নববধূ বন্যা রানী রায়কে সঙ্গে নিয়ে মহালয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার সময় গত রবিবার নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়া হিমালয় চন্দ্র রায়ের মরদেহ অবশেষে উদ্ধার হয়েছে। চার দিন পর গতকাল বুধবার বিকেল ৫টার দিকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়ার ঘাট এলাকায় করতোয়া নদীর পানির নিচে বালুচাপা অবস্থায় থাকা তার লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। এ নিয়ে পঞ্চগড়ের আলোচিত এ নৌকাডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৬৯ জনে দাঁড়াল বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ও নৌকাডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান দীপঙ্কর রায়।
এর আগে গত রবিবার দুপুরের ওই নৌকাডুবির ঘটনায় গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ৬৮। এখনো নিখোঁজ আছেন তিনজন। এ দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের রংপুর, রাজশাহী ও কুড়িগ্রামের তিনটি ডুবুরি দল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল লাশ উদ্ধার হওয়া হিমালয় চন্দ্র রায়ের বাড়ি বোদার ময়দানদীঘি ইউনিয়নের খালপাড়া এলাকায়। তিনি ওই এলাকার বীরেন্দ্র নাথ রায়ের ছেলে। দিনাজপুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র হিমালয়ের গত ৩ আগস্ট পাশের ঝলইশালশিরি ইউনিয়নের বড়ুয়াপাড়া এলাকার রবীন চন্দ্র রায়ের মেয়ে বন্যার সঙ্গে বিয়ে হয়।
গত রবিবার দুপুরে বোদার মাড়েয়া বাজারের পাশে করতোয়া নদীর আউলিয়া ঘাট থেকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকা বড়শশী ইউনিয়নের বরদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। ঘাট থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকাটি ডুবে যায়। যাতে যাত্রী হিসেবে ছিলেন হিমালয় ও তার স্ত্রী বন্যা। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের পরনের কাপড় ছুড়ে ফেলে বন্যা সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও হিমালয়ের খোঁজ মিলছিল না। এমন পরিস্থিতিতে তাকে ফিরে পেতে আউলিয়ার ঘাটে গঙ্গাপূজা করে আসছিলেন স্বজনরা।
হিমালয়ের খোঁজে করতোয়ার তীরে চার দিন অপেক্ষমাণ ছিলেন তার দুলাভাই গ্রি বাবু। শ্যালকের খোঁজে মধ্যরাত অবধি করতোয়ার তীরে অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে ভোরে আবারও আসতেন করতোয়াপাড়ে। গতকাল হিমালয়ের লাশ পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস ছিল হিমালয়ের খোঁজ পাবই। অবশেষে পেলাম, কিন্তু অর্ধগলিত। স্বামীর প্রতীক্ষায় পানিতে চোখ ভাসাচ্ছে বন্যা। বাকরুদ্ধ, কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।’
হিমালয়ের বাবা বীরেন্দ্র নাথ রায় কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলের মাত্র দেড় মাস আগে বিয়ে হয়েছে বন্যার সঙ্গে। হিমালয় মরে গেছে, সব শেষ। কিন্তু বউমার কী হবে? সান্ত¡না এটুকুই যে, সৎকার করতে পারব। বাবা হয়ে ছেলের লাশের সৎকার মেনে নিতে পারছি না।’
এদিকে গতকালও দিনভর প্রিয়জনকে ফিরে পেতে করতোয়াপাড়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় নিখোঁজদের স্বজনদের। এছাড়া পঞ্চগড় ও এর আশপাশ জেলাগুলো থেকেও লোকজন নৌকাডুবির ঘটনাস্থলটি একবারের জন্য দেখতে আসেন। মহালয়ায় পুণ্য অর্জনের জন্য মা আলো রানী (২৫) দুই মেয়ে দেড় বছরের জ্যোতি ও চার বছরের জয়া রানীকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন বরদেশ্বরী মন্দিরের মহালয়ার অনুষ্ঠান ও মন্দির দর্শনের জন্য। কিন্তু নদী পার হওয়ার সময় মাঝনদীতে নৌকা উল্টে অন্য অনেকের সঙ্গে দুই সন্তানসহ পানিতে পড়ে যান আলো। সাঁতরে তীরে ওঠেন তিনি। ওই দিনই ঘটনাস্থলেই খুঁজে পাওয়া জ্যোতির লাশ। কিন্তু জয়া রানীকে আর পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত যে তিনজন নিখোঁজ তাদের মধ্যে জয়া একজন।
দুই সন্তান জ্যোতি ও জয়াকে হারিয়ে নির্বাক-নিথর তাদের বাবা পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাত কাজলদীঘি ইউনিয়নের ঘাটিয়ারপাড়া গ্রামের বীরেন্দ্র নাথ রায় ও মা আলো রানী। জ্যোতি আর জয়ার মামা নীলকুমার রায় বলেন, ‘জয়ার খোঁজে ঘটনার দিন থেকে ঘুরছি আউলিয়ার ঘাট এলাকায়। কিন্তু আজ (গতকাল বুধবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত লাশ পাওয়া যায়নি। প্রতিদিন সকালে আসি আর রাতে বিফল মনোরথ নিয়ে বাড়িতে ফিরি। ভগ্নিপতি আর বোনকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা নেই। তাদের বাড়িতে গেলে জড়িয়ে ধরে বলে আমার জয়ার লাশ কই? জয়ার লাশ এনে দাও।’
নিখোঁজ অন্য দুজনের মধ্যে একজন বোদার সাকোয়া ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের খগেন্দ্রনাথ বর্মণের ছেলে সুরেন, আরেকজন একই উপজেলার ছত্র শিকারপুর হাতিডোবা গ্রামের মদন চন্দ্রের ছেলে ভূপেন। তাদের স্বজনরা দুর্ঘটনার পর থেকে প্রতিদিন আউলিয়ার ঘাট এলাকায় উ™£ান্তের মতো ঘুরছেন। অন্যদিকে তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
এদিকে নৌকাডুবির ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় আরও তিন দিন বাড়ানো হয়েছে। এ কমিটিকে গত মঙ্গলবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর কুমার রায় বলেন, ‘একই সময়ে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা প্রদান ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদানে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছি। তাই তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য অতিরিক্ত তিন কার্যদিবস সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জহুরুল ইসলাম আবেদনটি মঞ্জুর করেছেন।’