ঋণ আদায়ে চেক ডিজঅনার মামলা নয় : হাইকোর্ট

ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে বেসরকারি আর্থিক সংস্থা বা এনজিওগুলো ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে যে চেক নেয়, সেই প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে এখন থেকে আর্থিক সংস্থা ঋণ অনাদায়ে গ্রহীতার বিরুদ্ধে নিগোশিয়েবল চেক ডিজঅনার (চেক প্রত্যাখ্যান) মামলা করতে পারবে না। এ ছাড়া ঋণ গ্রহীতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার করা চেক প্রত্যাখ্যানের মামলা স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছে হাইকোর্ট।

বেসরকারি ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্স থেকে ঋণ নেওয়া এক গ্রাহকের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টের মামলায় সাজার রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত রবিবার বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্টের একক বেঞ্চ এ রায় দেয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট ঋণ অনাদায়ে আর্থিক সংস্থাগুলোর আচরণের সমালোচনা করে বলে, তারা গরিব মানুষকে স্বাবলম্বী ও তাদের জীবন উন্নয়নের নামে জীবন ধ্বংস করছে। এসব সংস্থার আচরণ দাদন ব্যবসায়ীদের মতো।

মামলার নথি অনুযায়ী, পেশায় হকার নীলফামারীর ডোমারের চিলাহাটির বাসিন্দা মো. ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের জুনে স্থানীয় ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্স থেকে ব্যবসার প্রয়োজনে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। কিস্তিতে ঋণের অর্ধেকের বেশি টাকা পরিশোধ করার পর বাকি টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হন। ঋণ আদায়ে ইলিয়াস আলীর কাছ থেকে ২০১৩ সালের মে মাসে একটি চেক (সোনালী ব্যাংক) নেয় সংস্থাটি। যেখানে পাওনা লেখা ছিল ৪৫ হাজার ৮১৯ টাকা। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ইলিয়াস আলীর হিসেবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর ইলিয়াসকে আসামি করে ওই বছরের ১২ নভেম্বর এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় নীলফামারীর আদালতে মামলা করে ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্স। শুনানি শেষে নীলফামারীর সংশ্লিষ্ট আদালত ২০১৪ সালের ১৮ নভেম্বর এক রায়ে ইলিয়াসকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদ- ও চেকের সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। রায়ের সময় পলাতক ইলিয়াস গ্রেপ্তার হন ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। এরপর চেকের ৫০ ভাগ অর্থ জমা দিয়ে জেলা ও দায়রা আদালতে আপিল করেন তিনি। আপিলের শর্তে তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল করেন তিনি।

গত ৯ নভেম্বর আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। গতকাল হাইকোর্টের রায়ে ইলিয়াস আলীর আপিল মঞ্জুর করে তার সাজা বাতিল করে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আপিলের শর্তে যে অর্ধেক টাকা পরিশোধ করেছিলেন, সেটি আপিলকারীকে ফেরত দিতে বলেছে হাইকোর্ট। আদালতে আপিলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী রাশেদুজ্জামান বসুনিয়া। ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্সের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জিসান মাহমুদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আশেক মোমিন।

রায়ে আদালত বলে, ‘দেশের একটি বৃহত্তম জনগোষ্ঠী একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্রঋণের নামে ঋণ নেয়। কিন্তু এটি কীভাবে পরিশোধ হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায়ের জন্য চেক প্রত্যাখ্যানের মামলা করে আসছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।’ আদালত আরও বলে, ‘ঋণের বিপরীতে এসব প্রতিষ্ঠান জামানত হিসেবে চেক নেয়। এটি কোনো বিনিময়যোগ্য দলিল (নিগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট) নয়। তাই ঋণের বিপরীতে ব্যাংক চেক নেওয়া অবৈধ।’ আদালত অবিলম্বে ঋণ আদায় সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করতে জাতীয় সংসদে বিল আনার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে এই রায়ের নির্দেশনাগুলো প্রতিটি আদালতে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

আপিলকারীর আইনজীবী রাশেদুজ্জামান বসুনিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসরকারি আর্থিক সংস্থাগুলোর আচরণকে দাদন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তুলনা করেছেন হাইকোর্ট। মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলে জামানত হিসেবে চেক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো গ্রাহকের ওপর চাপ তৈরি করতে চেক নেয়। মামলা করে। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, কোনো চেক নেওয়া অবৈধ।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আশেক মোমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঋণ কীভাবে আদায় হবে- এ বিষয়ে যতক্ষণ কোনো নীতিমালা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এনজিওগুলোর করা চেক প্রত্যাখ্যান মামলা গ্রহণ না করতে অধস্তন আদালতের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট।’

অ্যাডভোকেট জিসান মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের এই রায়ের বিষয়ে অফিস কর্তৃপক্ষের (ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্স) সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যদি সম্মতি দেয় তাহলে আপিলের সিদ্ধান্ত হবে।’