ড. মল্লিকের জাতীয়তাবাদ বয়ান ও কিছু কথা

ড. মারুফ মল্লিক, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে স্কলার ও দেশের স্বনামধন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত পত্রিকায় তিনি নিয়মিত রাজনীতি নিয়ে লিখছেন। সম্প্রতি তিনি জাতীয়তাবাদ নিয়ে একটি বই লিখেছেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: নাগরিক ও জাতিবাদি জাতীয়তাবাদের সংকট’ নামে।

বইটিতে তিনি সচরাচর আলোচনা বাইরে জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ও গবেষণাধর্মী আলোচনা করেছেন। তিনি জাতিবাদি, নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক এমনিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দোদুল্যমানতায় আছি। নতুন করে ড. মল্লিকের জাতীয়তাবাদের বয়ান আমাদের জাতীয়তাবাদের আলোচনায় নতুন রসদ যোগ করছে।

ড. মল্লিক নাগরিক জাতীয়তাবাদকে বলেছেন উদার, সার্বজনীন  ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ আর জাতিবাদি জাতীয়তাবাদকে বলেছেন অনুদার, নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র। জাতিবাদি জাতীয়তাবাদকে তিনি অন্য সংস্কৃতি থেকে নিজেকে পৃথক করা বা শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া বলেছেন। জাতিবাদী ও নাগরিক জাতীয়তাবাদের ত্রুটি হচ্ছে, তা নাগরিককে বিভাজন করে ফেলে। যদিওবা সর্বজনীনতা ও একত্ববাদিতা ছাড়া দুই জাতীয়তাবাদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠে এতে জাতিগত বিভাজন, ভাষাগত বিভক্তি, ধর্মীয় পার্থক্য ও বর্ণগত শ্রেণিবিন্যাস সমাজে দৃশ্যমান থাকে না। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশগুলো রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করতে শুরু করে। ১৯৯০-এ বার্লিন দেয়ালের পতন, নিওলিবারেল অর্থনীতির ব্যর্থতা এই জাতীয়তাবাদকে প্রাসঙ্গিকতা দেয়। 

তিনি গারভিনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, আধুনিক জাতীয়তাবাদের ধারণা জাতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও উত্তর আধুনিক ধারণায় রাষ্ট্রই এখানে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কথা, যেটি একটি রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র। ইউরোপ থেকে বিভিন্ন জাতের লোক গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নামক রাষ্ট্রটি গড়ে তুলে। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোও এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক মূলত বাঙালি, বাংলাদেশি নাকি মুসলমান কোনটা আমাদের জাতীয়তাবাদ তা নিয়ে। মারুফ মল্লিক বলছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে প্রভাবিত হয়েই বাংলাদেশের সৃষ্টি হলেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রাপ্তি সে জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে প্রতিস্থাপিত করে। সেই সাথে সক্রিয় আছে মুসলমান জাতীয়তাবাদও।  

তিনি বলছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক জাতিবাদি জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত প্রাচীনকাল থেকে নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে। আবার এই অঞ্চলে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও হাজার বছরের। তিনি বলছেন, ১৯০৫ সালে যে বঙ্গভঙ্গ ও তার পরবর্তী রাজনীতি তা পূর্ব বাংলায় মুসলমান জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটায়। এই জাতীয়তাদের উত্থান ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে। তিনি ১৯৪৭ পূর্ব বাংলার পাকিস্তানে যোগদানকে দ্বিজাতিতত্ত্ব মানতে নারাজ, বলছেন মূলত অর্থনৈতিক শোষণ থেকে বাঁচতে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে পূর্ব বাংলার মানুষ। পাকিস্তান আমলে যেমন পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য ছিল তেমনি অখণ্ড বাংলায় পশ্চিম বাংলার বর্ণ হিন্দুদের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। কলকাতা ও রাওয়ালপিন্ডির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতেরা ভোগবিলাসে যখন ব্যস্ত তখন পূর্ব বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠী ম্যালেরিয়া ও কলেরায় ভুগে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। এমনকি পূর্ব বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে পশ্চিম বাংলার নানাবিধ বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে কলকাতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে বাঁচতে নাগরিকেরা মুসলিম জাতীয়তাবাদে ঝুঁকেছে।

১৯৪৭-এ পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার প্রেক্ষাপট আলোচনায় তিনি বলছেন, সে সময় কংগ্রেস বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেছে। অন্যদিকে কমিউনিস্টরা তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে জমিদারদের সঙ্গে আপস করেছে। আর সামন্তবাদী জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে মুসলিম লীগ। ফলে পূর্ব বাংলায় মুসলমান জাতীয়তাবাদ দৃঢ় হয়েছে। তিনি এ-ও বলছেন বাঙালি ও মুসলমান জাতীয়তাবাদ দুইটায় শক্তিশালী জাতীয়তাবাদ হলেও তা ‘আমরা’ ও ‘তাহারা’ বিভাজনে দুষ্ট।  এই সংকটের মাঝখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের উত্থান। মূলত সব জাতি, ধর্ম ও বর্ণকে নিয়ে একটি সর্বজনীন জাতি গঠনই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শিক ভিত্তি বলেই মারুফ মল্লিকের বিশ্লেষণ।

তিনি দাবি করছেন, ধর্ম নিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক কোনো ভিত্তি নেই। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণায় ধর্ম ঢুকে গিয়েছিল। ধর্মের উপাদানের সাথে সাংস্কৃতিক উপাদানের সংঘাত অনিবার্য ছিল। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপাদানের মিশ্রণে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তৈরি সম্ভব ছিল না। এই কারণে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশে অনেকেই ইসলাম বিদ্বেষী বলে ভাবেন। ফলে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুসলমান উপাদান ধারণ করে একসময়। অন্যদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদও একসময় সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিলীন হয়ে যায়।

তিনি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উদ্ধৃতি যোগ করেছেন যেখানে চৌধুরী বলছেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ ঢুকিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্র মনে করতেন, বাঙালিরা ভারতীয়, বাংলা ভারতের অংশ এবং ভারতীয়ত্বের মূল বন্ধন হচ্ছে হিন্দুধর্ম। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ উভয় বাংলায় ধর্ম নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।’

মারুফ মল্লিক বলছেন ধর্ম নিরপেক্ষতা একটি পশ্চিমা ধারণা যা পরবর্তীতে নিজেই একটি ধর্ম হয়ে উঠেছিল। তিনি তালাল আসাদকে কোড করে বলছেন, ‘যদি ধর্ম রাষ্ট্র থেকে আলাদা থাকে তবেও রাষ্ট্রের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব না।’ ফলে মারুফ মল্লিকের বয়ান জাতীয়তাবাদে অবশ্যই ধর্মের মিশ্রণ থাকবে।

ড. মল্লিক উভয় বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদে যে সাম্প্রদায়িকতার মিশ্রণের কথা বলেছেন তার মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় পড়তে যাওয়া এক মুসলিম শিক্ষার্থীর বয়ান এমন ছিল, তাকে প্রশ্ন করা হতো সে বাঙালি নাকি মুসলমান? অর্থাৎ প্রশ্নকর্তার কাছে বাঙালি মানে হিন্দু ও মুসলমানরা বাঙালি নয়। একই ঘটনা আসামেও। আসামে মুসলমানদের ডাকা হচ্ছে ‘মিয়া’ নামে। মিয়া নামের মাধ্যমে মুসলমানদের বাঙালি পরিচয়ের বিকল্প পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমান ও হিন্দু উভয়ই আসামিজ কিন্তু হিন্দুরা বাঙালি মুসলমানরা মিয়া। যদিওবা মিয়া নামে ডাকা এক প্রকার গালিই যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ডাকা হয় ‘নিগ্রো’। ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের সব প্রদেশে বাঙালি নামের সমার্থক শব্দ হিন্দু এবং এটা খুবই জোরালো বয়ান মুসলমানরা বাঙালি নয়।

মারুফ মল্লিক বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের ভিত্তির পর্ব ভাগ করেছেন তিনটি। এক. ১৯৪৭ এর পূর্ব, দুই. ১৯৪৭-১৯৭১ এবং তিন. স্বাধীনতার পরবর্তী সময়। সে হিসাবে পূর্ব বঙ্গের মানুষের মধ্যে শুরুতে মুসলমান জাতীয়তাবাদ, পরবর্তীতে বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদ ও পরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। তিনি দাবি করছেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল দার্শনিক ভিত্তি ছিল বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ। যদিওবা তার বিশদ ব্যাখ্যা দেননি। কিন্তু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে তিনি বলেন, তিনি পাকিস্তানের কারাগারে পাকিস্তানিদের বলেছিলেন,  ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না।’ ফলে বঙ্গবন্ধু তার বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্ব দুই পরিচয়ই জীবিত রেখেছেন।

তবে মারুফ মল্লিক বলছেন, দেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় সংবিধান রচনার সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বহুত্ব’কে অস্বীকার করেছিল। এছাড়া ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল বয়ান ছিল পশ্চিম বাংলা থেকে আসা শরণার্থী মুসলমানরা। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সে জাতীয়তাবাদ পূর্ব বাংলার মানুষকে ছুঁতে পারেনি বলে তার দাবি। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এই দেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষাকে ছুঁতে পারেনি। 

১১০০ বছর ধরে বাংলাদেশ ভূ-খণ্ড অবাঙালির দ্বারা শাসিত হয়েছে। ১৯৭১ সাল হচ্ছে জাতির সে অমরত্ব কাহিনি যার মাধ্যমে বাঙালির শাসনভার বাঙালির হাতে আসে। দিল্লি শাসিত পশ্চিম বাংলাকে বাঙালি শাসিত বলতে নারাজ তিনি। বাংলার একাংশ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার নতুন জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে সেটা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। জাতিত্ব নৃ-তাত্ত্বিক হলেও জাতীয়তা রাজনৈতিক। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয়। ফলে আমাদের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় বাঙালি হলেও আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় বাংলাদেশি।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি।