হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অনেক কথাই মনে পড়ে। তাকে নিয়ে অনেক কথাই লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কেন যেন তা সম্ভব হয় না নানা কারণে, তবে আমার অলসতাই যে মূল কারণ তা বুঝি। বন্ধুদের জন্য তাই আমার দুটো ঘটনার কথা জানালাম।
সব কথা কি ভুলে থাকা যায়?
হুমায়ূন আহমেদের সাথে পরিচয় আমার সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে, কিন্তু দেশে বিদেশে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সম্পর্কটা কিছুটা শিথিল হয়ে গিয়েছিল। মইনুল আহসান সাবেরের সাথে আসা যাওয়ার ফলে সম্পর্কটা আবার ঘনিষ্ঠ হল। হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায় মাঝে-সাঝে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা মারতাম, আর আমার বাসার আড্ডা অনেক সময় রাত ২টা পর্যন্ত চলতো। এখন একটা মজার গল্প বলি।
একদিন হুমায়ূন ভাই আমার বাসায় এসেছেন আমার পেইন্টিং কালেকশন নিয়ে আলোচনা করে সুলতানের একটা ছবি নিতে। তিনি সুলতানের ‘হারভেস্ট’ পর্বের একটা ছবি নিলেন, আর আমার স্ত্রী শিরীনকে বললেন—‘ভাবী, এই ছবিটা আমার দেয়ালে আগামীকাল টাঙ্গাবো, আগামী রোববার সন্ধ্যায় আমার বাসায় আপনার ‘ডালভাতের’ দাওয়াত, এসে ছবিটাও দেখবেন আর একসাথে রাতের খাবারটাও হবে। আমার স্ত্রী খুশি মনে দাওয়াত গ্রহণ করলো।
রোববার রাতে দেখলাম আমার স্ত্রী বেশ সাজগোজ করে হুমায়ূনের বাসায় যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। বললাম—‘এতো সাজুগুজুর প্রয়োজন কি?’ শিরীন বলল—‘হুমায়ূন ভাইয়ের জন্য সাজছি না, তার বাসায় নুর ভাই, জয়ন্ত দা, আলমগীর ভাই, মাজহার ভাই, সাবের ভাইসহ কত ভাই থাকে, ভদ্রভাবে যেতে হবে তো!’ যাহোক, আমরা ভদ্রভাবে সেজে তার বাসায় রাত ৮টায় উপস্থিত হলাম। গিয়ে দেখলাম হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায় ‘কে যেন একজন’ ছাড়া আর কেউ নেই। হুমায়ূন ভাই আর শাওন বেডরুমে। আমি ফোন করলাম হুমায়ূন ভাইকে, আর সাথে সাথে তিনি ‘লুঙ্গি-পরা খালি-গা’-অবস্থায় একটা নীল রঙের হাওয়াই শার্ট পরতে পরতে এলেন। এসেই তিনি বসার ঘরে বসে থাকা ভদ্রলোককে বিদায় করে দিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন তার বেডরুমে। হুমায়ূন ভাইয়ের বেডরুমটি ছিল বেশ বড়, সেখানে ছিল একটা বড় ১০০ ইঞ্চি টিভি আর খাটটিও ছিল বিশাল। শাওনের শরীর খারাপ ছিল, জ্বরে ভুগছিল বেচারি, তাও কষ্ট করে আমাদের সাথে গল্পে যোগ দিল সে। শিরীন অনেকটা জোর করেই শাওনকে বিছানায় পাঠিয়ে হুমায়ূন ভাইয়ের সাথে আড্ডা জমালো। হুমায়ূন ভাই ছবি আঁকা নিয়ে অনেক কিছুই জানতে চাইলেন আমার কাছে, ম্যাজিক দেখালেন আর আমাকে শেখালেন কিছু ম্যাজিক ট্রিক।
রাত সাড়ে দশটার দিকে হুমায়ূন ভাই বললেন—‘চলুন, খাওয়া যাক।’ এই বলে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন বসার ঘরে, নিজেই একটা মাদুর বিছালেন, তারপর বুয়াকে বললেন খাবার দিতে। বুয়া এক বোল ভাত আর একটা বিশাল বাটিতে ডাল দিয়ে গেল। শিরীন ১৫ মিনিট অপেক্ষা করল অন্যান্য খাবারের জন্য। আমি বুঝতে পারলাম হুমায়ূনের মনে নিশ্চয়ই অন্য কোন মতলব ঘুরছে। প্রায় ২০ মিনিট পর তিনি শিরীনকে বলল- ‘আমিতো আপনাকে ডালভাতের দাওয়াত দিয়েছি, আপনি অন্য খাবারের জন্য অপেক্ষা করছেন কেন?’ আমরা সবাই হেসে দিলাম। শিরীন বলল—‘ডালভাতই সই, একটা কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিতে বলেন।’ হুমায়ূন নিজেই উঠে গেলেন, দুই হাতে করে মুরগির কারি আর সালাদ এনে বললেন—‘সরি ভারি, আমার বাসায় কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ নাই। আপনার বাসায় গেলে আপনি আমাকে বিষ খাওয়াবেন, এই ভয়ে আমি মুরগিটা রাঁধতে বলেছিলাম, নইলে কথা ঠিক রাখতাম, ডালভাত।’ আমরা হুমায়ূনের রসিকতা উপভোগ করতে করতে রাতের খাবার খেলাম। শাওনকে দেখে বাসায় ফেরার সময় হুমায়ূন বলেছিল—‘ভাবি, আজ সকাল থেকে শাওনের শরীর খারাপ, জ্বর, আর তাই পোলাও কোর্মা করিনি, ‘ডালভাত’ শব্দটার অর্থ কিন্তু আমাদের দেশে ডাল আর ভাত না।’
আজ অনেকটা ইমোশন নিয়ে হুমায়ূনের গল্প বললাম। হুমায়ূন আহমদের মৃত্যু সংবাদ আমি প্রায় সাথে সাথে নিউইয়র্ক থেকে পেয়েছিলাম, আর ঐ দিন যে ইমোশন নিয়ে আমি অস্থির হয়েছিলাম, আজ তাকে স্মরণ করতে গিয়ে ঠিক তেমন অস্থিরতায় ভুগলাম। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাকে, আর আমি মনে করি তার মতো নান্দনিক আত্মার জীবন সব সময় সুন্দরেই থাকে।
হুমায়ূন আহমেদ: ১০৭ নম্বরে শেষ দিন
এই লেখাটি লিখতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তারপরের লিখতে ইচ্ছে করছে খুব। হুমায়ূন তখন ছবি আঁকা শুরু করেছেন এবং তিনিও জানেন যে আমিও শখের ছবি আঁকি। আমার ছবির সংগ্রহ দেখে তার ভালো লেগেছিল, আমার প্রশংসা করতেন খুব, এবং তার ইচ্ছে হয়েছিল ছোটখাটো একটা শিল্প সংগ্রহ গড়ে তোলার। আমার কাছ থেকে সুলতান, কামরুল হাসান, নুরুল আমিন প্রমুখের শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। তিনি যখন ছবি আঁকা শুরু করলেন তখন আমার সাথে তার বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছিল দর্শন ও শিল্পকলাকেন্দ্রিক।
আমার বাসায় প্রথম দিকে নিছক গল্পগুজব আর আড্ডা মারার জন্যই তিনি আসতেন। তিনি কখনো কোথাও গেলে একা যেতেন না, তার সাথে থাকতো তার পছন্দের কিছু লোকজন। আমার বাড়িতে প্রথম যখন আসতেন, তখন সাথে থাকতো অন্যপ্রকাশের মাযহারুল ইসলাম, অবসরের আলমগীর রহমান আর দিব্য প্রকাশের মইনুল আহসান সাবের। অনেক সময় হুমায়ূনের সাথে আমার অপরিচিত দু-একজন থাকতো, যাদের নাম আমার মনে নেই। কিন্তু ছবি আঁকা শুরু করার পর একদিন বিকেলে অবসর প্রকাশনীর আলমগীর রহমানকে নিয়ে আমার বাসায় এসে উপস্থিত। আসার কারণ হল, আমার আঁকা কিছু পেইন্টিং দিয়ে তিনি তার প্রকাশিতব্য বইয়ের কভার করতে চান। আমার কিছু পেইন্টিং দেখে তিনি দু-একটা নির্বাচন করে আলমগীর রহমানকে কিনতে বললেন। আমি তখন হুমায়ূন ভাইকে বুঝালাম, পেইন্টিং বেশ দামি জিনিস, এই জিনিস কিনে কভার করলে প্রকাশকের পোষাবে না। আমার কথা তিনি মানলেন, পেইন্টিং দিয়ে কভার করার পরিকল্পনা বাদ দিলেন।
বেশ কিছুদিন পর একদিন রাত ১০টার দিকে হুমায়ুন ভাই এলেন জয়নুলের আঁকা সাঁওতালদের একটা ছবি ফেরত দিতে। ছবিটি খুবই ছোট ছিল, তাই পছন্দ হচ্ছিল না কিছুতেই। তিনি বললেন, আমার কাছ থেকে একটা বড় জয়নুলের ছবি চাই তার, আমাকে জোগাড় করে দিতেই হবে। আমি চেষ্টা করবো, এমন আশা দিয়ে গল্প করতে বসলাম আমরা। সেদিন হুমায়ূন ভাইয়ের সাথে ছিল জনা তিনেক জারী-সারী গান গাইবার শিল্পী। এই শিল্পীদের তিনি জোগাড় করেছিলেন তার কোন এক সিনেমা বা নাটকের জন্য। আরও দু-একজন হয়তো ছিল, কিন্তু কারা ছিল তা আমার মনে নেই। ঘরের খাবার আর বাইরে থেকে আনা খাবার দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। তারপর গল্প করতে করতে রাত ১২:৩০ বেজে গেল। হঠাৎ হুমায়ূন ভাইয়ের ইচ্ছে হল গান শোনার। জারী-সারী গানের শিল্পীদের বলা হল গান গাইতে। গভীর রাতে তারা উচ্চস্বরে গাইতে শুরু করলেন গান। ভালোই লাগছিল আমারও।
কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী দৌড়ে এসে আমাকে বলল—‘দেখ, এটা একটা ফ্ল্যাট বাড়ি। এতো রাতে এতো জোরে জারী-সারী গাইলে ফ্ল্যাট আর আশপাশের লোকজন আমাদের পাগল ভাববে অথবা ঐ লোকজন পাগল হয়ে যাবে। তুমি হুমায়ূন ভাইকে বলে গান বন্ধ করাও।‘ আমি খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম, তবু হুমায়ূন ভাইকে বললাম—‘গানটা একটু আস্তে করলে ভালো হতো, ফ্ল্যাট বাড়িতো।‘ হুমায়ূন সাথে সাথে ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন, বললেন—‘তাইতো, ফ্ল্যাট বাড়িতে লোকজনের ঘুমের অসুবিধা করা ঠিক না, গান থামাও। ভাবি রাগ করে নাই তো?’ এই বলে তিনি সবাইকে নিয়ে উঠলেন ঘরে ফেরার উদ্দেশে। আমার স্ত্রী এলো তাকে বিদায় জানাতে। তখন তিনি বললেন—‘ভাবি যাই, একবার এক বিখ্যাত নাট্য-অভিনেতার বাসায় (অভিনেতার নাম বললাম না) রাত দুইটা পর্যন্ত আড্ডা মেরে হইচই করেছিলাম, ঐ বাসার ভাবি আমার যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আজ আপনার বাসায় গেঞ্জাম করলাম, আপনিও আসতে না করবেন। ১০৭ নম্বর রাস্তার এই বাসায় এই আমার শেষ আসা।‘ আমার স্ত্রী বলেছিল—‘না ভাই, আপনি রোজ আসলেও আমরা খুব খুশি হব। আপনার মত মানুষ আসলে তো আমরা ধন্য।’
এই ঘটনার পর হুমায়ূনের সাথে আমার কথা হয়েছে। একবার আসতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার বাসায় বলা তার শেষ কথা—‘১০৭ নম্বর রোডের এই বাসায় এই শেষ আসা’ সত্য হয়ে গেছে। তিনি তার ক্যান্সার রোগ নিয়ে শেষ হয়ে গেছেন, কিন্তু আমার বাসায় আর আসতে পারেননি। এখন আমি তাকে বলি—‘হুমায়ূন, হুমায়ূন ভাই, আমি জানি আপনি আপনার সুন্দরে আনন্দে আছেন, আপনাকে আমার বাসায় আর আসতে হবে না, আমি আসছি।’
লেখক: ভূ-প্রকৌশল উপদেষ্টা। কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ‘প্রান্ত’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তিনি একাধারে কবি, শিল্পী, প্রাবন্ধিক।