নসিমনে ট্রেনের ধাক্কা, নিহত ৩

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন একটি রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় ইঞ্জিনচালিত একটি ভটভটির (নসিমন) তিন আরোহী নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে আলীনগর হাজির মোড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য ওই রুটে রেল চলাচল বন্ধ ছিল।

জেলা ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, নিহতরা হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ভুতপুকুর মহল্লার মৃত গরীবুল্লাহর ছেলে ফুলচান (৫৫), আলীনগর মহল্লার রইসউদ্দিনের ছেলে সেহের আলী (৪৪) ও ভটভটির চালক আমনুরা কেন্দুল গ্রামের মানিক চাঁদের ছেলে নাইমুল ইসলাম (৩৫)। তারা সবাই পেশায় মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ওবায়দুল্লাহ জানান, সকাল সাড়ে ৮টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশন থেকে ঈশ্বরদীর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ৬ ডাউন রাজশাহী মেইল কমিউটার ট্রেনটি হাজির মোড় এলাকায় অনির্ধারিত রেলক্রস করার সময় একটি ভটভটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ভটভটিতে থাকা তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর ৬ ডাউন ট্রেনটি ওই এলাকায় প্রায় আধঘণ্টা আটকা পড়ে। পরে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল সাড়ে ৮টার সামান্য পরে আলীনগর স্কুল সংলগ্ন রেলক্রসিং থেকে ভটভটিটি দ্রুতগতিতে হাজির মোড়ের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় ট্রেনের সঙ্গে ‘পাল্লা’ দিয়ে ভটভটিটি হাজির মোড় রেলক্রসিংয়ে দ্রুতগতিতে উঠে পড়লে ট্রেনটি সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ভটভটিতে থাকা তিনজনই ট্রেনের নিচে পড়ে যান এবং যানটি ছিটকে প্রায় ১৫০-২০০ গজ দূরে গিয়ে পড়ে। ট্রেনের নিচে পড়া তিনজনের দেহই ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিহতরা সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিউ মার্কেটের মাছের আড়তে মাছ বিক্রি করে বাড়ি ফিরছিলেন।

লালচান্দ আলী নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘চালকের অসচেতনতায় তিনজনই মারা গেল। মাত্র এক থেকে দেড় মিনিট অপেক্ষা করলেই ট্রেনটি চলে যেত। আর তারা তিনজনই নিরাপদে রেললাইন পার হয়ে যেতে পারত।’

এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক একেএম গালিভ খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি নিহত তিনজনের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকার চেক দেন।

পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের মধ্যে সেহের আলী ও ফুলচানকে বিকেল সাড়ে ৪টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের খালঘাট গোরস্তানে দাফন করা হয়েছে।

অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ের কারণে সারা বছর দেশে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত মানুষ। হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষতিও। এ ক্ষত জীবনভর বেড়াতে হচ্ছে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের। গত ডিসেম্বরেও মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামে তিনজন, নরসিংদীর রায়পুরায় একজন এবং ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় দুজন নিহত হন। ওইসব দুর্ঘটনার সবই ঘটেছে ‘গেটম্যানের অবহেলায়’ অথবা গেটম্যান নেই এমন অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ে। রেলওয়ের উদাসীনতার পাশাপাশি এসব দায় আছে দুর্ঘটনার শিকার বাহনের চালকেরও।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং বা রেলক্রসিং আছে ২ হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৮টি ক্রসিংই অনুমোদনহীন। অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন এসব রেলক্রসিংয়ের মধ্যে আবার ২ হাজার ১৭০টিতে কোনো গেট নেই, নেই কোনো গেটম্যান। অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ ক্রসিংই অরক্ষিত! বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, দেশে গত প্রায় তিন বছরে রেল দুর্ঘটনায় সারা দেশে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে কিংবা আহত ও পঙ্গু হয়েছে তার ৮৯ শতাংশই এসব অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে।