রিভিউ

বদরুদ্দীন উমরের জীবন ও কাজ নিবেদিত প্রবন্ধাবলি: একটি বিশ্লেষণ

বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশে এক বহুল পরিচিত নাম। তিনি নব্বই বছর অতিক্রম করেছেন। বর্তমান সময়েও সক্রিয় জীবন যাপন করছেন। দীর্ঘ জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি মার্ক্সীয় ধারার রাজনীতি সংগঠকের কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে লেখনীকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের স্বপক্ষে ব্যবহার করেছেন।

‘বদরুদ্দীন উমরের জীবন ও কাজ নিবেদিত প্রবন্ধাবলি’ শীর্ষক গ্রন্থটি বদরুদ্দীন উমরের নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষে সি আর অবরার, গোলাম মুস্তাফা, চৌধুরী মুফাদ আহমদ ও ওমর তারেক চৌধুরীর সম্পাদনায় বাঙ্গালা গবেষণা প্রকাশনা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

বদরুদ্দীন উমরের দীর্ঘ জীবন ঘটনাবহুল এবং নানা সফলতায় উজ্জ্বল। তিনি সাঁইত্রিশ বছর বয়সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। একজন রাজনীতিবিদ ও একজন লেখক হিসেবে তিনি ক্রিয়াশীল থেকেছেন। বাংলাদেশে একজন প্রধান সারির প্রাবন্ধিক ও ইতিহাসবিদ হিসেবে আমরা বদরুদ্দীন উমরকে লক্ষ্য করতে পারি। আবার সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার জন্য তিনি আমাদের কাছে আদর্শ স্থানীয়। বিগত ছয় দশকের বিরামহীন রাজনৈতিক জীবনে তিনি শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার লড়াইয়ে অবিচল সংগ্রামী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমর তার অকপট সত্য ভাষণের জন্য বিপুল মানুষের অপার শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন আবার অনেকের জন্য অস্বস্তিরও কারণ হয়ে ওঠেন।

গ্রন্থটিতে বদরুদ্দীন উমরের নানা দিকের বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এখানে উমরের রচনাসমূহের বিশ্লেষণ করে রয়েছে ১১টি প্রবন্ধ। এ ছাড়া উমরের প্রতি নিবেদিত প্রবন্ধ রয়েছে ৫টি, স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ রয়েছে ১৪টি, প্রতিক্রিয়ামূলক ৩টি প্রবন্ধ, জীবন ও কর্মের ওপর ৪টি প্রবন্ধ, বদরুদ্দীন উমরের ১টি সাক্ষাৎকার, বিবিধতে বদরুদ্দীন উমরের জীবনপঞ্জি, বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থাবলির তালিকা ও চিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। সুতরাং এটি একটি বৃহৎ কলেবরের সম্পাদনা গ্রন্থ বলা যায়। তবে বদরুদ্দীন উমরের বিশাল সংগ্রামী জীবন ও লেখালেখির ওপর একটি মাত্র গ্রন্থে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন কঠিনই বলা যায়। প্রবন্ধকারদের সুন্দর আলোচনার মধ্য দিয়ে পাঠকগণ উমরের জীবনের নানা দিকের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।

গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের নাম ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এটি বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও সমালোচক, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ কাজী আবদুল ওদুদ রচনা করেছেন। এখানে লেখক উমরের দুটি আলোচিত লেখা ‘বাঙ্গালী সংস্কৃতির সংকট’ ও ‘সাম্প্রদায়িকতার’ ওপর আলোকপাত করেছেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আবদুল ওদুদ মন্তব্য করেছেন,

‘সাম্প্রদায়িকতা বইটিতে বদরুদ্দীন উমরের মুখ্য পরিচয় এই যে তাঁর বিশেষ প্রবণতা যুক্তিবাদ ও বস্তুতান্ত্রিকতার দিকে। এটিতেই তাঁর মুখ্য পরিচয় বটে, কিন্তু তাঁর বাঙালি সংস্কৃতির সংকট ভাষণটিতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তিনি শুধু যুক্তিবাদ ও বস্তুতান্ত্রিক নন, তাঁর হৃদয় ধর্মও কম প্রবল নয়। আর তার ফলে তাঁর দেশের ও জাতির সংস্কৃতি তাঁর গভীর ভাবনার বিষয় হয়েছে।’

দ্বিতীয় প্রবন্ধটি ভারতের বিশিষ্ট বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও লেখক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘অমর্ত্য সেনের সমালোচনা এবং সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’। এখানে লেখক উমরের ‘নোবেল পুরস্কার এবং অমর্ত্য সেন প্রসঙ্গে’ শীর্ষক লেখার প্রশংসা করেছেন। হীরেন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন,

“সংস্কৃতির মতো মনোজ্ঞ ও মূল্যবান প্রকাশন একান্ত দুর্লভ। দুই বাংলাতে এর জুড়ি তো দেখি না। এটা বলছি জোর দিয়ে, কারণ নভেম্বর ১৯৯৮ সংখ্যায়, ‘নোবেল পুরস্কার এবং অমর্ত্য সেন প্রসঙ্গে’ শীর্ষক আপনার অনবদ্য রচনাটির সঙ্গে তুলনীয় কিছু আমার চোখে অন্তত পড়েনি। যে সব বলবার সাহস আজ স্বঘোষিত বামপন্থীরা হারিয়ে বসেছেন, সেই কথাই যথাযথ শ্রদ্ধাসহকারে এবং যুক্তিগ্রাহ্য আকারে অকুণ্ঠে আপনি বলেছেন।”

এ ছাড়া উমরের কালজয়ী গ্রন্থ ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’র প্রতি আলোকপাত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আকমল হোসেন। তিনি ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের আকরসন্ধানী ইতিহাস’ শিরোনামে উমরের লেখার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের ওপর বশীর আল হেলাল, আহমেদ রফিক প্রমুখের রচনাবলী নিয়েও তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। পূর্ব বাংলায় মাতৃভাষা নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল তা ধর্মীয় ভিত্তিতে গড়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা নিয়ে পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধকে করে সংগঠিত ভাষা আন্দোলন আগের সব আন্দোলনের তুলনায় এক স্বতন্ত্র আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল এক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছে বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা দানের দাবি তোলা সহজ কোন বিষয় ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চেহারা বিশেষ করে পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যের নীতি যে রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করেছিল তা বিভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। ভাষা আন্দোলন চলাকালীন পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিশেষ করে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে পরিচালিত কৃষক আন্দোলন সে সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামে উজ্জ্বল হয়ে আছে। রাজনৈতিক এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি। এগুলো সামগ্রিক রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলেছিল। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আকমল হোসেন উমরের লেখনীকে যেভাবে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছেন। তার ভাষায়,

‘উমরের ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক হচ্ছে পূর্ব বাংলার সংগ্রামী জনগণ। এ উক্তির মধ্যে কোন অতিশয়োক্তি নেই। কেননা ভাষা আন্দোলন বিকশিত হয়ে যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া হয় তখন জনগণের সমর্থনে আন্দোলন এগিয়ে গিয়েছিল।’

‘বদরুদ্দীন উমরের জীবন ও কাজ নিবেদিত প্রবন্ধাবলি’ গ্রন্থের প্রত্যেকটি প্রবন্ধেই উমরের আলাদা আলাদা দিকের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। স্বল্প পরিসরের আলোচনায় সব বিষয়ে মন্তব্য করা সহজ নয়। তবে উমরের লেখা ও তার আদর্শবাদী রাজনীতির অবস্থান থেকে আমরা বলতে পারি, তার অসংখ্য রাজনৈতিক-সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা ও রচনা তাঁকে বুদ্ধিবৃত্তির জগতে ভাস্বর করে রাখবে। এ দেশে গবেষণাধর্মী কাজের সীমিত ঐতিহ্যের মধ্যে বদরুদ্দীন উমর এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তার গবেষণা একাধারে সৃজনশীল বিশ্লেষণ ও চিন্তাভাবনা এবং তথ্য-উপাত্তের উপযুক্ত প্রয়োগে নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক তত্ত্ব সৃষ্টি প্রয়াসে নিয়োজিত। আজ দেশে সামাজিক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের যুগে বদরুদ্দীন উমরের ন্যায়-নীতি নিষ্ঠা নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে আরও বহুকাল। বদরুদ্দীন উমর দীর্ঘজীবী হোন। তার হাজার বছর বাঁচা প্রয়োজন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়