ইপিবি থেকে দোকান বরাদ্দ নিয়ে তিনগুণ দামে বিক্রি!

প্রথমবারের মতো নতুন ঠিকানা ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী ২৬তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। গতকাল শনিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার মেলা দেখতে রাজধানীর শের-ই বাংলা নগরের পুরনো ঠিকানা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বাণিজ্যমেলার নতুন ও স্থায়ী ঠিকানা রাজউকের নতুন শহর পূর্বাচলে ২০ একর জমির ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে যেতে হবে।

তবে মেলার উদ্বোধন হয়ে গেলেও কয়েকটি স্টল বাদে বেশিরভাগ স্টলের নির্মাণকাজই এখনো শেষ হয়নি। এছাড়া মেলার দোকান বরাদ্দে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে নির্ধারিত মূল্যে দোকান বরাদ্দ নিয়ে দ্বিগুণ দামে বিদেশি ও দেশি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে দালাল চক্র। অন্যদিকে মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও তাদের কর্মীদের থাকার জন্য পূর্বাচলের আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোতে নেওয়া হচ্ছে গলাকাটা ভাড়া। স্বাভাবিক সময়ে দুই কক্ষের যে ফ্ল্যাটের ভাড়া ৫ হাজার টাকা তা এখন নেওয়া হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকা।

ইপিবি থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এবারের বাণিজ্যমেলায় মোট ২২৫টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বর্গফুট হিসেবে একেক দোকানের মূল্য একেক রকম ধরা হয়েছে। এরমধ্যে মেলার ভেতরের ২০ বর্গফুট আয়তনের দোকানগুলো ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি বা তার একটু বেশি দামে ১ মাসের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর ১০ বর্গফুটের দোকানগুলো বরাদ্দ হয়েছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকায়। এবারের মেলায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এক্সিবিশন সেন্টারের নিজস্ব জায়গায় (প্রায় ১,৫৫,০০০ বর্গফুট আয়তন) ২টি হলে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরির ২৩টি প্যাভিলিয়ন, ২৭টি মিনি প্যাভিলিয়ন, ১৬২টি স্টল ও ১৫টি ফুড স্টল দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বছর দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, তুরস্ক, ভারত ও  থাইল্যান্ডসহ ১১টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মেলায় অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, একটি দালাল চক্র ইপিবির কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে দোকান বরাদ্দ নিয়ে তা দ্বিগুণ দামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে। যারা চেষ্টা করেও দোকান বরাদ্দ পাননি তারা নিরুপায় হয়ে চড়া দামে দালালদের কাছ থেকে দোকান নিতে বাধ্য হচ্ছেন। দালাল চক্র ১০ বর্গফুটের দোকান বিক্রি করছে ৫-৬ লাখ টাকায়। ইপিবি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দালাল চক্র এসব করছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

তারা আরও জানান, মাহবুবুর রহমান ও তার সহযোগী আওলাদ নামে দুই ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে দোকান বিক্রি করছে।

ভারতের কাশ্মীর থেকে আসা আরিফ নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, তিনি গত ১১ বছর ধরে বাণিজ্যমেলায় অংশ নিয়ে পণ্য বিক্রি করে আসছেন। তবে এবার পূর্বাচলে মেলার আসর বসায় তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এবারের আসরে তারা ব্যবসায়ী ও কর্মীসহ কাশ্মীর থেকে প্রায় দুইশ জন এসেছেন। তিনি সরাসরি ইপিবির কাছ থেকে ১০ বর্গফুটের দুটি দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। যার প্রতিটির মূল্য পড়েছে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। তবে তার সঙ্গের অনেক ব্যবসায়ীই দোকান বরাদ্দ না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি দামে দালালদের কাছ থেকে দোকান কিনেছেন বলে জানান আরিফ। যার মূল্য পড়েছে ৫-৬ লাখ টাকা।

কাশ্মীরি এই ব্যবসায়ী অভিযোগ করে আরও বলেন, পূর্বাচলে থাকার জন্য দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকা। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে দুই কক্ষের ফ্ল্যাট ভাড়া এত বেশি না। বেশি ভাড়া নেওয়া ঠেকাতে ইপিবি কর্র্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই ব্যবসায়ী।

আদিল নামে আরেক কাশ্মীরি ব্যবসায়ী জানান, পূর্বাচলের রাস্তাগুলোতে কোনো সড়ক বাতি না থাকায় রাতে একপ্রকার ভয়ংকর পরিবেশ বিরাজ করে। এ কারণে তারা রাস্তাঘাটে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে টাকা-পয়সা থাকে, ছিনতাইকারী যদি নিয়ে যায় তাহলে আমাদের কে দেখবে? আমরা তো এখানে তেমন কাউকে চিনিও না। আবার পূর্বাচলে বাড়িভাড়া ১০ গুণ বেশি নেওয়ায় কষ্ট করে এক ফ্ল্যাটে ২০-২৫ জন করে থাকতে হচ্ছে।’

মেলা উদ্বোধন হয়ে গেলেও স্টল নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে এই কাশ্মীরি ব্যবসায়ী বলেন, ‘মেলা কর্র্তৃপক্ষ কার্যক্রম শুরু করতে দেরি করায় স্টল নির্মাণে দেরি হচ্ছে। স্টল নির্মাণ শেষ হতে আরও ৪-৫ দিন সময় লাগতে পারে। এই ৪-৫ দিন তো আমাদের লোকসান গুনতে হবে। একদিকে দালালদের কারণে অধিক মূল্যে দোকান কিনতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে ৪-৫ দিনের আগে দোকানের নির্মাণকাজ শেষ হবে না। দোকান নির্মাণকাজ শেষ না হলে মেলাও তেমন জমবে না।’

ব্যবসায়ীদের কাছে বাড়তি দামে স্টল বিক্রির ব্যাপারে অভিযোগ পেয়ে তার সত্যতা যাচাই করতে এই প্রতিবেদক স্টল ক্রেতা সেজে দালাল চক্রের অন্যতম সদস্য মাহবুবুর রহমান ও তার সহযোগী আওলাদের সঙ্গে দেখা করেন। স্টল কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলে ১০ বর্গফুটের দোকানের জন্য মাহবুবুর রহমান দাম চান ৬ লাখ টাকা। এর কম হলে তিনি দোকান দিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। এ সময় পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিজেকে বাণিজ্যমেলার ‘পার্টিসিপেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক বলে দাবি করেন।

পরে এই প্রতিবেদক নিজের প্রকৃত পরিচয় দিয়ে বাড়তি দামে স্টল বিক্রির বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি কারও কাছে অধিক মূল্যে স্টল বিক্রি করিনি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ তখন ক্রেতা সেজে তার কাছে স্টল কিনতে যাওয়ার বিষয়টি জানালে তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে রাগারাগির একপর্যায়ে ফোন রেখে দেন।

স্টল বরাদ্দে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইপিবির সচিব ও বাণিজ্যমেলার পরিচালক ইখতেখার আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবছরই মেলা শুরুর দুই-তিনদিন পর স্টল নির্মাণ সম্পন্ন হয়। এখানে এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার আসর বসেছে। বিদেশি ব্যবসায়ীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে দালালদের কাছ থেকে দোকান কিনবে কেন? এটি সম্পূর্ণ তাদের দোষ। এক মাস আগেই স্টল বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তাদের উচিত ছিল আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দোকান নেওয়া।’

পরে ইপিবির মহাপরিচালক-১ মাহবুবুর রহমানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো পাইনি। যেহেতু বিষয়টি এখনই আপনার কাছ থেকে জানলাম, তাই দালাল দৌরাত্ম্যের বিষয়টি আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। আমরা দোকান বরাদ্দ দেওয়ার সময় উৎপাদনকারী ব্যবসায়ী যারা তাদের যাচাই করেই দোকান বরাদ্দ দিয়েছি। তবে কেউ যদি দোকান বরাদ্দ পেয়ে বিক্রি করে দেয় তাহলে সেটি কন্ট্রোল করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য।’

পূর্বাচলের আশপাশে অতিরিক্ত বাড়িভাড়া আদায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি আমি শুনেছি। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ উপজেলায় গড়ে উঠছে পূর্বাচল উপশহর। পূর্বাচলের কাঞ্চন ব্রিজের কাছে ৪ নম্বর সেক্টরে তৈরি করা হয়েছে ঢাকা বাণিজ্যমেলার স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র।

প্রতিদিন সকাল ১০টায় শুরু হয়ে মেলা চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত মেলার দ্বার উন্মুক্ত থাকবে। আগের মতো এবারও মেলায় প্রবেশের টিকিটের দাম শিশুদের জন্য ২০ টাকা আর বড়দের জন্য ৪০ টাকা। দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য থাকছে শাটল সার্ভিস। কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচ থেকে মাসজুড়ে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ১৫টি করে মোট ৩০টি বাস চলাচল করবে।

করোনা মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনায় এক্সিবিশন সেন্টারের সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম সংখ্যক স্টল-প্যাভিলিয়ন বসানো হয়েছে। এবারে ছোট-বড় মিলিয়ে ২২৫টি স্টল-প্যাভিলিয়ন দিয়ে সাজানো হয়েছে। এর আগে ঢাকার শের-ই বাংলা নগরে আয়োজিত মেলায় ২০১৯ সালে ৫৫০টি এবং ২০২০ সালে ৪৫০টি স্টল-প্যাভিলিয়ন বসেছিল। করোনা মহামারীর কারণে গত বছর মেলা বসেনি।