সড়কে নরক নেমে আসার কালে

কোনো কোনো দুর্ঘটনাকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষত, যখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একইভাবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাগুলো দিন দিন এমন সব ভয়াবহতা নিয়ে সামনে এসে হাজির হচ্ছে যে, এসব ঘটনাকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে মেনে নিতে আর রাজি নন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো বছরের পর বছর ধরে যেভাবে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে তাতে এখন এসব দুর্ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত না করে ‘কাঠামোগত হত্যাকা-’ বলাই শ্রেয়। এ তো গেল সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞদের কথা। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারান সেই সব পরিবারের সদস্যদের কথা কি আমরা শুনতে পাই? কক্সবাজারের চকরিয়ায় বাবার শ্রাদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মঙ্গলবার যে পরিবারের পাঁচ ভাই একত্রে নিহত হলো একটি ভ্যানের চাপায়, ওই পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা কি কারও আছে? এভাবে সড়কে নরক নেমে আসার কালে মানুষ কার কাছে বিচার চাইবে? স্বজন হারানোর বেদনায় কোথায় গিয়ে সান্ত¡না খুঁজবে?

চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজরা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায় মঙ্গলবার ভোরে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল তার ভার বহন করা সত্যিই অসম্ভব বলে মনে হয়। ডুলাহাজরার রিংভংপাড়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক সুরেশ চন্দ্র শীল পরলোকগমন করেন মাত্র সপ্তাহখানেক আগে। সুরেশ চন্দ্র শীলের ৯ ছেলেমেয়ে শ্মশানে বাবার শ্রাদ্ধের পূজা দিয়ে একত্রে বাড়ি ফিরছিলেন। মালুমঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পার হওয়ার জন্য তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এসময় সবজিবোঝাই একটি পিকআপ বেপরোয়া গতিতে এসে তাদের চাপা দেয়। এতে ৭ ভাইবোন গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে মালুমঘাট খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যান। দায়িত্বরত চিকিৎসক অনুপম শীল (৪৭), নিরূপম শীল (৪৫), দীপক শীল (৪০), চম্পক শীলকে (৩৫) মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া গুরুতর আহত স্মরণ শীলকে (২২) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে রেফার করেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সেখানে আইসিইউতে মারা যান তিনিও। আহত রক্তিম শীল, প্লাবন শীল ও ইরা শীলকে মালুমঘাট খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডুলাহাজরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর জানিয়েছেন, ভয়াবহ এই ঘটনায় পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা প্রশাসন এই ট্র্যাজেডির শিকার পরিবারটিকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পিকআপ ভ্যানটিকে আটক করা সম্ভব হলেও ভ্যানটির চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছে। তবে, এই ঘটনায় মামলা করা হয়েছে এবং চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ডুলাহাজরা ট্র্যাজেডির দিনই সারা দেশে আরও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে বেশ কয়েকজনের। দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং প্রাণহানির হিসাব করলে এই দিনটিকে হয়তো আর বিশেষ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। কেননা, পরিসংখ্যান বলছে দেশে গড়ে প্রতিদিনই প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান সড়ক দুর্ঘটনায়। একেকটি দুর্ঘটনা একেকটি পরিবারের জন্য সারা জীবনের অভিশাপ বয়ে নিয়ে এলেও সরকারি হিসাবে সব দুর্ঘটনা আর মৃত্যু কেবলই সংখ্যা মাত্র। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সারা দেশ তোলপাড় হয়ে গেলেও গত তিন বছরেও যে দেশে সড়ক নিরাপত্তার কোনো উন্নতিই হয়নিসেটা বলাই বাহুল্য। পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে উল্টো দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুদুটোই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৮০৩ জনই শিক্ষার্থী। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ১৩ শতাংশই শিক্ষার্থী। সড়ক দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যুকে হত্যা বলে মনে করছেন সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশ আর মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। তবু সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ বাস্তবায়নে সরকারের পদক্ষেপ কোথায়? গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ, দক্ষ চালক তৈরি, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, মহাসড়কে স্বল্প গতির যানবাহন চলাচলের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণসহ আইনটি বাস্তবায়নের কোনো সুপারিশই কি বাস্তবায়ন হচ্ছে? এই অবস্থায় পরিবহন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যই যথার্থ বলে মনে হয়। তারা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার সমস্যাটি আসলে রাজনৈতিক; কারিগরিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, সরকার কি এই বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ রাখবে?