ভালো বাবা ভালো বন্ধু

অনেক সন্তানের কাছে বাবা সুপার হিরো। বাবার সঙ্গে ছেলেমেয়ের দূরত্ব এখন আর আগের মতো নেই। অনেক বাবাই মায়ের মতো করে সন্তানকে দেখাশোনা করেন। সন্তানের দেখভালে মায়ের মতো তিনিও পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করেন। আগামীকাল বিশ্ব বাবা দিবস। এখনকার বাবা যেভাবে সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠেন তাই জানালেন  মোহসীনা লাইজু

 সবার আগে দায়িত্ব পালন

দুই ভাইবোন অরিত্র  আর অবন্তির অন্তপ্রাণ তাদের বাবা পর্যটন ব্যবসায়ী সৈয়দ আখতারুজ্জামান। মায়ের থেকে বাবাই ওদের প্রিয় বন্ধু সবকিছুর সঙ্গী। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বাবা ও মায়ের সম্পর্কও সন্তানের শৈশব গড়তে ভূমিকা রাখে। বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া, দোষারোপ, শিশুর মনে বিরূপ ভাব সৃষ্টি করতে পারে । যেহেতু বাচ্চারা মায়ের সংস্পর্শে থাকে, তাই মা-বাবার ঝগড়ার সময় বাবা খুব সহজেই তাদের চোখে ভিলেন হয়ে যান। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের মিল হতেই পারে, কিন্তু তার কুৎসিত রূপ কখনোই সন্তানের সামনে আনা উচিত নয়। অনেক বাবা ছেলেমেয়েদের সামনে মায়ের নানা দোষ নিয়ে মজা করেন। এই নির্দোষ ঠাট্টার প্রভাবে অনেক সময় ছেলেমেয়েরা মাকে অসম্মান করতে শেখে। আমি সব সময়ই এই বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেছি। সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছি।’ সংসারের কাজকর্ম, ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব সব স্ত্রীর ওপর দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন অনেক স্বামী। আপনার দায়িত্বহীনতা নিয়ে সন্তানের মনে বিরক্ত বাসা বাঁধবে অথবা নিজেরাও অন্যের ঘাড়ে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে শিখে ফেলবে। এর কোনোটাই কাম্য নয়। সে জন্য প্রথম থেকেই বাড়ি ও বাইরের কাজ ভাগ করে নিন স্ত্রীর সঙ্গে। ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের ওপরও দায়িত্ব দিন যাতে কোনো একজনের ওপর অযথা চাপ না পড়ে। ছেলেমেয়েদের স্কুল, টিউশন, হবি, খেলাধুলা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখুন। শখের জিনিস কিনে দেওয়া, সন্তানের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করা একজন ভালো বাবার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সন্তানের কাছে বাবার বন্ধু হয়ে উঠতে সময় লাগবে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় ইচ্ছাশক্তির। একজন বাবা কী করতে পারেন এ প্রসঙ্গে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সায়কা হক জানান, সন্তান আর আপনার মধ্যে দূরত্ব কমান। ভালো বাবা হয়ে ওঠার প্রথম ধাপই হলো ছেলেমেয়ের বন্ধু হয়ে ওঠা। তাতে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, সন্তানকে নিয়মিত সময় দিন। পড়াশোনায় সাহায্য করা, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, ছুটির দিনে একসঙ্গে খেলা বা বাড়ির কাজ একসঙ্গে করতে করতেই আপনি নিজের অজান্তেই ওদের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠবেন। বাবা হিসেবে সন্তানের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে সদ্য বাবা হওয়া প্রযুক্তি এক্সপার্ট প্রিন্স মাহামুদ অর্ণব বলেন, ‘ সাধারণত বাবা ও মা সন্তানের জীবনে আলাদা ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বাবা হয়েও মাঝেমধ্যে মায়ের তথাকথিত দায়িত্বগুলো পালন করলে সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধন আরও মজবুত হয়ে উঠবে। বাচ্চার ডায়াপার বদলানো, গোসল করানো, জামা-কাপড় বদলানো, ঘুম পাড়ানোর মতো কাজকে মেয়েলি বলে তুচ্ছ করবেন না। বরং স্ত্রীকে মাঝেমধ্যে সাহায্য করার জন্য নিজেও এই কাজগুলো করুন। বাচ্চা বড় হলে তাকে টয়লেট ট্রেনিং দেওয়া, স্কুলের জন্য তৈরি করানো, হোমওয়ার্ক করানোর মতো কাজে সাহায্য করুন। তাহলেই আপনি আপনার সন্তানের কাছে ভালো বাবা হয়ে উঠবেন। আমার বাবাকেও আমি ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। যেটা আমিও করতে চেষ্টা  করছি।’ আপনি যে কাজগুলো ভালো পারেন, সেগুলো ধীরে ধীরে আপনার সন্তানকে শিখিয়ে দিন। যেকোনো কাজই আপনার সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধনকে অনেক বেশি মজবুত করে দিতে পারে। ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন শখ এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দিন। মেয়ের নাচের স্কুলে নিয়ে যাওয়া বা ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা সবকিছুতে সময় থাকলে সঙ্গী হতে পারেন। এইভাবে সব কাজে সন্তানের সঙ্গী হয়ে উঠুন। খুব সহজেই আপনি ‘বেস্ট ফাদার’র খেতাব পাবেন সন্তানদের কাছ থেকে। ওরা বুঝতে পারবে যে ওদের সঙ্গে আপনি সব সময় রয়েছেন এবং যেকোনো সমস্যায় ওরা আপনার সাহায্য পাবেই। তাদের জীবনে আপনার গুরুত্ব বুঝেই আপনাকে ভালোবাসতে ও সম্মান করতে শিখবে। কথা দিয়ে কথা রাখুন। আপনার শত ব্যস্ততা থাকতে পারে কিন্তু সন্তানের ছোট ছোট চাওয়াকে গুরুত্ব দিন। ওর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য আপনার যতটুকু করা উচিত, ততটুকু অবশ্যই করুন। সন্তানকে নিজের মতো বড় হতে দিন। পড়াশোনা, শখ বা খেলাধুলা, যা হোক না কেন, ওর দক্ষতা ও মেধা অনুযায়ী ওকে এগোতে দিন। বাচ্চাকে শাসন করার দায়িত্ব বেশির ভাগ সময়ই বাবার ওপর এসে পড়ে। বকাঝকা, হুকুম জারি বা মারধর নয়, বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণ করুন নমনীয়ভাবে। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, এটা ওর কাছে স্পষ্ট করে তোলার দায়িত্ব আপনার। বকাঝকা বা শাস্তি দেওয়ার আগে বুঝিয়ে দিন আপনার ব্যবহারের পেছনের কারণ।

ভালো বন্ধু হওয়ার কৌশল

সন্তানকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখুন। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের শর্ত হলো সে যে স্বতন্ত্র মানুষ সেটা স্বীকার হরে নেওয়া। বয়স অভিজ্ঞতায় আপনার সমকক্ষ নয়, কিন্তু তাই বলে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। বাবা-মায়ের বাচ্চাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জমাতে ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হলো বাচ্চাদের নানা বিষয়ে তাচ্ছিল্য করা। বন্ধুত্বের প্রধান ভিত্তি হলো একে অপরকে নির্ভয়ে সমস্ত কথা শেয়ার করা। সন্তান যেন আপনাকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে ভাবতে পারে। আপনার সঙ্গে নির্দ্বিধায় যেন সব কথা শেয়ার করা যায়। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। সংসার, অফিসের কাজ, দিনের শেষে সন্তানের সঙ্গে আর অবসরের সঙ্গী হয়ে ওঠার শক্তি হয়তো আপনার থাকবে না। অথচ সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠার এটাই ভালো সুযোগ। এমন মজার সুযোগই আপনি কোথায় পাবেন যদি সন্তানের খেলার বা টিভি দেখার সঙ্গী হতে না পারেন। খেলার ছলে ও কী করছে কী ভাবছে তাও জানতে পারবেন। সন্তানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সব থেকে ভালো উপায় হলো তার ভালো কাজকে উৎসাহ দেওয়া। খারাপ সময়ে আস্থা নিয়ে পাশে থাকা। প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই সন্তানের কাজ বা প্রচেষ্টার খামতিগুলোকে ধরিয়ে দিতে হবে। চেষ্টা করুন ওর সমস্ত কাজে ওর পাশে থাকতে। নিজের বিছানা গোছানো, ঘরের কাজে আপনাকে সহযোগিতা, এসব কাজে ওর তারিফ করতে ভুলবেন না। এর ফলে সন্তানও আপনাকে বন্ধু ভাবতে পারবে। আর একবার বিশ্বাসী বন্ধু হয়ে উঠলে দেখবেন সন্তান মানুষ করা আপনার কাছে অনেক সহজ। নিঃসঙ্গ বোধ না করুক সন্তান। অনেক বাবা-মাই আছেন কর্মব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই যে সময়টুকুই পাবেন সেটা সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম হিসেবে কাটাতে চেষ্টা করুন।

সন্তানের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা

অনেক টিনএজ ছেলেমেয়ে কথা শুনতে চায় না। সারাক্ষণ কম্পিউটারে বুঁদ হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক তানজির আহম্মেদ তুষার বলেন,‘ টেলিভিশন, ফেইসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য একটা নিয়ম করতে হবে। আস্তে আস্তে মোবাইলে কথা বলা কমাতে হবে। বন্ধ ঘরে মোবাইল, ইন্টারনেট ও ল্যাপটপ ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। ইন্টারনেট সম্পর্কিত অপরাধ তাদের ভবিষ্যৎ কিভাবে তাদের নষ্ট করবে তা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। ভালো-মন্দ যেকোনো বিষয়ে আসক্তি মানুষের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত আসক্তি থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা যায় না। ধীরে ধীরে বেরোতে হয়। সাইকোথেরাপির মাধ্যমে এ আসক্তি দূর করা যায়।’ সমসাময়িক নানা ঘটনার কারণে অনেকেই সন্তানকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়। প্রথমে বোঝা দরকার ওর যে পরিবর্তন হচ্ছে সেটা নেগেটিভ কি না। যদি বুঝতে পারেন নেগেটিভ তাহলে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রথমে নিজে চেষ্টা করুন। কাজ না হলে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরিবারের যার কথাকে গুরুত্ব দেয় তাকে দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করুন। এসবে কাজ না হলে মনোচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। আপনি কি চান আপনার কিশোর সন্তান আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোক এবং সেই শ্রদ্ধা হোক ভালোবাসার? তবে তাদের নিজে সম্মান করে এই বিষয়টি তাদের শেখান। শুধু ভয়, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, সব শখ পূরণের ব্যবস্থা কখনো সম্মান এনে দিতে পারে না। সন্তানের ব্যক্তিত্ব, ধারণা, মতামত এবং আবেগ অনুভব করুন এবং সম্মান দিন। তাদের বন্ধুদের সামনে নিন্দা করবেন না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তাদের মতামতকে তুচ্ছ বা সমালোচনা করবেন না। যা তাদের বয়স্কদের মতো সুরক্ষিত করতে পারে। যখন আপনি আপনার সন্তানদের অসম্মান করে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন না, তারাও আপনার প্রতি একই প্রতিক্রিয়া দেখাবে। চেষ্টা করলেই একজন বাবা সন্তানের কাছে হয়ে উঠতে পারেন সুপার হিরো।