রাস্তাজুড়ে প্রকল্পের কাজ চলে। এ কারণে সড়কে যানজট লেগেই থাকে। সমন্বয় না করে যত্রতত্র রাস্তা কাটায় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে মানুষ। ভ্যাপসা গরমে রাজধানীতে বৃষ্টিতে স্বস্তি এলেও বিমানবন্দর সড়কে ভয়ানক যানজট বাঁধে। শুরু হয় চরম দুর্ভোগ। উত্তরা এলাকায় এটাই নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধুলা তো আছেই, বৃষ্টি হলেই তা কাদায় পরিণতি পায়; আর আছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তা ঠিকমতো মেরামতও করা হয় না, ফলে ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সড়কের এমন দশায় নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশিক্ষণ দায়িত্ব পালন করতে হয় উত্তরা ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের।
ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকেই এই ডিভিশনে সার্জেন্ট ও কনস্টেবলদের কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ সার্জেন্ট ও কনস্টেবল সংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেন, ‘এখানে যারা দায়িত্ব পালন করে তাদের অধিকাংশ নানা রোগে আক্রান্ত, তারা প্রচ- মানসিক চাপে ভোগে। এ কারণে এই ডিভিশনে বদলি হয়ে কেউ আসতে চায় না। বদলি হয়ে অন্য ডিভিশনে চলে যাওয়ার লোক বরং সংখ্যায় বেশি।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, অল্প বৃষ্টিতেই থার্ড টার্মিনালের সামনের রাস্তা পানিতে ডুবে যায়। গত কয়েক দিনে এমনটাই হয়েছে। এয়ারপোর্ট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের দক্ষিণ পাশ, এয়ারপোর্ট ফুটওভার ব্রিজের পশ্চিম পাশ এবং মনোলোভা রেস্টুরেন্ট, ছাপরা মসজিদ ও জসীমউদ্দীন পপুলার হাসপাতালের সামনের রাস্তায় পানি জমে আছে। রাস্তার পাশেই এলোমেলোভাবে বিআরটি প্রজেক্টের সরঞ্জাম, ব্লক, হার্ট-কোণ, বালি, পাথর প্রভৃতি পড়ে থাকে। খিলক্ষেত থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত সব ইউ-টার্ন বন্ধ। বিআরটির কাজের জন্য রাস্তার, বলতে গেলে, পুরোটাই এলোমেলো দশায় রয়েছে। অনেকেই সঠিক পথ নির্ণয় করতে পারে না। অনেকগুলো ফুটওভারব্রিজ ভেঙে ফেলা হয়েছে। জনঘন এই এলাকায় এখন মাত্র পাঁচটি ফুটওভারব্রিজ চালু রয়েছে, যা জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল।
রাস্তা উঁচু-নিচু এবং খানাখন্দে ভরা। ফলে প্রতিদিনই ঘটেছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। কোনো না কোনো পরিবহন দুর্ঘটনার শিকার হয়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ট্রাফিক পুলিশ বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস গর্তে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। এর আগে একদিন একটি সিএনজি অটোরিকশা রাস্তায় উল্টে যায়, এতে চালক আহত হন। এসব প্রতিদিনের চিত্র।’
এই বিষয়ে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ট্রাফিক মো. বদরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘এয়ারপোর্ট থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত রাস্তাজুড়েই বিআরটি’র কাজ চলছে। যানজট হোক তা আমরা চাই না। কিন্তু কাজ করলে যানজট হবেÑএটাই স্বাভাবিক। বিআরটির এই কাজের জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত জনবল (ট্রাফিক সদস্য) বিভিন্ন জোন থেকে এনে ডিউটি করাতে হয়। যখন তারা (বিআরটির লোকেরা) রাস্তা কাটে তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলি। বুঝতে চেষ্টা করি কতখানি রাস্তা কাটলে আমরা চাপ নিতে পারব। গাড়ি যাতে সচল থাকতে পারে। তখন তারা কাজ করে এবং আমরা তাদের সহযোগিতা করি। বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়। এখন আবার বর্ষাকাল, বুঝতেই পারছেন।’
এসি ট্রাফিক (এয়ারপোর্ট জোন) সাখাওয়াত হোসেন সেন্টু দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘গত রবিবার সকালে বৃষ্টি হওয়ায় এয়ারপোর্ট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের দক্ষিণ পাশের সড়কে পানি জমে যায়। সড়কের এক-তৃতীয়াংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান সঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না। পানির নিচে সড়কে আবার খানাখন্দ রয়েছে। এসব কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়। দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। আমরা বিআরটিকে বলে বলে দুটি পানিনিষ্কাশন পাম্প এবং আমাদের নিজ উদ্যোগে একটি পাম্পের ব্যবস্থা করি। একটি নিজস্ব অর্থায়নে ও দুটি অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) থেকে। পানি দ্রুত সরানোর জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পানি সরে গেলে দুপুর ১২টায় সড়কে গাড়ি চলাচল শুরু হয়।’
বেশকিছু বাস-চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘১৮ সালের আগে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে এয়ারপোর্ট পার হতে এক-দেড় ঘণ্টা সময় লাগত। এখন একই দূরত্ব পার হতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। সময় বেশি লাগার কারণে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা। সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রীরা। উঁচুনিচু সড়ক হওয়ার কারণে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। নষ্ট হচ্ছে গাড়ির বিভিন্ন সরঞ্জাম।’
বিকাশ পরিবহনের চালক মো. ইয়াছিন ৭ বছর ধরে এই সড়কে গাড়ি চালান। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন আমি এই সড়কে চলাচল করি। সড়কে প্রাইভেটের সংখ্যা বেশি। যে যেখানে ফাঁকা পায় সেখান দিয়েই ইউটার্ন নেওয়ার চেষ্টা করে। ফুটওভারব্রিজ না থাকায় সড়কে লোকের সংখ্যাও অনেক বেশি। সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। বিআরটির কাজ শুরুর পর রাস্তায় কাটাকাটি আছেই। এত ভাঙা যে, একই রাস্তায় একদিকে এক হাত উঁচু অন্যদিকে এক হাত নিচু। রাতে চলাচল কতটা ভয়ংকর তা কল্পনা করে দেখুন। উত্তরা থেকে এয়ারপোর্ট পার হতে আমাদের সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।’
এয়ারপোর্ট ট্রাফিক বক্সের টিআই অ্যাডমিন মোহাম্মদ খাদেমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূল সমস্যা হচ্ছে, ছয় লেনের মূল সড়কের প্রায় চার লেনই ব্যবহার করছে বিআরটি। দুই পাশের সার্ভিস লেনগুলোও বিআরটির কাজের কারণেই অনেকাংশে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে; কাটাকুটি, খোঁড়াখুঁড়ি তো আছেই। ফলে মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, আমাদেরও ব্যাপক কষ্ট করতে হচ্ছে। যতদিন রোডের কাটাকাটি বন্ধ না হবে বা ফ্লাইওভার চালু না হবে ততদিন এই সমস্যা থাকবে। আমাদের সিনিয়র স্যারদের প্রস্তাব দ্রুত কার্যকর করা হলে ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব। আশা করছি দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’
উত্তরার রাস্তাজুড়ে বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের কাজ চলমান। বিআরটি প্রকল্প রাজধানীর এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে শুরু হয়। দশ বছরে প্রকল্পের ৮০%-এর কিছু বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের শেষের দিকে বা আগামী বছরের শুরুর দিকে মূল কাঠামো প্রস্তুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।