বাংলাদেশের জাতীয় নারী ফুটবল দলের রক্ষণভাগ সামলানো দায়িত্ব আঁখি খাতুনের দায়িত্ব পালনে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে দেশে-বিদেশে একাধিক বার জিতেছেন গোল্ডেন বুট। অথচ নিজের পরিবারের সদস্যদের ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য একটুকরো জামি বা ঘর কোনোটিই নেই তার। এজন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০১৯ সালে শাহজাদপুর পৌরসভার মনিরামপুরে ৫ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয় তার নামে। কিন্তু স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ও সাবেক পৌর কাউন্সিলরের মামলার কারণে তিন বছরেও সেই জমি বুঝে পাননি আঁখি। তার পরিবারের সদস্যদের এখনো থাকতে হয় ঝুপড়ি ঘরে।
দেশের একাধিক সাফল্যে নেতৃত্ব দেওয়া এই ফুটবলারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পাড়কোলা গ্রামে। তাঁত শ্রমিক বাবা আক্তার হোসেন ও গৃহিণী নাছিমা খাতুনের সঙ্গে জীর্ণ ঘরে থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বাসা বাঁধে আঁখির চোখে। পাড়কোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালে ফুটবল দলে নাম লেখান আঁখি। পরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ইব্রাহিম বালিকা বিদ্যালয়ের হয়ে ২০১৪ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ খেলে সবার নজর কাড়েন আঁখি। ২০১৫ সালে তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম দেশের হয়ে খেলেন আঁখি। ২০১৭ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ওই টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে আঁখি খাতুন গোল্ডেন বুট পান। এরপর বিভিন্ন খেলায় একাধিকবার তিনি গোল্ডেন বুটে জিতেছেন।
আঁখির খেলায় আপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের মে মাসে তার পরিবারের জন্য ৫ শতক জায়গা বরাদ্দের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পরই স্থানীয় প্রশাসন শাহজাদপুর পৌরসভার মনিরামপুর এলাকার ১নং খতিয়ানভুক্ত ৫ শতক জায়গা অবমুক্ত ও নির্ধারণ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। তবে এর ১৫ দিনের মাথায় শাহজাদপুর বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর রবিন আকন্দ সে জায়গার মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন। সেই থেকে ঝুলে যায় আঁখির জমিপ্রাপ্তি। ফলে এখনো জীর্ণ কুটিরে দিন-রাত কাটছে আঁখির বাবা, মা ও স্নাতক পড়ুয়া ভাইয়ের। বৃষ্টি এলে এ ঘরের চালা দিয়ে পানি পড়ে। শোবার একটি ভালো বিছানা নেই।
আঁখি খাতুন বর্তমানে বিকেএসপির দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। জাতীয় দলের পাশাপাশি খেলেন বয়সভিত্তিক দলেও। পড়ালেখা ও অনুশীলনের জন্য তিনি থাকেন সাভারেই। ছুটিতে বাড়ি এলে মা-বাবার সঙ্গেই ওই জীর্ণ কুটিরে মাথা গুঁজতে হয় তাকে।
স্থানীয়রা বলেছেন, দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা আঁখির এ অবস্থা পুরো জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার।
আঁখির বাবা আক্তার হোসেন জানান, মনিরামপুরে জায়গাটির দাম বেশি হওয়ায় সেটি না দিয়ে অন্য একটি জায়গা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তাদের। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
তবে মনিরামপুরের জমির দখল নেওয়া রবিন আকন্দ বলেন, পত্তনি সূত্রে আমার পূর্বসূরিরা এ জমির মালিক। ওয়ারিশ হিসেবে জমি রক্ষায় আদালতে সুবিচার চেয়ে মামলা করেছি।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. শামসুজ্জোহা বলেন, এসএ, আরএসের কাগজে জমিটি ১নং খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এ জমিটি আঁখি খাতুনের নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। মামলার কারণে মনিরামপুরের জমির বদলে দ্বাবারিয়া মৌজায় আরেকটি জমি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদন হয়ে এলেই আঁখিকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।