ছাত্রদলের কমিটি জটে দুর্বিষহ জীবন

অনিয়মিত কাউন্সিল এবং যথাসময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় দীর্ঘ জট বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোতে। ছাত্রদল থেকে বাদ পড়া নেতারা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল কিংবা অন্য কোনো সংগঠনেও জায়গা পাচ্ছেন না। সরকারবিরোধী রাজনীতি করার কারণে মামলায় বিধ্বস্ত এসব নেতাকর্মী সরকারি চাকরিও পাচ্ছেন না।

জীবিকার জন্য কেউ বেছে নিয়েছেন পাঠাও-উবারের রাইড শেয়ারিং, কেউ ঢাকা ছেড়েছেন। কেউ আইন বিষয়ে পড়ে পেশায় ঢুকেছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ব্যবসা করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন সাবেক নেতার সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন দুরবস্থার কথা জানা গেছে। তারা বলছেন, এই অবস্থা শুধু কেন্দ্রেই নয়, মহানগর-শহর ও জেলা-উপজেলা পর্যায়েও রয়েছে। এমন নেতার সংখ্যা হাজারের বেশি বলে তারা জানান।

ছাত্রদলের রাজীব-আকরাম কমিটির সম্পাদকম-লীতে ছিলেন এমন এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। রাজনীতি করবেন বলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের চেষ্টা করেননি। কিন্তু সংগঠনের পরের কমিটিতে তার জায়গা হয়নি। এমনকি যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলেও ঠাঁই হয়নি তার।

নাম প্রকাশ না করে এই নেতা বলেন, একদিকে পদহীন এবং অন্যদিকে চাকরি না থাকায় এখন ঢাকায় থাকতেই তার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীতে এক বাড়ির দারোয়ানের থাকার জন্য করা ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছেন। তাও নিয়মিত ভাড়া দিতে পারছেন না। খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই। সারা দিন ঘুরেফিরে রাতে গিয়ে সেখানে ঘুমান।

একই কমিটির আরেক সম্পাদক ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে থাকতেন। রাজনীতির কারণে চাকরি নেননি। পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারছেন না লজ্জায়। একপর্যায়ে ঢাকায় টিকে থাকার জন্য বস্তিতে ঘর ভাড়া নেন। সেখানে থাকতে না পেরে সম্প্রতি স্বল্প বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

একই কমিটির শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক আবু ফায়সাল জিহাদ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে সরকারি চাকরির বয়স শেষে হয়ে গেছে। তিন বছর ধরে ছাত্র, যুব বা স্বেচ্ছাবেক দলের কোনো পদে নেই তিনি।

জিহাদ হতাশা প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে পরিচিত বন্ধুবান্ধব দূরে দূরে থাকে। সাহায্য-সহযোগিতা চাইতে পারি এমন ধারণার কারণে ক্যাম্পাসের বন্ধুরা দূরে দূরে থাকে।’ এভাবে রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে তার।

ছাত্রদলের রাজীব-আকরাম কমিটির অর্থ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি চাকরি হবে নাএমন আশঙ্কা থেকে আবেদনও করেননি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি নেননি। ঢাকায় টিকে থাকতে না পেরে কুষ্টিয়ায় ফিরে গেছেন পরিবারের কাছে। ছোট ভাইয়ের সহযোগিতায় ব্যবসা করার চিন্তাভাবনা করছেন।

যে কারণে জট লেগেছে : ছাত্রদলের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। কিন্তু নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটিও নিয়মিত হয় না। এতে করে সংগঠনের নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণে অনেকেই পদপ্রার্থী হয়ে যান। তাদের মধ্যে সবাই তো আর নেতা হতে পারেন না। সে কারণে যাদের নেতৃত্বে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাদের অনেকেই বাদ পড়ে যান।

ওই নেতাকর্মীরা বলছেন, কাউন্সিল না হওয়ায় ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলকে সভাপতি ও হাবিবুর রশীদ হাবিবকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। এরপর দুটি কমিটি হলেও জুয়েল-হাবিব কমিটির কেউ কেউ এখনো পদহীন রয়েছে।

একই কারণে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজীব আহমদকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। সেই কমিটির মেয়াদ শেষে ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২৭ বছর পরে হওয়া ওই কাউন্সিলে সভাপতি পদে ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক পদে ইকবাল হোসেন শ্যামল নির্বাচিত হন। অবিবাহিত ও ছাত্রদের হাতে ছাত্রদলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার কারণে অনেকে বাদ পড়েন। এর বাইরে খোকন-শ্যামল তাদের কমিটি পূর্ণাঙ্গ না করার কারণে অবিবাহিত ও ছাত্রত্ব আছে এমন অনেক নেতা বাদের তালিকায় চলে গেছেন।

ছাত্রদলের কমিটিগুলো থেকে বাদ পড়া নেতারা যুবদলের রাজনীতি করার আশায় বুক বাঁধতে থাকেন; বিশেষ করে জুয়েল-হাবিব কমিটি ও রাজীব-আকরাম কমিটিতে জায়গা না পাওয়া অথবা মেয়াদ শেষে পদহীন হয়ে যাওয়া নেতারা আশায় ছিলেন যুবদলের রাজনীতিতে ঠাঁই হবে তাদের। এ অবস্থায় ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ সাইফুল আলম নিরবকে সভাপতি ও সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়ে গঠিত এ কমিটির মেয়াদ ছিল তিন বছর। মেয়াদ শেষের মাত্র এক মাস আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ২৭১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে জমা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ১১৪ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেই আংশিক কমিটিতেও ছাত্রদলের সাবেক নেতারা জায়গা পাননি। সামনে কবে যুবদলের নতুন কমিটি হবে, কবে আবার পদ পাবেন তারা, সেই নিশ্চয়তাও নেই।

এমন অনিশ্চয়তার কারণে কেউ কেউ আইন বিষয়ে পড়ালেখা করে পেশায় প্রবেশ করেছেন। কারণ তত দিনে তাদের আর চাকরির বয়স নেই।

এমনই একজন হলেন সাদিউল কবির নীরব। তিনি ছাত্রদলের রাজীব-আকরাম কমিটিতে সহসভাপতি পদে ছিলেন।

নীরব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জীবনের তাগিদে আইনজীবী হলেও রাজনীতি করার ইচ্ছা আছে। যুবদলের রাজনীতি করতে চাই।’

ছাত্রদলের বাদ পড়া নেতাদের কেউ কেউ স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করলেও সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করা এবং সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি ঘোষণা না করায় সেখানে বাদ পড়া ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢুকতে পারছেন না। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি ও আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাবু মারা গেলে সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার ৭ বছর আগে ২০০৯ সালের ১১ অক্টোবর হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সভাপতি ও সরাফত আলী সপুকে দলের সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ৭ বছরেও তারা সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি। তার ১৩ বছর আগে ১০ মার্চ ১৯৯৬ রুহুল কবির রিজভীকে সভাপতি ও ফজলুল হক মিলনকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি করা হয়েছিল।

যারা ব্যর্থ, তারা কেন বারবার দায়িত্বে: দীর্ঘদিনের পদহীন নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা নিজের সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারে না, আন্দোলন-সংগ্রামেও ভূমিকা রাখতে পারে না, তাদের কেন ধাপে ধাপে ছাত্রদল থেকে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই নেতাকে ছাত্রদল, ছাত্রদল থেকে আবার যুবদল কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দলের দায়িত্বে না এনে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

যা বলছেন নেতারা: যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নিরব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা দিয়েছিলাম। কিন্তু ঘোষণা করা হয়েছে আংশিক। এখন আবার কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার চেষ্টা করছি আমরা।’

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল বলেন, ‘আমরা ৩১১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে দিয়েছিলাম। সেখান থেকে ১৪৯ জনের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।’

ছাত্রদলের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেছেন, তারা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ করছেন। কিন্তু এখনো শেষ করতে পারেননি। শিগগিরই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে জানান তিনি।