লামার ম্রোপাড়ায় ফের হামলা বাড়িঘরে আগুন লুটপাট

বান্দরবানের লামায় ম্রোপাড়ায় হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শীতের রাতে হামলার সময় পাড়ার নারী-পুরুষ ও শিশুরা পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেও তাদের ঘরবাড়ি থেকে মূল্যবান সব মালামালের পাশাপাশি এমনকি কাপড়চোপড়ও হামলাকারীরা নিয়ে যায়। গত রবিবার মধ্যরাতে সরইয়ের রেংয়েনপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।

পাড়াবাসীদের অভিযোগ, ট্রাকভর্তি শতাধিক লোক এসে তাদের ওপর হামলা চালায়। তাদের উচ্ছেদ করে জমি দখলের জন্য এ হামলা চালিয়েছে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ভাড়া করা লোকজন। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা।

এর আগে গত বছর ২৬ এপ্রিল রেংয়েনপাড়া, লাংকমপাড়া ও জয়চন্দ্র ত্রিপুরাপাড়ায় ৩৫০ একর জুমের জমি পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল লামা রবার ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে। সে সময় কোম্পানিটির সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এবং ম্রো ও ত্রিপুরাদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছিল।

ম্রোপাড়ার বাসিন্দারা অভিযোগ করে জানান, রবিবার রাত ১টার দিকে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ট্রাকভর্তি শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে আসে। তারা ‘ধর ধর, ম্রো ধর’ বলে চিৎকার করতে করতে পাড়ার বাড়িঘরে হামলা শুরু করে। ট্রাকের শব্দ ও হামলাকারীদের চিৎকার শুনে পাড়াবাসী ঘুম থেকে জেগে যে যেভাবে পারেন জঙ্গলে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। হামলাকারীরা পাড়ার বাসিন্দাদের ছাগল, হাঁস, মুরগি, কম্বল, সৌরবিদ্যুতের প্যানেলসহ যা পেয়েছে, সবই লুট করে নিয়ে যায়।

হামলার বর্ণনা দিয়ে ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যান জোহান ত্রিপুরা বলেন, ‘গভীর রাতে ১০-১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী রেয়াংপাড়ায় গিয়ে প্রথমে কামরুম মুরুং, চিংচং মুরুং ও রেঙইয়াং মুরুংয়ের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আরও ১০টি বসতঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায়।’

পাড়ার আরেক বাসিন্দা রেঙয়েন কারবারি বলেন, ‘রাতে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পাড়াবাসীর চিৎকারে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি কয়েকটি ঘরে আগুন জ্বলছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তখন বাড়ির পাশের ঝোপে লুকিয়ে থাকি। হামলাকারীরা অনেক কিছু লুট করে নিয়ে গেছে।’

পাড়াবাসীর অভিযোগ, পাড়ার বেশিরভাগ মানুষ জুমচাষ, বাগান ও দিনমজুরি করে সংসার চালায়। তাদের চাষ করা জমিগুলো দখলের জন্য কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা সদস্য মো. আবদুল মালেক বলেন, ‘ম্রোদের সঙ্গে আমাদের ভূমির বিরোধ আছে সত্য। কিন্তু গভীর রাতে আমাদের পক্ষে ঘটনাস্থলে যাওয়া তো দূরে থাক, ম্রোদের সশস্ত্র পাহারার কারণে আমরা দিনের বেলায় পর্যন্ত ওখানে যেতে পারি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন থেকে ম্রো ও ত্রিপুরারা লামা রাবার লিমিটেডের সৃজিত বাগানের নানা প্রজাতির বৃক্ষ নিধন করে বসতি নির্মাণ করছিলেন। আমরা এ বিষয়ে লামা থানায় অভিযোগ দাখিল করলে পুলিশ তাদের বাগানের গাছ কেটে বসতি নির্মাণ করতে বাধা দেন। এ কারণে হয়তো তারা নিজেরা অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করে লামা রাবার কোম্পানিকে ফাঁসাতে চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লামা থানার ওসি শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘পাড়ার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও লুটপাটের বিষয়টি ম্রোরা জানিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’