শীতের সময়টাতে পায়ের যত্ন বা জুতা দুটোতেই একটু বেশি মনোযোগ দিতে হয়। এমন জুতা বেছে নিতে হয়, যাতে পায়ের আরাম ও সুরক্ষা দুটোই থাকে। শীতের জুতা বলতে কেডস, লোফার, কনভার্স, সুজ, বুট ও স্নিকার্স। বেশ কয়েক বছর ধরে ছেলেমেয়ে উভয়ের ফ্যাশনে স্নিকার্স বিশাল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শীতে ছেলে ও মেয়েদের স্নিকার্স নিয়ে লিখেছেন ইয়াসিন শাহজাদা
পছন্দসই জুতা না পরতে পারলে নিজের আত্মবিশ্বাসই হারিয়ে যায়। এমন কথা প্রচলিত আছে। ছেলে ও মেয়েদের ফ্যাশনে বহুল পরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম স্নিকার্স। স্নিকার্স ফ্যাশন ও স্পোর্টসওয়্যার দুটো হিসেবে পরিচিত। এ সময়কার স্নিকার্স আরাম এবং স্টাইল দুটোই যোগ করবে। নিত্যব্যবহার থেকে শুরু করে জমকালো অনুষ্ঠানেও পরতে পারেন। এখন প্রতি সপ্তাহেই নিত্যনতুন ব্র্যান্ডের নানা ডিজাইনের স্নিকার্স আসছে বাজারে। তাই আপনার সুজ র্যাকে রাখা পুরনো স্নিকার্সটি ধুয়ে মুছে শুকিয়ে পরার পাশাপাশি নতুন এক জোড়া কেনার আগেই চোখ বুলিয়ে বুঝে নিন এ বছরের ফ্যাশনে কোন স্নিকার্স যুক্ত হচ্ছে। আপনার জন্য মানানসই এবং আরামদায়ক কিনা সেটাও যাচাই করে নিন। আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে রঙবেরঙের স্নিকার্স। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জ ও সাভার ইপিজেডে বেশ কিছু স্নিকার্স জুতার কারখানা গড়ে উঠেছে। স্নিকার্সের আনুষঙ্গিকগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করে এখানেই মেনুফ্যাকচারিং করা হয়। যার ফলে দাম অপেক্ষাকৃত কম হয়। আর নিত্যনতুন ডিজাইনেও পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্নিকার্স আমদানি হয়েও আসে। ব্র্যান্ড ও ননব্র্যান্ড দুই ধরনের স্নিকার্স পাবেন ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত জুতার আউটলেটগুলোতে।
স্নিকার্সের ধরন
শীত এলেই মেয়েদের পায়ে শোভা পায় রঙবেরঙের স্নিকার্স, লোফার ও কেডস। তবে স্নিকার্সের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। স্নিকার্সের মধ্যে ফ্ল্যাট সোল যেমন আছে, তেমনি বুট স্টাইলের ‘হাইনেক’ও আছে। মেয়েদের জন্য এসব স্নিকার্স আলাদাভাবে তৈরি করা। উপকরণ ম্যাটারিয়াল হিসেবে লেদার, আর্টিফিশিয়াল লেদার, রেক্সিন, কনভার্স ও ডেনিমের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। রঙের ক্ষেত্রে গাঢ় ও হালকা দুটোই আছে। আরও আছে প্রিন্টের স্নিকার্স। নকশা হিসেবে গ্লিটার, এমব্রয়ডারি, কারচুপি। ওয়েস্টার্ন পোশাকের পাশাপাশি টপ, সালোয়ার-কামিজ এমনকি শাড়ির সঙ্গেও দুদান্ত মেচিং এসব স্নিকার্স। শোরুম ঘুরে দেখা গেল, ছেলেরা তিন ধরনের স্নিকার্স বেশি কিনছে। স্নিকার্স হাইনেক, স্নিকাস স্পোর্টস ও স্নিকাস ওয়াশঅ্যাবল। তরুণদের কাছে সাদার পাশাপাশি কালারফুল হাইকাট স্নিকার্সের চাহিদা বেশি। ফামর্গেট সোহানা সুজ কালেকশন স্বত্বাধিকারী ইমরান মাহামুদ বলেন, ‘শীতে পা ঢাকা জুতার চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। এখানে দেশি-বিদেশি সব ধরনের স্নিকার্স পাবেন। সবসময় পরতে পারেন এমন স্নিকার্সের দাম পড়বে হাজার-বারোশ। এসব দেশেই তৈরি। ফিতাসহ ও ফিতা ছাড়া দুটোই আছে। দাওয়াত বা অনুষ্ঠানে পরতে পারেন এমন ফ্যাশনেবল স্নিকার্সের দাম পড়বে পনেরোশ থেকে আড়াই হাজার টাকা। বাটায় আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় অর্থোলাইট ফোম; যা আরামদায়ক তো বটেই, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদানে তৈরি হয়। ফলে জুতার ভেতর দুর্গন্ধ বা ছত্রাকের আক্রমণ এড়ানো য়ায়।’ বাটায় এই উপকরণের স্নিকার্স পাবেন। হালকা রঙ সাদা, ছাইয়ের পাশে গাঢ় রঙ নেভি ব্লু, রেড, সি গ্রিন বেশি দেখা যাচ্ছে। স্নিকার্সের হোয়াইট সোলে নানা রঙের বৈচিত্র্য পাবেন। নকশায় ফিতাসহ ও ফিতা ছাড়া দুটোই পাবেন। হোয়াইট সোলে রঙবেরঙের স্নিকার্সও রয়েছে। ছেলেদের স্নিকার্সের মধ্যে শীতে সবার সেরা চয়েজ ও অনেক আরামদায়ক বাটার নর্থস্টার ভেলিও ক্যাজুয়াল লেস আপ স্নিকার্স।
কোথায় পাবেন
স্নিকার্স হিসেবে অ্যাডিডাসের ক্লাসিক ডিজাইন, লোগো, স্ট্রাইপ সবার পছন্দের তালিকায় আছে। এপেক্সের স্প্রিন্ট হাই নেক স্নিকার্স এই শীতের খুব জনপ্রিয় ডিজাইন। ডিজাইন হিসেবে দামও অনেকটা কম। এর দাম শুরু হয়েছে ১৯০০ টাকা থেকে। বাটার সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন স্নিকার্স হচ্ছে পাওয়ার ওয়াক স্লিপ অন। এর দাম শুরু ২১০০ টাকা। শীত উপলক্ষে বাটা ব্র্যান্ডের পাওয়ার স্নিকাসের্র অনেক নতুন ডিজাইন বাজারে এসেছে। ব্র্যান্ডের জুতা কিনতে চাইলে লোটো, বাটা, অ্যাপেক্স, বে, অরিয়ন, ক্রিসেন্ট ইত্যাদি ব্র্যান্ডের যে কোনো শাখায় যেতে পারেন। এ ছাড়া ঢাকার বনানীতে পুমার নিজস্ব শোরুম থেকে কেনা যাবে জুতা। অ্যাডিডাস, নাইকি, হাস পাপিস ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জুতা পাবেন বাটার শোরুমে। এলিফ্যান্ট রোড, নিউ মার্কেট, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, উত্তরা বা মিরপুরের বিভিন্ন দোকানে মিলবে নন-ব্র্যান্ডের ক্যাজুয়াল জুতা। নন-ব্র্যান্ডের জুতা কেডস, স্নিকার্স দেশে যেমন তৈরি হয় তেমনি চায়না ও থাইল্যান্ড থেকেও আমদানি করা হয়। ছেলে ও মেয়েদের স্নিকার্স উপাদানের মান ও কোন ব্র্যান্ডের তার ওপর দাম নির্ভর করে। দেশের বাজারে ব্র্যান্ডের ছেলেদের স্নিকার্সের দাম ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আর মেয়েদের দেড় হাজার থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত। খ্যাতনামা ডিজাইনার ব্র্যান্ডের স্নিকার্স ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। এখন বাটাতে ২৫ ভাগ ছাড়ে স্নিকার্স পাওয়া যাচ্ছে। বিখ্যাত ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস তার গ্রাহকদের পছন্দ বিবেচনা করে উচ্চমানের স্নিকার্স তৈরি করে। এডিডাসের গ্ল্যালাক্সি ৬ স্নিকার্সের দাম ৭ হাজার টাকা। এটাই এই ব্র্যান্ডের সবচেয়ে কম দামি স্নিকার্স। বিশেষ করে সাদা রঙের অ্যাডিডাসের স্নিকার্স ছেলেমেয়ে ও শিশু সবার কাছেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কিনতে গিয়ে
স্নিকার্স কেনার ক্ষেত্রে পায়ের আরামকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়। নরম বা কুশন প্যাডিংযুক্ত স্নিকার্স বেছে নিন। ফোসকা হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। স্নিকার্স পায়ের আকারের থেকে বড় বা ছোট কিনবেন না। পায়ের পুরোপুরি সঠিক আকারটিই নির্বাচন করুন। অনেক সময় দোকানদার একটু ছোট হলে বলতে পারেন কয়েক দিন হাঁটার পর ছেড়ে যাবে। কিন্তু এই কয়েক দিন হাঁটতে গিয়ে আপনার পায়ের দফারফা হয়ে যাবে। আবার বড় কিনলে ঢিলে হয়ে যাবে তখন হাঁটতে গিয়ে পা উঠে যাবে। ফ্যাশনে কি যোগ হয়েছে বা অন্যরা কি পরছে তা নিয়ে ভাববেন না। স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশের জন্য নিজের ব্যক্তিগত স্টাইলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্নিকার্স বেছে নিন। যদি আপনাকে একটু বেশি হাঁটাহাঁটি করতে হয় সেক্ষেত্রে একটু টেকসই ও দামি স্নিকার্স বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন। দামি জুতা কেবল স্থায়ী হয় না বেশ আরামদায়কও হয়।
পরিষ্কার করতে হবে
কনভার্স বা স্নিকার্স যেটাই হোক না কেন, হাতের সাহায্যে পরিষ্কার করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। ব্রাশের সাহায্যে জুতার ধুলাবালি ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। এবারে এক কাপ গরম পানিতে এক টেবিল চামচ ডিশ ওয়াশার মিশিয়ে এতে পরিষ্কার কাপড় ভিজিয়ে ভেজা কাপড়ের সাহায্যে জুতার বাইরেটা পরিষ্কার করে নিন। জুতার ফিতা সাবান পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে ধুয়ে নিন। এবারে জুতা দুটিকে পেপার টাওয়েল দিয়ে ভালোভাবে মুড়িয়ে রেখে দিতে হবে কিছুক্ষণের জন্য। এতে করে জুতার বাড়তি পানি পেপার টাওয়েল শোষণ করে নেবে। এরপর জুতাগুলো ঘরোয়া তাপমাত্রায় ও বাতাসে রাখতে হবে শুকানোর জন্য। রোদে কিংবা চুলার পাশে রেখে শুকানো যাবে না। এতে করে জুতার রঙ ও আকার দুটোই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দাগ হলে
স্নিকার্স যদি ক্যানভাস কাপড়ের হয় তবে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডে ব্রাশ চুবিয়ে সেই ব্রাশ দিয়ে জুতায় দাগযুক্ত স্থানে ঘষতে হবে এবং চামড়ার হলে ভেজা ব্রাশে বেকিং সোডা মিশিয়ে সেটা জুতার দাগযুক্ত স্থানে খুব আলতোভাবে ঘষতে হবে। এভাবে করলে খুব সহজেই দাগ উঠে যাবে স্নিকার্স বা কনভার্স থেকে। আর গন্ধ এড়াতে স্নিকার্সের মধ্যে রাতে কয়েক ফোঁটা বরিক পাউডার দিয়ে রাখতে পারেন।
