দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে উদ্বোধন হয়েছে সুনামগঞ্জবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত স্বপ্নের রানীগঞ্জ সেতুর। সেতুটি চালু হওয়ায় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে সুনামগঞ্জের দূরত্ব কমে এসেছে ৫৫ কিলোমিটার। গতকাল সোমবার ঢাকায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে একযোগে দেশের ১০০টি সড়ক সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে ১০টায় রানীগঞ্জ সেতুর উদ্বোধন করেন তিনি।
আর এরই মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো। উদ্বোধনের পর গতকাল থেকেই রানীগঞ্জ সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়। এতে করে জগন্নাথপুর উপজেলাসহ জেলাবাসীর মধ্যে যেন আনন্দের জোয়ার বইছে।
সুনামগঞ্জবাসী বলছে, জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ সেতুটি পুরো জেলার সড়ক যোগাযোগে ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে। সেতুটি উদ্বোধনের মাধ্যমে কুশিয়ারা নদীতে দীর্ঘদিনের খেয়া ও ফেরি পারাপারের ভোগান্তি শেষ হচ্ছে। সেতুর এপারে সুনামগঞ্জ, ওপারে হবিগঞ্জ। মাঝখানে কুশিয়ারা নদী। সেতুটি চালুর পর হবিগঞ্জ হয়ে কম সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে পারবেন সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দারা। সুনামগঞ্জ থেকে এখন রাজধানী ঢাকাতে পৌঁছতে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ কমে আসবে। সময় বাঁচবে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা। সেতুটি ঘিরে নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় বিভোর এলাকাবাসী। পাশাপাশি সেতুটি সুনামগঞ্জের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন জেলাবাসী। কুশিয়ারা নদীর জন্য এতদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে জেলার বাসিন্দাদের। নৌকা কিংবা ফেরিতে নদী পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে যোগাযোগ করতেন দুই পারের কয়েক লাখ মানুষ। ১৯৯৬ সালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদের প্রচেষ্টায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার ডাবর পয়েন্ট থেকে জগন্নাথপুর হয়ে আউশকান্দি পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ হলেও কুশিয়ারা নদীর ওপর রানীগঞ্জ সেতুটি করতে পারেননি তিনি। পরে ২০১৬ সালের আগস্টে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংযোগ সড়কসহ প্রায় আড়াই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে রানীগঞ্জ সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে শুধু ৭০২ মিটার সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৯১ কোটি টাকা। বাকি ব্যয় ধরা হয় সংযোগ সড়ক, আধুনিক টোলপ্লাজা, কালভার্ট ও পাশের ইটাখলা নদীর ওপর আরেকটি ছোট সেতু নির্মাণে। ছয় বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ চললেও সেতুটির কাজ সম্পন্ন হওয়ায় হাওরাঞ্চলে নতুর দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সেতুটি সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর ও দিরাইসহ এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মাইলফলক তৈরি করবে বলে মনে করছে হাওরবাসী। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বাড়বে ব্যবসায়িক সম্পর্ক। সব মিলিয়ে উন্নয়নের মাপকাঠিতে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে পিছিয়ে থাকা হাওরের এই জেলা।
রানীগঞ্জ সেতুর নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ২৪ ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২৪ বি এবং এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এমবিইএল। চুক্তি অনুযায়ী ৭০২ দশমিক ৩২ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সময়মতো হয়নি।
রানীগঞ্জ সেতুর সম্ভাব্য সুফল তুলে ধরে রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রানীগঞ্জ সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী ঢাকাসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগে সুবিধা হবে। ঢাকার সঙ্গে কমবে দূরত্ব, বাঁচবে সময়। তা ছাড়া আশপাশে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। যা এলাকার বেকারত্ব নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।’
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আকমল হোসেন বলেন, ‘রানীগঞ্জ সেতু উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে জগন্নাথপুরসহ জেলাবাসীর দীর্ঘদিন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল।’
রানীগঞ্জ সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল রানীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান ও স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল রানীগঞ্জ সেতুসহ জেলার আরও ১৬টি সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রানীগঞ্জ সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘এ সেতুটি সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রসার ঘটাবে। এটি জেলার মানুষের স্বপ্নের সেতু।’