না। যারা পদোন্নতি পাবেন তারাই উপরের দিকে আসবেন। পদগুলো সৃষ্টি হলে কারোরই সমস্যা হওয়ার কথা না। আশা করি পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবেচনার আওতায় আনবে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চপর্যায়ে নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়ে আমরা ওয়াকিবহাল। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি মহোদয়ের সঙ্গে আমরা দেখা করেছি। নিচের পদ বিলুপ্ত করলেও ২০৮টি এএসপি পদ বিলুপ্ত করা হবে না বলে তারা মৌখিকভাবে আমাদের জানিয়েছেন। ইন্সপেক্টরদের সবসময় স্বপ্ন থাকে পদোন্নতি পেয়ে এএসপি হওয়ার। ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টর থেকে অনেকে এএসপি হয়েছেন। সামনে আরও হবেন।’
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা আরও বলেন, ‘উচ্চপর্যায়ের নতুন পদ সৃষ্টি হলে পুলিশের জন্যই ভালো। ভবিষ্যতে পুলিশই লাভবান হবে। পুলিশের উন্নয়নের জন্য আইজিপি স্যার নিরলসভাবে কাজ করছেন। নতুন পদ সৃষ্টি হলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জন্য কোনো সমস্যা হবে না।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত ২ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ওঅ্যান্ডএম) এস এম মোস্তাক আহমেদ খান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত বিদ্যমান বিভিন্ন ইউনিটের কাঠামো হতে বিভিন্ন পদবির ক্যাডার পদ বিলুপ্ত করে ঊর্ধ্বতন ধাপে সমসংখ্যক ক্যাডার পদ সৃষ্টির প্রস্তাব সূত্রোক্ত ‘ঘ’ স্মারকমূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (পুলিশ ও এনটিএমসি) সভাপতিত্বে চলতি বছরের ১০ জুন একটি সভায় পুনরায় পদের নাম ও কাঠামো সংশোধন করে অর্গানোগ্রাম পাঠোনোর জন্য বলা হয়। পরে ওই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত পদের নাম ও সাংগঠনিক কাঠামো সংশোধন ও সংশোধনের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রস্তাব স্মারক ‘ক’ মূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ওই চিঠিতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে ২০টি এসপি ও ২০৮টি এএসপি পদ বিলুপ্তি করে চারটি অ্যাডিশনাল আইজিপি (গ্রেড-২), ১৮টি ডিআইজি (গ্রেড-৩), ১০০টি অ্যাডিশনাল ডিআইজি (গ্রেড-৪), ২০টি এসপি (গ্রেড-৫) এবং ৮৬টি অ্যাডিশনাল এসপির (গ্রেড-৬) পদ সৃষ্টি এবং ১২২টি যানবাহন (জিপ) কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা।
পুলিশে কর্মরত মাঠপর্যায়ের কয়েকজন পরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সারা দেশে সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) পদ শূন্য রয়েছে ৭০টি। এছাড়া আরও প্রায় ৩০ জন এএসপির অবসরে চলে যাওয়ার কথা। ১৯৯০ সালে এসআই হিসেবে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্য চাকরি জীবনে পদোন্নতি পেয়েছেন মাত্র কয়েকবার। একই ব্যাচের ক্যাডার কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়েছেন ৫ থেকে ৬ বার। বিভাগীয় পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে দীর্ঘ জটিলতা। এসব জটিলতা নিরসনের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর উদ্যোগ নিলে পরিদর্শকদের জন্য নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। ওই পদটির নাম রাখা হয় (ডিএসপি)। ডিএসপি পদ থাকলেও ওই পদে কোনো বাড়তি সুবিধা পাবেন না পরিদর্শকরা। তারা আরও জানান, পরিদর্শক থেকে এএসপি পদে পদোন্নতি না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপপরিদর্শক বা সাব-ইন্সপেক্টররাও (এসআই) পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। যদিও কয়েক মাস আগে ৫০ জনের বেশি পরিদর্শক পদোন্নতি পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ বেশি বয়সে পদোন্নতি পেলেও তারা বয়সজনিত কারণে ভালো পদোন্নতি পাচ্ছেন না। ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা যায়।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের নিচের পদ বিলুপ্ত হলেও কোনো সমস্যা হবে না। কারণ গত ৮ আগস্ট ১০০ পরিদর্শককে এএসপি হিসেবে পদোন্নতি দিতে একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। সমস্যা হলে এতজনকে পদোন্নতি দেওয়া হতো না। উচ্চপদ সৃষ্টি হলে পুলিশের প্রতিটি কর্মকর্তাই লাভবান হবেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে পুলিশে ক্যাডার পদের সংখ্যা ৩ হাজার ১২৩ জন। এছাড়া ৬ হাজার ৮৯৬ জন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) এবং ২৪ হাজার ৪২২ জন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদের কর্মকর্তা রয়েছেন। ক্যাডার পদের মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপি আছেন ১৮ জন, ডিআইজি আছেন ৬৭ জন, অ্যাডিশনাল ডিআইজি আছেন ১১২ জন, এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা আছেন ৫৯৩ জন, অ্যাডিশনাল এসপি আছেন ৯৫২ জন এবং এএসপি আছেন ১৩৮০ জন।
ডিএমপির কয়েকটি থানার ওসি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্নাতকোত্তর শেষ করে ২০০০ সালে এসআই হিসেবে পুলিশে চাকরি নেন। তাদের সহপাঠী যারা এএসপি হিসেবে পুলিশের চাকরিতে প্রবেশ করেছেন তাদের অধিকাংশই এখন অতিরিক্ত ডিআইজি। ওইসব ক্যাডার কর্মকর্তা ৪ থেকে ৫টি পদোন্নতি পেয়েছেন, অথচ চাকরি জীবনে তারা (পরিদর্শক) মাত্র একবার পদোন্নতি পেয়েছেন। তাদের চাকরির বয়স প্রায় শেষ পর্যায়ে, কিন্তু পদ থাকার পরও পদোন্নতি হচ্ছে না। পরিদর্শক থেকে এএসপি পদোন্নতি পাওয়া তাদের প্রাণের দাবি।