অনেকেই বলেন আইন না থাকার চেয়ে খারাপ আইনও ভালো। কথাটা যে কত বিপজ্জনক মিথ্যা তা বাংলাদেশের অনেক আইন দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না কারও। ঠিক তেমনি সব বিরোধী রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও অংশীজনের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন সংসদে বিপুল কণ্ঠ ভোটে পাস হয়ে গেল। সংবিধানে আইনি ভিত্তির ওপর নির্বাচন কমিশন গঠনের ঘোষণা থাকলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও শাসকশ্রেণি নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহে পদাধিকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইন প্রণয়ন না করে সংবিধান লঙ্ঘন করে দেশ পরিচালনা করে এসেছে। গণতন্ত্রমনা জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত সংগোপনে, প্রায় রকেটের গতিতে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন প্রণয়ন করে কি ইতিহাসে আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় রচিত হলো?
সংসদেই আইন প্রণয়ন হয়। কিন্তু আইন হলেই কি তা গণতান্ত্রিক হয়? স্বাধীনতার পর সংবিধানের ২য় সংশোধনীর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার মৌলিক অধিকার পরিপন্থী কালো আইন প্রণয়নের সিংহদ্বার উন্মোচন করে। যার ফলে মৌলিক অধিকার হরণকারী নিবর্তনমূলক কালো আইনের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে বিরোধী মত দমনের আইন প্রণয়ন করেছে। সর্বশেষ সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্বাচনী ফল নিশ্চিতকরণের আইন সংসদে পাস করল আওয়ামী লীগ।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যখন ডায়ালগ করতে গেলাম তখন তিনি বললেন, বিলটা তাড়াতাড়ি পাসের বিষয়ে। তিনি (রাষ্ট্রপতি) চান এই বিলের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত হোক। এরপর বিল আমরা সংসদে নিয়ে এলাম। কিন্তু প্রস্তুতি তো আমাদের বহু আগে থেকে ছিল। অন্য কোনো দল করেনি। আওয়ামী লীগ করল। এতে জনগণের ভোট সুরক্ষিত হলো। গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করলাম। প্রধানমন্ত্রীর কথাকেই তো সত্য ধরতে হবে তাহলে সময় নেই বলে আইনমন্ত্রী যে বলেছিলেন সেটা নিশ্চয়ই মিথ্যা।
যখন বাংলাদেশের ক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের কথা বলছে, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা নির্বাচন কমিশন আইনের প্রয়োজনীয়তা এবং ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের দাবি জানিয়েছে তখন একদিকে রাষ্ট্রপতি সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, অন্যদিকে সরকার নিজেদের সুবিধামতো আইন পাস করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। এই আশঙ্কা অমূলক হবে না যে অতীতের অনেক আইনের মতোই এই আইনও ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হবে। কৌশলে সরকার বিজয়ী হলেও এটা নৈতিক হলো কি না এই প্রশ্ন থাকবে বহু দিন। সরকারের প্রণীত এই আইন ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতোই আবার কীভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায় তারই নীলনকশা মাত্র বলে অনেকেই অভিমত জানিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ নির্বাচন কমিশনই জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবেন। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে যখন দাবি করা হয় নির্বাচন কমিশন সব সময় স্বাধীন ছিল, তখন মøান হাসি হাসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
২০১৪ সালে নির্বাচনের পর বলা হয়েছিল এটি অনেকটা নিয়মরক্ষার নির্বাচন। কিন্তু তাতে নিয়মরক্ষা হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল আমাদের ওপর ভরসা রাখুন একটি ভালো নির্বাচন হবে।
নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আছে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তাহলে আগামী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। অর্থাৎ নির্বাচনের আরও এক বছর ১০ মাস বাকি। কিন্তু নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য বা অংশগ্রহণমূলক হবে, নির্বাচনের পূর্বশর্ত যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তা কীভাবে সৃষ্টি হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সেই সরকার কী ভূমিকা পালন করবে এ নিয়ে গুরুতর সন্দেহ এবং অবিশ্বাস রয়েই গেছে। অতীতের স্মৃতিগুলো তো দগদগে ঘায়ের মতো শুধু যে যন্ত্রণা দিচ্ছে তা-ই নয়, গন্ধও ছড়াচ্ছে ভীষণ। এসব আলোচনা সরিয়ে রেখে নির্বাচনী ঢোল বাজানো শুরু হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান করাটাকেই যারা গণতন্ত্র বলে মনে করেন এবং মানুষকে সেটাই বিশ্বাস করাতে চান তারা খুবই তৎপর যেভাবেই হোক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। তাদের কারণে খারাপ নির্বাচনও আইনি বৈধতা পেয়ে যায়। তাদের যুক্তি হলো নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে খারাপ নির্বাচন ভালো। তাই মানুষ ভোট দিক বা না দিক পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন করার নিয়মমাফিক কাজ করতেই তাদের সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে। নিয়মের সঙ্গে নৈতিকতা যে গুরুত্বপূর্ণ সেটাকে বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। বিরোধী দল যদি নিয়ম মেনে অনৈতিক নির্বাচনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় তখন বিজয়ী পক্ষ বলতে থাকে আপনারা তো পারেননি কিছু করতে। অর্থাৎ নির্বাচনী জালিয়াতি বা ডাকাতি যাই বলেন না কেন ঠেকাতে তো পারেননি, কারণ জনগণ আপনাদের সঙ্গে নেই। সোজা ভাষায় বললে, ডাকাতি যেহেতু ঠেকাতে পারো নাই তাই মেনে নাও, ডাকাতের হাতে সর্বস্ব তুলে দিয়ে জীবনটা কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখো। এভাবে জীবন বাঁচলেও তা যে মরার মতো বেঁচে থাকা সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না।
মানুষ যেন ভুলে যেতে বসেছে মতপ্রকাশ, মতপ্রচার ও মতের আদান-প্রদানের মাধ্যমে মতামত যাচাই করা যে গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। মতপ্রকাশ এবং প্রচারের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং মত যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচন। দুটোর কোনোটাই আছে বলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরে আর কোনো রাজনৈতিক দল মনে করে না। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের জোট ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও নানান সময়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কথা প্রকারান্তরে বলছেন। এমন কথা তো এখন প্রচলিত যে আগের মতো আর কিছুই নেই। এমনকি নির্বাচনও আগের মতো হয় না। আগে মানুষ ভোট দিত দিনের আলোয়, গণনা হতো সন্ধ্যায় এবং তারপর থেকে কেন্দ্রে ও কেন্দ্রীয়ভাবে ফলাফল ঘোষণা হতো। এখন পরিকল্পনা হয় দিনে, ভোট হয় রাতে, গণনার তেমন গুরুত্ব নেই, ফল ঘোষণা হলেই সব ঠিক হয়ে যায়। এর ফলে নির্বাচন নামক কর্মযজ্ঞ হারিয়ে ফেলেছে তার গ্রহণযোগ্যতা আর বিজয়ী বলে যাদের ঘোষণা করা হয় তাদেরও থাকে না জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে গণতান্ত্রিকচর্চা যে নিম্নগামী তা গত ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখলে আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হবে না। স্বাধীনতার পর ৫০ বছর পার হয়েছে কিন্তু দেশে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়নি। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে আছে, বাংলাদেশে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। ৫০ বছর পার হলো, নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন হলো। অবশ্য আইনমন্ত্রী বলেছেন এটা নির্বাচন কমিশন আইন নয় ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের আইন। এর আগে আইন ছিল না এখন আইন হলো।
নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ এ কথা কেউ অস্বীকার করেন না। কিন্তু অন্য অঙ্গগুলো দুর্বল করে বা অস্বীকার করে শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যরক্ষা হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আবার এটা সবাই স্বীকার করবেন যে নির্বাচনে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের সবচেয়ে নিচের ধাপ এবং সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, জমজমাট নির্বাচন হয়ে থাকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন। এবার সেখানেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক পড়েছে যেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল কর্র্তৃক মনোনীত মানেই নির্বাচিত।
দেশে এখন নির্বাচনী ব্যবস্থা তিনটি ‘এম’ দ্বারা প্রভাবিত এ কথা সবাই জানেন। ‘মানি’, ‘মাসল’ এবং ‘ম্যানিপুলেশন’Ñ এই তিনটির মধ্যে টাকার প্রভাব যে সবচেয়ে বেশি তাও নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নির্বাচনে মনোনয়ন দান এবং নির্বাচিতদের দেখলেই বোঝা যায়। ফলে যারা জনগণের জন্য লড়ছেন তাদের নির্বাচনে প্রচণ্ড অসম যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ফলাফল টাকাওয়ালারাই বিজয়ী এবং বিজয়ী হয়ে আরও টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এই টাকা শোষণমূলক রাষ্ট্রেরও নিয়ম মেনে অর্জিত নয়। ফলে ক্ষমতা ও অর্থের এই আকর্ষণের কাছে চাপা পড়ে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এখন অবশ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও জটিল ও দুষ্টচক্রে বাধা পড়েছে। পয়সা, পেশি, প্রচারণা, প্রতীক, পুলিশ ও প্রশাসনের মেলবন্ধনে পর্যুদস্ত হচ্ছে প্রতিপক্ষ।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে রাতের ভোট কথাটি বহুল প্রচারিত শব্দ। নির্বাচন কমিশন প্রথমে এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বলেছিলেন, আগামী দিনে ভোটে ইভিএম শুরু করে দেব, তাহলে সেখানে আর রাতে বাক্স ভর্তি করার সুযোগ থাকবে না।
নির্বাচনের একটা বড় বিষয় জবাবদিহি। গায়ের জোরে বা নৈশকালীন কৌশলে ক্ষমতায় থাকার সংস্কৃতি দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়েছে যেমন, তেমনি দায়হীন মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে। তাই গণতান্ত্রিক চেতনা রক্ষা আর মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন যেমন দরকার, তেমনি দরকার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। কারণ ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে তা যে সুষ্ঠু হয়নি এ কথা তো দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। এ ধরনের নির্বাচন ক্ষমতায় থাকার জন্য কার্যকর হলেও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক।
গায়ের জোর আর গলার জোরে অনেক কিছু করা গেলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তির জোর ছাড়া গণতন্ত্র যে চর্চা করা যায় না তা বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় জেনেছে। সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলা আর ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত’ হয়েছে এই ঘোষণার পর বিপুল করতালির নিচে চাপা পড়ে গেল দীর্ঘশ্বাস। প্রশ্ন উঠছে, সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আকাক্সক্ষা কি জয়যুক্ত হলো? অনাস্থার সংসদে উচ্চকণ্ঠে আইন পান হলেও গণতন্ত্রের কণ্ঠ কি মুক্ত থাকবে?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com