দেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগে ভুগছে। এ ধরনের রোগীদের ঘুমের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এশিয়া মহাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ইউরোপ-আমেরিকার ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকরা মনে করেন, এ রোগটি মানুষের জন্য গুপ্তঘাতক।
গতকাল রবিবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে স্লিপ অ্যাপনিয়া বিষয়ক এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব তথ্য জানান। অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া বাংলাদেশ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে চিকিৎসকরা জানান, বয়স অনুযায়ী মানুষের ঘুমের প্রয়োজনীয় সময় ভিন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের পরামর্শ অনুযায়ী, ৬-৯ বছর বয়সী শিশুদের রাতে অন্তত ৯-১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ১০-১৭ বছর বয়সীদের ৮-১০ ঘণ্টা এবং ১৮-৬৪ বছর বয়সী মানুষের রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ৬৫ বছরের চেয়ে বেশি বয়সীদের জন্য ঘুমানো প্রয়োজন ৭-৮ ঘণ্টা। অনেকেই এর চেয়ে কম ঘুমিয়েও সুস্থ থাকতে পারেন। তবে এর নানাবিধ ক্ষতিকর দিকও রয়েছে।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ঘুমের সমস্যাজনিত বিভিন্ন রোগের মধ্যে স্লিপ অ্যাপনিয়া অন্যতম। দীর্ঘমেয়াদি স্লিপ অ্যাপনিয়া একজন মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পরে।
অনুষ্ঠানে নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এ রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই জানেন না তারা এ রোগে আক্রান্ত। অনেকে স্লিপ অ্যাপনিয়াজনিত রোগকে বয়সজনিত স্বাভাবিক রোগ মনে করেন। ফলে তারা চিকিৎসকের কাছে আসেন না। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থায় সচেতনতা তৈরি জরুরি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে এখন এ রোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে। বিএসএমএমইউতে ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে স্লিপ অ্যাপনিয়া শনাক্ত ও অবস্থা নির্ণয় করা হয়। এটির ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু বলেন, একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। ঘুমের অভাবে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ব্রেন স্ট্রোক, বন্ধ্যত্ব, ক্যানসার ও মানসিক রোগ দেখা দেয়। এ রোগের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
তিনি জানান, পৃথিবীতে করোনার আগে ৫৫ শতাংশ মানুষ এবং করোনার পরে ৭৭ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব অথবা ঘুমের জটিলতায় ভুগছেন। তার মধ্যে ২৪ থেকে ২৯ শতাংশ মানুষ নাক ডাকেন ও স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগে ভুগছেন।
স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগের ব্যাখ্যা দিয়ে এ চিকিৎসক বলেন, এতে আক্রান্ত রোগীদের ঘুমের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচবারের বেশি ১০ সেকেন্ডের জন্য দম বন্ধ হয়ে যায়। ঘুমের অভাবে মানুষ মাত্র ১১ দিন বাঁচতে পারে। অথচ না খেয়ে বাঁচতে পারে ৬৬-৭৭ দিন। ঘুমের সমস্যার কারণে প্রতি বছর আমেরিকাতে ৪১১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়, ৮০ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এমনকি চেরনোবিল ও থ্রি মাইল নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা ঘটেছিল কর্মরত ব্যক্তিদের ঘুমিয়ে পড়ার কারণেই।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ও বিশেষ অতিথি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান।