চাহিদা দিয়েও পোশাক মিলছে না

মাত্র তিন মাসে পাল্টে গেছে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টসপল্লির চিত্র। সারা দেশ থেকে পোশাক নিতে পাইকারি এ মার্কেটে ভিড় করলেও দিতে পারছেন না বিক্রেতারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি ঈদ মৌসুমে এরই মধ্যে ধারণার চেয়ে তাদের কয়েক গুণ বেচাকেনা হয়েছে। এখনো বিপুলসংখ্যক ক্রেতা আসছেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে পর্যাপ্ত মালামাল প্রস্তুত করতে না পারায় দিতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার ধাক্কা সামলে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও চলতি ঈদ মৌসুমের ব্যবসা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন পল্লির বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। ফলে তারা পুঁজি বিনিয়োগ করে পোশাক প্রস্তুত সেভাবে করেননি। যা তৈরি করেছিলেন, এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এখন নতুন করে অনেকে পোশাক তৈরির চেষ্টা করছেন। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টসপল্লিতে প্রায় ১০ হাজার শোরুম ও ৬ হাজার কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আট লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশে তৈরি পোশাকের ৬০ শতাংশের জোগান দেয় কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টসপল্লি। এখানকার ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী নিজেরা পোশাক উৎপাদন ও বিক্রি করেন। বাকি ৩০ শতাংশ চীন, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে সরবরাহ করেন।

গতকাল রবিবার সরেজমিনে গার্মেন্টসপল্লিতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি দোকানে পাইকারদের প্রচুর আনোগোনা। ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দম ফেলার ফুরসত নেই। করোনার ঘাত কাটিয়ে দীর্ঘদিন পর পল্লির ব্যবসায়ীরা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। বেচাবিক্রিতে ব্যবসায়ীরা খুশি হলেও নাখোশ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছেন না। রোজার শুরুতেই পণ্যের সংকট হলে বছর যাবে কীভাবে? সাতক্ষীরা থেকে আসা মোহাম্মদ বাহার দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতি বছর ঈদের জন্য পণ্য কিনতে দুবার এখানে আসেন তিনি। শবেবরাতের কয়েক দিন আগে অর্ধেক পণ্য নিয়ে যান, রোজা কয়েকটার পর ফের আসেন। এবার শবেবরাতের আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকার তৈরি পোশাক নিয়েছেন, এখন এসে তিন লাখ টাকার পণ্যও পাচ্ছেন না।

মাদারীপুর থেকে আসা সাইফুর রহমান জানান, ঈদ মৌসুমের সম্পূর্ণ মালামাল এখনো তুলতে পারেননি। এখন এসে বেশি দাম দিয়েও পল্লিতে পোশাক পাচ্ছেন না। এবার ঈদে ব্যবসা করতে পারবেন না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টসপল্লির খাজা সুপার মার্কেটের জারান পাঞ্জাবি হাউজের ইনচার্জ জোবায়ের রহমান বলেন, ‘আমরা শবেবরাত থেকে ২০-২২ রোজা পর্যন্ত ব্যবসা করি। এবার শবেবরাতের মাসখানেক আগে থেকেই ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিক্রি হয়েছে। পণ্য মজুদ না থাকায় ক্রেতাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে। ১ লাখ টাকার পাঞ্জাবি চাইলে বড়জোর ২০-৩০ হাজার টাকার দিচ্ছি। সবাইকে ধরে রাখতে তো হবে।’ মেসার্স মমতা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জামাল উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বেচাবিক্রির এ ধারা চললে করোনার কারণে গত দুই বছর যে লোকসান হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। দ্রুতই হারানো পুঁজি ফিরে পাব।’

নবরাজ প্যান্ট হাউজের কর্ণধার ও আমদানিকারক জাহাঙ্গীর হাসান বলেন, ‘এখন আমরা চীন থেকে কন্টেইনারে মাল আনতে পারি না। বিমানে আনতে গিয়ে খরচ বাড়ছে। ফলে চাহিদামতো আনতে পারছি না। সঠিক সময়ে আমদানি পণ্য না পাওয়ায় একটু ঝামেলা হচ্ছে। কথা দিয়ে তা রাখতে পারছি না।’

রেইনবো এক্সপ্রেস পার্সেলের ব্যবস্থাপক রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তিন গুণ বেশি পণ্য পরিবহন করেছি আমরা। প্রতিবার শবেবরাতের পর চাপ থাকলেও বেশ আগে থেকেই পণ্য পরিবহন করছি।’

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুসলিম ঢালী বলেন, ‘ব্যবসা ভালো হলেও মালের সংকট রয়েছে। দুই বছর করোনার কারণে ব্যবসায়ীদের পুঁজি নেই। এ কারণে বেশি করে পণ্য তৈরি করতে পারেনি। ব্যাংকগুলো ঋণ দিলে এ সংকট হতো না।’

সমিতির সভাপতি স্বাধীন শেখ বলেন, ‘এবার ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। এভাবে চললে দ্রুতই আমরা করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারব।’