বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সরকার পতনের আন্দোলনের দফাগুলো নির্ধারণে দ্বিতীয়বারের মতো সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রথম দফায় অবৈধ-অনির্বাচিত সরকারের অপসারণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, দ্বিতীয় দফায় গণআন্দোলনে দফাগুলোর বিষয় নির্ধারণে আলোচনা করা হয়েছে। এই আন্দোলন চলবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। গত রবিবার ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দফা সংলাপ শুরু করে বিএনপি।
সংলাপের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আলোচনার মূল বিষয়গুলো ছিল আন্দোলনের দাবি নির্ধারণ করা। এর মধ্যে আমাদের কমন দাবিগুলো হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তি, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, প্রায় ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে করা রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে পদত্যাগ করে সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সেই সরকার নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে, তারা নির্বাচন করবে, সেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে। এগুলো হচ্ছে আমাদের প্রধান বিষয়।’
এ আন্দোলনের নেতৃত্বে কারা থাকবে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘চলমান আন্দোলনের নেতৃত্বে সবাই থাকবে। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এটা গঠন করছি। আগেও ঘোষণা করেছি, আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া, তার অবর্তমানে তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।’
আর জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘কী কী দাবিতে মাঠে আন্দোলন করব, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। খালেদা জিয়াসহ রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের মুক্তি আমাদের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া শ্রমিক-কৃষকের দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলন হবে। তবে মূল যে দাবিতে আন্দোলন হবে তা হচ্ছে এ সরকারের পদত্যাগ এবং নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন।’
সংলাপে বিএনপির পক্ষ থেকে অংশ নেন দলটির স্থায়ী কমিটির নজরুল ইসলাম খান। আর জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে অংশ নেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আহসান হাবীব লিংকন, প্রেসিডিয়াম সদস্য নওয়াব আলী আব্বাস খান, মাওলানা রুহুল আমীন, মো. সেলিম মাস্টার, ভাইস চেয়ারম্যান হান্নান আহমেদ খান বাবলু, যুগ্ম মহাসচিব এ এস এম শামীম প্রমুখ।
গতকাল রাতে মহাখালীর ডিওএইচএসে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদের সঙ্গেও সংলাপে বসেন মির্জা ফখরুল। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এ সময় এলডিপির নেতাদের মধ্যে ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আওরঙ্গজেব বেলাল, অ্যাডভোকেট মাহবুব মোর্শেদ ও ড. নিয়ামুল রশীদ।
বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় : বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে গতকাল দুপুরে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাজশাহী, রংপুর ও কুমিল্লা বিভাগের নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় জেলা নেতাদের বাইরে অংশ নেন বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকবৃন্দ, বিএনপি মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। আজ মঙ্গলবার ঢাকা, বরিশাল ও ফরিদপুর বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হবে।
সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে একমত বিএনপি : এলডিপি
সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে একমত হয়েছে বিএনপি-এলডিপি। গতকাল সোমবার রাতে রাজধানীর ডিওএইচএসে এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের বাসায় বিএনপির সঙ্গে এলডিপির বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে এ কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল অলি আহমদ।
সংলাপ শেষে অলি আহমদ বলেছেন, ‘একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা জাতিকে মুক্ত করার জন্য এখানে একত্রিত হয়েছি। বহুদিন থেকে আপনারা দেখেছেন বিএনপি এককভাবে তাদের পুরো শক্তি দিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে লিপ্ত আছে। এখন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যেতে চাই। সেটা নিয়ে অনেক বক্তব্য এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘এ সরকার গত ১৪ বছর যাবৎ ক্ষমতায়। তারা মানুষের ওপর নির্যাতন করছে, সুশাসনের অভাব, কেউ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। ঘর থেকে কেউ বের হতে পারে না। যারা রাজনীতি করে তারা মিটিং-মিছিল করার সুযোগ পাচ্ছে না। আমরা যে আমাদের মতামত দেব, আপনারা সাংবাদিক হিসেবে আপনাদের মতামত দেবেন সেই সুযোগ এ দেশে নেই।’
এলডিপি সভাপতি বলেন, ‘আপনাদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় সব দল বন্ধ করে একদলীয় শাসন বাকশাল করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। সাংবাদিকদের কোনো অধিকার ছিল না, পত্রিকা বন্ধ ছিল। সেগুলো খুলে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে এসেছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি শুধু খালেদা জিয়া নন, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। সেনাপ্রধানের স্ত্রী। তিনি নিজে তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এতগুলো গুণে গুণান্বিত। তাকে আজকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে আবদ্ধ রেখেছে।’
অলি আহমদ বলেন, ‘আমরা নিঃশর্তভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে তাদের মামলা প্রত্যাহার চাই। যাদের জেলে রেখেছে তাদের মুক্তি চাই। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যা যা করা দরকার সেটা কামনা করি। বিশেষ করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের মূল্য বৃদ্ধিতে সমাজে অ্যাফেক্ট হয়েছে। এটার দাম কমাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ সুশাসন পাচ্ছে না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। ন্যায়বিচার দিতে হবে। আজকে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হচ্ছে এগুলো থেকে মুক্ত হতে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিতে হবে। এ নেতৃত্ব ছাড়া এখানে গণতন্ত্র ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিএনপি ইতিমধ্যে স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, এ সরকারের আওতায় কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। অতীতে যেকোনো সময় আমরা ভুল করেছি, যার কারণে আমাদের খেসারত দিতে হচ্ছে। এবার আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ সরকারের পদত্যাগ চাই। সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। সংসদ বিলুপ্ত করতে হবে। নতুন সরকার এসে প্রশাসন ঠিক করবে, মানুষ যখন প্রস্তুত হবে, জনগণ যখন নির্ভয়ে তাদের ভোট দিতে পারবে, তখন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। বর্তমান অবস্থায় যদি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে আওয়ামী লীগ ছাড়া কেউ নির্বাচিত হবে না। কারণ প্রত্যেকটি জায়গায় ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের প্রাধান্য। এ সরকার কবে যাবে, নতুন সরকার কবে আসবে এটাই হবে এক দফা। বাকিগুলো আনুষঙ্গিক। সংসদ বিলুপ্তি করতে হবে। যারা বিতর্কিত তাদের ক্ষমতা থেকে বের করতে হবে। এখানে মায়া-মমতা দিয়ে দেশ পরিচালনা করলে হবে না।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘স্বৈরাচারী, কর্তৃত্ববাদী অবৈধ সরকারকে সরিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছি, সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের প্রবীণ জননেতা কর্নেল (অব.) অলি সাহেবের নেতৃত্বে যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসেছি। দ্বিতীয় দফায় আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করছি। এটি নিয়ে অন্যান্য দলের সঙ্গেও কথা বলব। আলোচনা শেষ হলে সবাই একমত হয়ে আন্দোলনের দাবি জনগণের সামনে উত্থাপন করব এবং দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে যাব।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা যে বিষয়গুলোতে প্রায় একমত হয়েছি সেগুলো হচ্ছে আমরা সবাই মনে করি যেহেতু এ সরকার পুরোপুরি অনির্বাচিত একটি সরকার, কর্তৃত্ববাদী সরকার, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এরা হরণ করেছে। সে কারণে এ সরকারের পদত্যাগ প্রয়োজন। সে জন্য আমরা দাবি করেছি সরকার পদত্যাগ করে একটা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এরপর সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন কমিশনের অধীনে একটি নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। তারা জনগণের সংসদ ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন। একই সঙ্গে আমরা একমত হয়েছি, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াসহ সব বন্দির মুক্তি ও ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি তেলের মূল্যর বিষয়গুলো আছে। সরকারের দুর্নীতির বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছি। আমরা আশা করি একমতে পৌঁছব। আমরা এ দাবিগুলো নিয়ে একসঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করব।’
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে এলডিপির পক্ষে ছিলেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল আলম, ড. নেয়ামুল বশির, ড. আওরঙ্গজেব বেলাল ও মাহবুব মোর্শেদ।