অফিসে বসে কাজ করছি, একটি অপরিচিত মোবাইল ফোন থেকে আমার মোবাইলে একটা ফোন কল এলো। যেহেতু আজকাল স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট আমাদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে এবং ট্রু কলার নামক একটি অ্যাপসের কারণে আজকাল অপরিচিত ফোন নম্বরও পরিচিত হয়ে ওঠে। আমি অবাক হয়ে গেলাম বাংলাদেশের মাননীয় সাবেক প্রধান বিচারপতি আমাকে কল করেছেন। একটু ঘাবড়ে গেলাম, নিজেকে সামলে নিলাম। স্যার, সম্বোধন করে সালাম বিনিময়ের পরে, তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গেই আমার কাছে জানতে চাইলেন আমি ফ্রি আছি কি না। তিনি আমাকে চায়ের দাওয়াত দিলেন, আমিও গ্রহণ করে বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রস্তুত আছি বলে ফোনালাপ শেষ করে অফিসের টেবিলে বসে ভাবছি। কী নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতে চান তিনি। যেহেতু আমি ব্যাংকে কাজ করি, তাই আমার সঙ্গে আইনের কী সম্পর্ক বুঝতে পারছিলাম না। এও বুঝতে পারছিলাম না আইন কমিশনের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক।
আইন কমিশনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৯ সালের দিকে, জনাব মো. সাইফুল আলম তখন আইন কমিশনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর থেকে আইন কমিশনের সঙ্গে কমবেশি যোগাযোগ না থাকলেও খোঁজখবর পেতাম বা রাখতাম। একজন চেয়ারম্যান ও দুজন মেম্বার বা সদস্য নিয়ে আইন কমিশন গঠন করা হয় এবং বিভিন্ন সময়ে বদলির মাধ্যমে সহকারী জজ থেকে শুরু করে জেলা জজ পদমর্যাদার লোকবল নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান চলতে থাকে।
২০১৯ সালের শেষের দিকে হবে, শীত তখনো আসেনি, তবে বেলা ছোট হতে শুরু করেছে। আমি মতিঝিল থেকে চলে গেলাম কলেজ রোডে। লিফট ধরে প্রথমে চলে গেলাম বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবিরের চেম্বারে। যিনি সদস্য হিসেবে আইন কমিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য একজন সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক পদ থেকে ছুটি নিয়ে এখানে এসে কাজ করতেন। তিনি তার আগের স্থানে ফিরে যান এবং কিছুদিন পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এরপর থেকে সদস্যের একটা পদ এখনো খালি আছে। ফলে একজন চেয়ারম্যান ও একজন মেম্বার দিয়েই আইন কমিশন চলছে এখন।
বিচারপতি ফজলে কবির আমাকে কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কক্ষে নিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কুশলাদি জানার পর তিনি সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন। বিকেলের নাশতা আগেই আনা ছিল, ডায়াবেটিস সন্দেশ, বিস্কুট, কাজুবাদাম আর কফি। খেতে খেতে আলাপ করে যাচ্ছি। আমাকে কিছু প্রশ্ন করলেন, ব্যাংক নিয়ে। আমি যা জানি টুকটাক উত্তর দিচ্ছিলাম, ভয়ে ভয়ে। ভয়টা এজন্য যে, তিনি যখন আইন পেশায় ছিলেন, তখন বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে আইনি পরামর্শ দিতেন। ফলে তার সামনে বসে তাকে ব্যাংক নিয়ে আমি কী পরামর্শ দেব বা প্রশ্নের উত্তর দেব। সে সময় আমাদের আলাপে ছিলেন, আইন কমিশনের কতিপয় কর্মকর্তা। অর্থাৎ সিনিয়র জজ সাহেবরা। তিনি আমাকে জানালেন একটা ব্যাংক-সংক্রান্ত কাজে আমার কিছু সাহায্য লাগবে। একটা কমিটি হয়েছে, সেই কমিটিতে কাজ করতে রাজি আছেন শ্রদ্ধেয় ইব্রাহিম খালেদ স্যার (বর্তমানে প্রয়াত)। আমি কিছু অবদান রাখতে পারি কি না, তিনি প্রস্তাব করলেন। আমি লুফে নিলাম সেই প্রস্তাব। আমি জানালাম, আমি স্বেচ্ছায় কাজ করব তবে আমাকে কোনো সম্মানী দিতে হবে না। বরং এই টিমে আমি কাজ করলে আমার জ্ঞান কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। বিচারপতি মহোদয় আমাকে জানালেন, তিনি অবগত আছেন যে, আমার পিএইচডির বিষয় ছিল ই-ব্যাংকিং। ফলে তিনি আমার ওপরে ভরসা করছেন।
এরপর আমাকে অনেকবার আইন কমিশনে যেতে হয়েছে, মিটিংয়ে বসতে হয়েছে। টুকটাক কিছু পরামর্শও আমি দিয়েছি। আমার তরফ থেকে আমি একটা রিপোর্টও দিয়েছি। যার কারণে আমার সঙ্গে আইন কমিশনের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়েছে। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আমার ফোনে কথাও হয়েছে। তার আচরণ ও ব্যবহার আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। প্রতিবার তার কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখেছি। একটা ঘটনার কথা না বললেই নয়। একবার আইন কমিশন থেকে একসঙ্গে বের হব, আমার সঙ্গে গাড়ি নেই জেনে আমাকে তার গাড়িতে উঠতে বললেন, পাশে বসালেন। আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। ছেলেকে (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) ডেকে আমার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিলেন। বসতে দিলেন তার ব্যক্তিগত চেম্বারে। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত শুধু বই আর বই দিয়ে দুটি কক্ষ সাজানো। কফি দিয়ে আমাকে আপ্যায়ন করলেন। কিছুক্ষণ পরে আমি অনুমতি নিলাম বাসায় যাওয়ার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে তার পুত্রকে ডেকে গাড়ি পর্যন্ত এসে ড্রাইভারকে ডেকে আমাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বললেন। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম শ্রদ্ধেয় খায়রুল হক স্যার কত বড় মাপের মানুষ। যখনই ফোন করতেন বা করেন প্রথম প্রশ্ন থাকে আমি ফ্রি আছি কি না, যদি থাকি তবেই কথা বলতে চান।
সেখানে কাজ করতে গিয়ে আমি খেয়াল করেছি, এখানে যারা কাজ করছেন তারা সবাই মাঠপর্যায়ে জজিয়তি করেছেন। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে তারা তো গবেষক না, শুধু নামের পাশেই গবেষণা কর্মকর্তা লিখে দিলেই কি গবেষক হওয়া যায়? গবেষণা করার জন্য একটা নিয়ম বা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। নিজেকে তৈরি করতে হয়। মোদ্দাকথা, গবেষণার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হয় নিজেকে।
আইন কমিশন পঁচিশ বছরে পা দিলেও এখনো নিজস্ব লোকবল নেই, এটা ভাবা যায়? এটা এমন একটা প্রতিষ্ঠান যেখানে আইন নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অনেক গবেষণার সুযোগ থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আইন কমিশনকে আরও গতিশীল করার জন্য আমার প্রস্তাব হবে, এর ৪০ শতাংশ নিজস্ব লোকবল নিয়োগ দিয়ে আর বাকি ৬০ শতাংশ প্রেষণে বা বদলি হয়ে আসা লোকবল দিয়ে এই কমিশনকে সাজানো যেতে পারে। যেহেতু সবাই বাইরে থেকে আসে, ফলে তিন বছর পরপর তাদের বদলি হতে হয় বিধায় এখানে তারা মনোনিবেশ করতে পারেন কি না সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। গবেষণা কোনো রুটিনকাজ না। এখানে সেমিনার হবে, প্রশিক্ষণ হবে, তার জন্য দরকার প্রশিক্ষিত ও স্থায়ী জনবল।
একজন চেয়ারম্যানের সঙ্গে দুজন সদস্য থাকবেন, একজন সদস্যের তত্ত্বাবধানে থাকবে একটা উইং, যেখানে মহাপরিচালক থাকবেন সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তি, যার অর্থনীতিতে পিএইচডি থাকা আবশ্যিক। তাকে বলা যেতে পারে মহাপরিচালক (গবেষণা, অর্থ ও প্রশাসন) যেমনটা ইংল্যান্ডের আইন কমিশনে আমরা দেখতে পাই। যেখানে একজন ইকোনমিক অ্যাডভাইজার আছে। এখানে পূর্ণাঙ্গ গবেষণার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট ও মাঠপর্যায়ের কিছু ডেটা নিয়ে কাজ করতে হয়। এই উইং শুরু হবে সহকারী পরিচালক (গবেষণা) থেকে এবং মহাপরিচালক দিয়ে শেষ হবে। পদোন্নতির দ্বারা উপপরিচালক, পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক পদ পূরণ করতে হবে। সাধারণত; ৩ বছর অন্তর অন্তর এরা পদোন্নতির জন্য যোগ্য হবেন। এই উইংয়ের লোকবল নিয়োগের ক্ষমতা আইন কমিশনের হাতে ন্যস্ত থাকবে, অর্থাৎ কমিশনের ৩ সদস্য এই নিয়োগের জন্য যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটিই চূড়ান্ত। তবে মহাপরিচালক (গবেষণা) সেই কমিটিতে থাকতে পারবে। তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী পরিচালক (গবেষণা) পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে মহাপরিচালক (গবেষণা, অর্থ ও প্রশাসন) পদে এখন যেহেতু কোনো লোকবল নেই তাই আইন কমিশন প্রথমবারের মতো সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবেন। অন্য সদস্যের তত্ত্বাবধানে থাকবে অন্য উইং। তাকে সাহায্য করবেন সহকারী জজ থেকে জেলা জজ পদমর্যাদার জনবল, যারা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এই আইন কমিশনে কাজে লাগাবেন। তারা নিয়ম করে তিন থেকে চার বছর পরপর বদলি হবেন, তবে মহাপরিচালকসহ (গবেষণা, অর্থ ও প্রশাসন) এই উইংয়ে যারা কাজ করবেন এদের কোনো বদলি হওয়ার সুযোগ থাকবে না, এরা হবেন আইন কমিশনের নিজস্ব ও স্থায়ী লোকবল। তাদের বেতন কাঠামো হবে সরকারি বেতন স্কেল ২০১৫-এর অনুরূপ। এদের নিয়োগ, পদোন্নতির ক্ষমতা আইন কমিশনের নিজের হাতেই থাকবে। সহকারী পরিচালক (গবেষণা) পদে যোগ দেওয়ার পর তাদের তিন বছরের মধ্যে অবশ্যই কমপক্ষে স্বীকৃত জার্নালে একটা প্রকাশনা থাকতে হবে। উল্লেখ্য, আইন কমিশনে একজন বা দুজন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা নিয়োগ করা যেতে পারে। যারা কি না কম্পিউটার নিয়ে ডিপ্লোমা করেছেন। এই পদের জন্য অনার্স বা মাস্টার্স অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
এই দুই ধরনের লোকবলের সমন্বয়ে আইন কমিশনকে এগিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। আজ ৯ সেপ্টেম্বর আইন কমিশনের ২৫ বছর পূর্তিতে সময় এসেছে নতুন করে সাজিয়ে এই কমিশনের মাধ্যমে দেশের সেবা করার। চিন্তা ও চেতনায় চির তরুণ বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেশের আইন কমিশন এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
লেখক ব্যাংকার ও গবেষক
liplisa7@gmail.com