ময়মনসিংহের একজন শিক্ষক তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ক্লাসরুম কন্ট্রোল করা যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্লাসের সামনের সারির অল্প কয়েকজন কিছু শিক্ষকের কথা শুনলেও পেছনের দিকের সবাই নিজেদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকে। বারবার অনুরোধ করার পরেও এক-দুই মিনিটের জন্য শান্ত হলেও শিক্ষক যখন আবার পড়াতে শুরু করেন, তারাও আবার আগের মতো নিজেদের আলাপচারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।’ তিনি আরও লিখেছেন ‘আমরাও তো এক দিন ছাত্র ছিলাম। শিক্ষকরা ক্লাসে এলে সবাই শান্ত হয়ে যেতাম। স্যার যা ক্লাসে বলতেন তাই করতাম। আজকের এই উল্টো চিত্রের জন্য দায়ী কে? শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে চায় না, এলেও ক্লাসরুমে যেতে চায় না, ক্লাসরুমে যারা যায় তারাও ক্লাস লেকচার শোনার প্রতি মনোযোগী হয় না। লেকচার শোনার পরিবর্তে স্মার্টফোন ও ফেইসবুকে চ্যাটিংয়ে অনেক বেশি মনোযোগী।’
সমাজের অসংগতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার প্রভাব সবই উঠে এসেছে শিক্ষকের লেখায়। শিক্ষার্থীরা বর্তমানে পড়লেও পাস করে, না পড়লেও পাস করে উচ্চতর গ্রেডসহ। সেখানে তারা পড়বে কেন? আর শ্রেণিকক্ষে লেকচারের চেয়ে ফেইসবুক-ইউটিউবের আকর্ষণ অনেক বেশি ওই বয়সের এবং বর্তমান সমাজের বাসিন্দা হয়ে তারা কেন ক্লাস লেকচার শুনবে। তারা যদি জানে বা বোঝে, তাদের শ্রেণিকক্ষের পড়া না পড়লে, শিক্ষকের ক্লাস না করলে কোনোভাবেই পাস করতে পারবে না। আবার পরীক্ষায় কোনো ধরনের অসদুপায় অবলম্বন করা যাবে না। এগুলোর কোনোটিই নেই। তাই তারা ক্লাস করে না, পড়ে না। পরীক্ষার জন্য মোটেই চিন্তিত নয়। এগুলোর সব সমাধান করা আলাদাভাবে একজন শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ওই শিক্ষক এসব কথা লিখেছেন, যা আজ প্রায় সব শিক্ষকেরই কথা।
প্রকৃত অর্থে যদি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় তাহলে ফলাফল যা হয় বা হবে তা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দেখানো হয়েছে। ঢাবির ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক সম্মান প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ৯০ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। পাসের হার ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৩৭৪ জন শিক্ষার্থী আর উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ হাজার ৪৬৬ জন। ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষায় কৃতকার্যের হার ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ আর অকৃতকার্য ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এটিই প্রকৃত চিত্র। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা সঠিকভাবে নেওয়া হলে ফল এ রকমই দাঁড়াবে। কিন্তু এ নিয়ে কারোর কোনো রা নেই।
জুন মাসের ২৭ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো তা এ রকমই। দশম শ্রেণির ৮৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনও যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিল না, প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলাম এসএসসিতে তার বিদ্যালয়ের গতবারের ফল কী? তিনি বললেন শতভাগ পাস। কিছু না পারলেও, না পড়লেও যখন শতভাগ পাস তখন শিক্ষার্থীরা পড়বে কেন?
একজন শিক্ষক লিখেছেন, ‘আমি শিক্ষক, শিক্ষাদানের জন্য আমি উপযুক্ত পরিবেশ চাই। আমাকে শিক্ষাদানের উপযুক্ত পরিবেশ দিন, শ্রেণিকক্ষে আমি আমার জ্ঞানের সবটুকু বিতরণে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট থাকব।’ এখানেই প্রশ্ন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষকও সমাজের অংশ, শিক্ষার্থীরাও সমাজের অংশ। কে আমাদের পরিবেশ তৈরি করে দেবে? আমাদের রাজনীতিবিদরা? এ সমাজ, এ দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই আমাদের জানা। তারপরও আশার কথা হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের অন্তত সালাম দেয়, এখনো অনেক জায়গায় পা ছুঁয়ে সালাম দেয়। শিক্ষকের সামনে কখনো সিগারেট ধরায় না। আমার মনে আছে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করে এসেছি বেশ কবছর আগে। এক দিন রাতের বেলা ফার্মগেটে প্রাক্তন এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা। ছেলেটি সিগারেট ফুঁকছিল। আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট পায়ের নিচে দ্রুত পিসে ফেলল এবং দ্রুতই সালাম দিল। সে এখন আর আমার শিক্ষার্থী নয়, আমিও তার শিক্ষক নই কিন্তু এ আচরণ তো এখনো করে। আবার নকল ধরার অপরাধে শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করেছে এমন ছাত্র ওই যুগেও ছিল, এ যুগে তো আছেই।
নড়াইলে দুঃখজনক ঘটনার পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই মুঠোফোন আনতে পারবে না বলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের এভাবেই অথরিটি নিয়ে কাজ করতে হয়। তবে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাদের টনক নড়ে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অনেককেই দেখেছি তাদের উৎসাহ শিক্ষক নিয়োগ, কমিটি গঠন ইত্যাদি বিষয়ে অর্থাৎ বৈষয়িক বিষয় যেখানে জড়িত তারাও সেখানে বেশি জড়িত। অ্যাকাডেমিক বিষয় গোল্লায় যাচ্ছে, শিক্ষাদান কেমন হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। আর এগুলো করতে হলে তো নিজেদের পড়াশোনা করতে হবে, সে সময় তাদের কই। আর পড়াশোনা করলে তো আর প্রশাসক বনে যায় না, তাই তারাও প্রশাসক হতে চান, অ্যাকাডেমিক নয়। আর তাই সমাজও চলছে সেভাবে।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনাবলি সমাজ ও রাষ্ট্রে গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্ররাজনীতি হয়ে ওঠে সহিংস। এখন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে শিক্ষক রাজনীতি এবং লাল, নীল, গোলাপি, সাদা-নানা বর্ণে বিভক্ত হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জাতীয় রাজনীতির রাজনৈতিক দলে অঙ্গসংগঠন হিসেবে নিজেদের পরিচিত করছেন। কাজেই সমাজকে দোষ দিয়ে লাভ কী? পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় শিকড় গেড়েছে অনৈতিকতা, সেটি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত। বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে কী হচ্ছে? বিশ^বিদ্যালয়ের পবিত্র অঙ্গনে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, যে পেশিশক্তির মহড়া ও চড় দখলের খেলা চলছে সেগুলো কি কেউ কোনোভাবে মেনে নিতে পারে? তবে, এসব বিষয়ে শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি বাদ দিয়ে, কখনো রাজনীতিবিদ কিংবা প্রভাবশালীদের দিকে তাকিয়ে শিক্ষাঙ্গনে প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কতটা কাজে দেবে সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। কাজেই শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করতে হবে নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, আধুনিক শিক্ষা, আকর্ষণীয় শিক্ষাদান ও উন্নত ব্যক্তিত্ব।
আমাদের দেশের পিতা-মাতারা সন্তানকে মেধাবী হিসেবে দেখতে চান, সেটি তো সব বাবা-মাই চান এবং চাইবেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাদের সন্তান একজন আদর্শ শিক্ষার্থী, আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে কি না সেটি দেখাও একান্ত কর্তব্য। কারণ সমাজের যে পচন ধরেছে এটি শুধু রাজনীতি, শুধু সমাজ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পুলিশকে দোষারোপ করলে হবে না। সমাজের এখন যা অবস্থা হয়েছে তা কিন্তু কারোরই নিয়ন্ত্রণে নেই। কাজেই যার যার অবস্থান থেকে, প্রতিটি পরিবার থেকে নৈতিকতার শিক্ষা, ধৈর্যে ধরার শিক্ষা, মানবিকতা শেখাতে হবে। দোষ শুধু কারও একার ঘাড়ে চাপালে আমরা মুক্তি পাব না।
লেখক : গবেষক ও শিক্ষাবিষয়ক লেখক
masumbillah65@gmail.com