'দস্যু বনহুর'-এর রোমেনা আফাজের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক রোমেনা আফাজের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৩ সালের ১২ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রোমেনা আফাজের লেখা গোয়েন্দা ও রহস্য সিরিজ 'দস্যু বনহুর' ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার সৃষ্ট এই দস্যু বনহুর চরিত্রের জন্যেই মূলত তিনি বিখ্যাত। তার লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ৬টি চলচ্চিত্র। তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসাবে পরিচিত 'স্বাধীনতা পুরস্কার'।

রোমেনা আফাজ ১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাড়ি ছিল বগুড়ার জলেশ্বরীতলায়, যা বর্তমানে স্মৃতি জাদুঘর। তার পিতার নাম কাজেম উদ্‌দীন আহম্মদ এবং মায়ের নাম বেগম আছিয়া খাতুন। বগুড়া জেলার সদর থানার ফুলকোট গ্রামের ডাক্তার মোঃ আফাজ উল্লাহ সরকারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

রোমেনা আফাজ লেখালেখি শুরু করেন ৯ বছর বয়স থেকে। তার প্রথম লেখা বাংলার চাষী নামক একটি ছড়া প্রকাশিত হয় কলকাতার মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। এরপর অসংখ্য ছোটগল্প, কবিতা, কিশোর উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, গোয়েন্দা সিরিজ ও রহস্য সিরিজ রচনা করেছেন। তার লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ৬টি চলচ্চিত্র। জনপ্রিয় এই চলচ্চিত্রগুলো হলো- কাগজের নৌকা, মোমের আলো, মায়ার সংসার, মধুমিতা, মাটির মানুষ ও দস্যু বনহুর। রোমেনা আফাজের লিখিত বইয়ের সংখ্যা ২৫০টি। 

তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলো হলো—উপন্যাস: ‘দেশের মেয়ে’ (১৯৬২), ‘সোনালী সন্ধ্যা’ (১৯৬৪), ‘হারানো মানিক’ (১৯৬৮), ‘কাগজের নৌকা’ (১৯৬৫), ‘কুন্তিবাঈ’ (১৯৬৬), ‘জানি তুমি আসবে’ (১৯৬৬), ‘শেষ মিলন’ (১৯৬৬), ‘প্রিয়ার কণ্ঠস্বর’ (১৯৬৭), ‘আলেয়ার আলো’ (১৯৬৭), ‘সাগর সৈকত’ (১৯৬৭), ‘অভিশপ্ত’ (১৯৬৮), ‘লেখকের স্বপ্ন’ (১৯৬৮), ‘নিয়তির চক্র’ (১৯৬৮), ‘আলোক রশ্মি’ (১৯৬৯), ‘ভোরের সূর্য’ (১৯৬৯), ‘রুপালি পর্দা’ (১৯৭০), ‘নীল আকাশ’ (১৯৭১), ‘উত্তাল তরঙ্গ’ (১৯৭৬), ‘মায়ার সংসার’, ‘কুমারী বধূ’, ‘ঘূর্ণি হাওয়া’, ‘অভিশপ্ত জীবন’, ‘হূসনা’, ‘পরশমণি’, ‘বাসররাতের স্বপ্ন’, ‘মাটির মানুষ’, ‘অনির্বাণ’, ‘পদ্মকন্যা’, ‘স্বপ্ন সাধনা’, ‘মা ও মাটি’, ‘পারুল’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘মা ও মেয়ে’, ‘স্মৃতিরেখা’, ‘স্বয়ংবরা’, ‘আত্মাহুতি’, ‘বিবর্তিত বসুন্ধরা’, ‘দুলালী’, ‘পাহাড়ী মেয়ে’, ‘লাইট পোষ্ট’, ‘বিদগ্ধা জননী’, ‘দুটি চোখ’, ‘ঝরা পাতা’, ‘খেয়াঘাট’, ‘ধূসর পৃথিবী’, ‘বড় ভাবি’, ‘বাশসী’, ‘ভুলের শেষে’, ‘পরিণতি’, ‘অভিসারিকা’, ‘সূর্যাস্ত’, ‘মধুর পরিচয়’, ‘হীরক খণ্ড’, ‘ফাঁসির মঞ্চে’, ‘বিষাক্ত তীর’, ‘প্রতিচ্ছবি’, ‘মধু’, ‘মিলন’, ‘বধূ’। কিশোর উপন্যাস: ‘মান্দি গড়ের বাড়ি’, ‘দস্যুরানী সিরিজ’ (১২টি), ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ (১৩২টি)।

রোমেনা আফাজ শুধু একজন প্রতিভাময়ী লেখকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সক্রিয় সমাজ সেবিকাও। ৩৭টি সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। তারমধ্যে জাতীয় মহিলা সংস্থা, বগুড়ার সাবেক চেয়ারম্যান; ঠেংগামারা মহিলা সবুজ সংঘ, বগুড়ার আজীবন উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক; বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা, বগুড়ার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান; উদীচী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, বগুড়ার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান; বাংলাদেশ রেডক্রস সমিতি, বগুড়ার সাবেক সদস্য; শিশু একাডেমি, বগুড়ার সাবেক উপদেষ্টা; বাংলাদেশ রাইটার্স ফোরাম, বগুড়ার সাবেক উপদেষ্টা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সাহিত্য ও শিল্পকলায় অসাধারণ অবদানের জন্য ২০১০ সালে 'স্বাধীনতা পুরস্কার' প্রদান করা হয় তাকে। রোমেনা আফাজের অবদানকে ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রোমেনা আফাজ স্মৃতি পরিষদ। সাহিত্যে প্রশংসনীয় বিশেষ অবদানের জন্যে বিভিন্ন সংগঠন থেকে পেয়েছেন বহু পুরস্কার।