রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে কড়া নাড়ছে মন্দা; সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সংকটও প্রকট হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ চলমান রোহিঙ্গা সংকট ও নিরাপদ সমুদ্র অর্থনীতি নিয়েও বিপাকে রয়েছে। অমীমাংসিত ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক আরও অনেক ইস্যু সামনে আসছে। এ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আরও জোরদারে ঢাকায় বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ৩৩টি দেশের শতাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা। তাদের মধ্যে সব অতিথির আগমন এখনো চূড়ান্ত না হলেও এ নিয়ে কাজ করছে ঢাকা।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৩টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফরম ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনআইওআরএ’-এর বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আয়োজনে আগামী ২২ ও ২৩ নভেম্বর আইওআরএ জোটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কমিটি সিএসওর বৈঠক হবে। আর ২৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে সদস্য দেশগুলোর মন্ত্রিপর্যায়ের ২২তম সম্মেলন। এতে ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও ১০টি দেশ। ১৯৯৭ সালে আইওআরএ প্রতিষ্ঠিত হলেও ২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশকে ২০২১-২৩ সাল অর্থাৎ দুই বছরের জন্য জোটের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। জোটের সহসভাপতি শ্রীলঙ্কা ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছে ইন্দোনেশিয়া।
আইওআরএ’র সম্মেলন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও বিদেশি অতিথিদের আগমনের প্রস্তুতি এবং এজেন্ডা নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো দেখভাল করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত এ নৌ-কর্মকর্তার হাত ধরেই এসেছিল বাংলাদেশের অমীমাংসিত সমুদ্রসীমার দখল।
রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইওআরএ’র সদস্য রাষ্ট্র এবং ডায়ালগ পার্টনারদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি ইতিমধ্যে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেছে সেটি বলার সময় এখনো হয়নি। আশা করি, কাছাকাছি সময়ের মধ্যে অন্যরাও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন। তবে এবারের সম্মেলন, প্যানেল ডিসকাশন, বিভিন্ন সেশন ও সাইডলাইন বৈঠকগুলোতেও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেবে ঢাকা।
চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া পরিস্থিতিতে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি, গ্যাস ও খাদ্যসংকটের যে আলোচনা তৈরি হয়েছেসেটিকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সাপ্লাই চেইনসংক্রান্ত বাধাসমূহ, ট্রেড লজিস্টিকের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়েও আলোচনা হবে।
আইওআরএ মূলত দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক, সমুদ্রনিরাপত্তা, মৎস্য ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা, একাডেমিক এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, ব্লু ইকোনমি এবং উইমেনস ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট নিয়ে কাজ করে থাকে।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও এবারের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে। এ ছাড়া একটি অবাধ, উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঝুঁকিসহিষ্ণু ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিনির্মাণের যে উদ্যোগ সেটিও গুরুত্ব পাবে। বাদ যাবে না যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সহযোগিতার উদ্যোগ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) বা ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশন (আইপিভি), ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌচলাচলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সমন্বয়ে গঠিত ‘কোয়াড’-এর বিশ্লেষণও।
এর আগের ২১টি বৈঠকে আলোচনা হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভিন্নমতের কারণে আইওআরএ কৌশল নির্ধারণ করতে পারেনি। বাংলাদেশ এর আগেই স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, অবাধ, মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দেখতে চায়। কোনো একক দেশের বা গ্রুপের আধিপত্য এখানে দেখতে চায় না বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইওআরএ’র ডায়ালগ পার্টনারদের মধ্যে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে বাংলাদেশ সফরের বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আইওআরএ’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশের তরফে ওই আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সফরের নিমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি। তার সফর নিয়ে কৌতূহলী কূটনীতিকরা। তিনি বাংলাদেশে আসবেন বলে নিশ্চিত করেছে মস্কো। বিশেষ করে এতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা অংশ নিলেও তারা একে অপরের মুখদর্শন পরবর্তী সৌজন্য আলাপে বসবেন কি-না, সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে পররাষ্ট্র বিভাগে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলে এটি হবে দেশটির কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফর। তার সফরে দ্বিপক্ষীয় একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে দুই দেশের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকে বেশকিছু চুক্তি ও সমঝোতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।
ল্যাভরভ আসছেন এমনটি এখনই নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যখনই সুযোগ পাই তখনই তাদের (রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের) আমন্ত্রণ জানাই। এবারও তাই করেছি। তিনি এলে আমরা খুশি হব।’