মানুষের মনের ভেতর হেঁটে বেড়ানো একটা কবরের গল্প

গরু কাঁদছিল

হাট থেকে কিনে আনার তিনদিনের মাথায় আগের গরুটার সাথে নতুন গরুটাকে জুড়ে দিয়ে লাঙল চালাচ্ছিল মজু ওরফে মজু ঠ্যাংঠেঙি ওরফে ঠ্যাংঠেঙি ওরফে ঠ্যাং ওরফে মজু বগলা ওরফে বগু। তাকে একেকজন একেক নামে ডাকত। এসব নাম হওয়ার কারণ, তার সম্ভবত অন্য কোনো নাম ছিল না আর সে অসম্ভব ধরনের লম্বা আর পাতলা। পা দুটো বগলার মতো বলে তাকে বেশিরভাগ লোক মজু বগলা বা বগু বলে ডাকত।

গরুটা নতুন ছিল। লাঙল টানার অভ্যাস ছিল না। বারবার ঘাড় থেকে জোয়াল নামিয়ে দিতে চাইছিল। মজু বগলা বিরক্ত হয়ে সরু লাঠি দিয়ে সপাং করে একটা বাড়ি লাগায় পিঠের ওপর। সাথে সাথে গরুটা  ‘ওহ্ মাগো’ বলে আর্ত শব্দ করে। নতুন গরুর এ আর্তস্বর শুনে পুরাতন গরুটা হো হো করে হেসে ওঠে। নতুন গরুর মুখে যন্ত্রণাযুক্ত শিশুকণ্ঠের ‘ওহ্ মাগো’ আর পুরাতন গরুর হো হো হাসি শুনে মজু বগলা মাথাব্যথা বা বুক ব্যথা অনুভব করে বসে পড়ে জমির আলের ওপর। বেশক্ষণ লাগে তার ধাতস্থ হতে। সে দেখে গরু দুটো জোয়াল কাঁধে দাঁড়িয়েই আছে। যন্ত্রণাপ্রাপ্ত নতুন গরুটার মন খুব খারাপ। নতুন গরুটা বিষণ্ন বদনে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পুরাতন গরুটার হাসি হাসি মুখ। জ্ঞানীর হাসির মতো হাসি। মজু বগলা ধাতস্থ হওয়ার পরেও বসে থেকে থেকে বেশ কিছুক্ষণ বিষণ্ন আর জ্ঞানী গরুর দিকে তাকিয়ে থাকে। পানিপানের পিপাসা জাগে। জগ থেকে ঢকঢক করে পানি খায় সে। সে আবার গরুদ্বয়ের দিকে দয়ার চোখ দিয়ে তাকায়। তার ভেতর থেকে কেমন একটা অন্ধকার যেন দূর হয়ে গেছে। পৃথিবীর কোনো বইতে, কোনো মাস্টারের কাছে এ অন্ধকার দূর করা কিছু আছে কিনা সে বিষয়ে তার সন্দেহ জাগে। তার মন অসীম আলোতে ভরে গেছে যেন। তার ভেতর গভীর, গম্ভীর আনন্দপূর্ণ হয়ে উঠল।

মজু বগলা ভালো লোক। সে খুব ধীরে আর শান্তভাবে উঠে দাঁড়ায় আর গরু দুটোর কাছে গিয়ে তাদের কাঁধ থেকে জোয়াল নামায়, লাঙল খুলে ফেলে। আজ আর হাল দেবে না জমিতে। গরু দুটোর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় আর বাড়ি নিয়ে আসে। জোয়াল খুলে ফেলাতে নতুন গরু খুশি হয়, তার খুশি হওয়া দেখে পুরাতন গরু তার মিটিমিটি হাসি তখনো জারি রাখে।

 

গরুর সঙ্গে কথা

এরপর থেকে গরুদের সাথে পরামর্শ না নিয়ে বা তাদের অনুমতি না নিয়ে কোনো কাজ করত না মজু বগলা। তার অনুমতি বাক্যগুলো হতো এরকম  ‘কী রে গরুগণ আজ তো বিলের মাঠে হাল দিতে হবে। যাবি নাকি?’ কোনোদিন বলত  ‘কাটা ফসল মাড়াই দিতে হবে রে গরুরা, রাজি আছিস?’ কোনোদিন বলত  ‘আজকে তো মই দেওয়া দরকাররে সোনাধনেরা, বের করব দড়ি, মই, জোয়াল?’ এগুলো বলার পর সে গরুদের দিকে চেয়ে থাকত। সে যে কী বুঝত কে জানে, ওসব কথা বলার পর কোনোদিন বের হতো গরুদের নিয়ে, কোনোদিন বের হতো না। যদি তার পরিবারের কেউ বলত  ‘কী ব্যাপার গরু নিয়ে আজ মাঠে যাবে না?’ সে বলত না  ‘আজ ওরা রাজি নয়।’

যেদিন গরুগুলোকে নিয়ে কাজে যেত সেদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে যেত। ফিরে এসে গরুর পা মালিশ করে দিত নিজ হাতে, মাথা নেড়ে দিত, গান গেয়ে শোনাত

‘আয় ঘুম যায় ঘুম লেচ্চু বাগানে,

ভোর হলে তবে যাবি ফসল বাথানে’।

বগলা গরুদের কথা বুঝতে পারলেও তার পরিবারের লোকজন গরুর কথা বুঝতে পারত না। তার পরিবারের লোকজন তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকত যেন, তারা একটা পাগলের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু অন্যসব কাজ ঠিক ঠিক ছিল বলে তেমনভাবে কিছু বলতেও পারত না।

 

নতুন গরুর দ্বিতীয়বার কান্না

নতুন গরুটা পুরাতন হয়। পুরাতন গরুটা তারও আগে পৃথিবী ছেড়েছে। তখন বাড়ির লোকজন বলল  ‘গরুটাকে কোরবানির হাটে বিক্রি করে দেওয়া দরকার, যে দু’টাকা আসে। আরও একটা নতুন গরু কিনতে তো হবে।’

হাটে নিয়ে যাওয়ার আগেই পাশের বাড়ির কয়েকজন মিলে ভাগে কোরবানি দেওয়ার জন্য গরুটা কিনে নিল। তবে তারা অনুরোধ করল ঈদ আসতে যে সপ্তাখানেক সময় আছে ততদিন যেন বগলার বাড়িতেই থাকে গরুটা, খাওয়া খরচ যা লাগবে তাও দিয়ে দেওয়া হবে।

ঈদের দিন মজু বগলা নিজে গরুটা খুলে দড়ি ধরে টেনে নিয়ে যায় কোরবানির মাঠে। গরুটার দড়ি ধরে কোরবানিওয়ালা লোকগুলো যখন টানল তখন গরুর চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে দেখে বগলা বিচলিত বোধ করে আর তাদের হাত থেকে গরুটা ছিনিয়ে নেয়  ‘থাইক হামি গরু দিব না।’ তারা মজুর হাত থেকে গরুর দড়ি কেড়ে নেয়   ‘টাকা দিয়্যা গরু কিন্যাছি, হটো এখ্যান থাক্য।’

মজু বগলা বাড়ির দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে যায় আর দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে আসে  ‘এই ল্যাও টাকা, দ্যাও হামার গরু।’

কোরবানিওয়ালারা আপত্তি আর যুক্তি জানায়  ‘না, তা হবে না, আজ ঈদের দিন, কোরবানির গরু এখন আর কুণ্ঠে পাব।’ মজু বগলা জোরাজুরি করতে গেলে কয়েকজন তাকে ধাক্কা দেয়। সে পড়ে যায়। কয়েকজন গরুটাকে শুইয়ে দেয় কোরবানির মাঠে। গরুর গলা চেপে ধরে, পা চেপে ধরে, পেটে পিঠে চড়ে বসে কোরবানির লোকজন। গরুর গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বের হয়। ছুরি চলে গরুর মসৃণ গলায়। রক্ত ছিটকে এসে পড়ে বগলার গায়ে, ছড়িয়ে পড়া টাকার গায়ে। টাকাগুলো হো হো করে হেসে ওঠে। টাকার এ হাসিগুলোকে বগলার কান চুম্বকের মতো টেনে নেয় নিজের দিকে। কানদুটো শুধু টেনে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে না এগুলোকে কানকারখানা ব্যথামুদ্রায় রূপান্তর করে আর মজুর হৃৎপিণ্ডের রক্তের ওপর ভাসিয়ে দেয়। টাকার নির্মম, নির্লজ্জ হাসি বগলার হৃৎপিণ্ডের রক্তে ভাসে, লাফালাফি করে। তাকে অস্থির করে তোলে। সে উঠে গলা কাটা নিহত গরুর দিকে একবার করুণভাবে তাকিয়ে আহত হয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

 

অশীতিপরের প্রথম মৃত্যু

বগলা বাড়ি ফিরে আসে। তারপর বগলা বাড়ি ফিরে আসে। এরপরও ঈদ চলতে থাকে। তারপরও ঈদ চলতে থাকে সারা দিন ধরে। বগলা বাড়ি ফিরে আসে। তার সাথে গরু ফিরে আসে না। তার সাথে ঈদ ফিরে আসে না। মজু বাড়ি ফিরে আসে। সে বিছানাতে ডুবে থাকে। প্রাণের সাথে কোলাকুলি, ঝোলাঝুলি করে কয়েকমাস। কয়েকমাস সে তার প্রাণের সাথে কোলাকুলি করতে থাকে। জীবনের সাথে কুস্তি করতে থাকে। কখনো কখনো তার শরীর বাড়ির বাহির হতো, সে বাহির হতো না। কখনো কখনো সে লোকজনের সাথে কথা বলত কিন্তু লোকজন তাকে, তার কথাকে চিনতে পারত না।

 

বেঁচে থাকার আগে

নতুন গরুটা যেদিন ‘ওগো মা গো মরে গেলাম’ বলে কেঁদে উঠেছিল সেদিন থেকে গরু আর তাকে একই কাতারের জীব বলে ভেবে নিয়েছিল। গরু ছাড়া ফসল চাষ হবে না অথচ গরুকে মানুষ কত মারে! সে ভেবে নিয়েছিল একজন কৃষক কত কষ্ট করে ফসল ফলায় কিন্তু তাদের কদর কত কম, অপমান কত বেশি। অথচ পৃথিবীর প্রথম প্রয়োজন তো ফসল। লোহালক্কড় তো মানুষ খেতে পারে না। কিন্তু এসব ভুয়া লোহালক্কড়, অফিস, আদালত, পুলিশ, নেতা, চাকরি-বাকরি, যন্ত্রপাতি, টিভি রেডিওয়ালাদেরই যেন জগৎ। সে এসব ভাবতে ভাবতে ‘বেঁচে থাকার আগে কেউ বেঁচে থাকে কি না?’ বা ‘মরে যাওয়ার আগে কেউ মরে কি না?’ এ ধরনের প্রশ্ন করলে তার গ্রামের লোকজন বলত  ‘তোমাকে আমরা চিনি না, কোথা তোমার বাড়ি গো?’

 

অশীতিপরের দ্বিতীয় মৃত্যু এবং তার নাম

মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা ঘোষিত হতে থাকে ‘মোজাম্মেল হক মজু আজ রাত তিনটার সময় নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করিয়াছেন। তার জানাজা...’ এতদূরের পর মানুষজনের কান আর কিছু শুনতে পাই না, এমনকি কোনো কোনো কানের কানশক্তি ‘মোজাম্মেল হক মজু’ এতদূর পর্যন্ত নিয়েই তার কাজ বন্ধ করে দেয়। মানুষজন তাদের কানের ভেতর থেকে মৃত্যু সংবাদটিকে বের করে আনে আর চোখের সামনে সংবাদটির পোশাক খুলে ওপর নিচ ভালো করে দেখে। কারণ, এই মৃত্যুসংবাদে নাম প্রচারের আগে কারও জানা ছিল না  মজু বগলার নাম মোজাম্মেল হক। এ নাম শোনার পর সবাই-ই আশ্চর্যের ছুরির নিচে পড়ে যায়। আশ্চর্যের ছুরির নিচে পড়ার পর তারা আরবি দোয়ার মতো করে মনে মনে পড়ে  ‘লোকটা পরিচিত ছিল ঠ্যাঙ বা ঠ্যাংঠেঙি বা বগলা বা বগু নামে।’এসব নাম হওয়ার কারণ স্পষ্ট যে লোকটা খুবই লম্বা আর শরীরটাও মাত্রাতিরিক্ত পাতলা। এক বিঘা জমি কয়েক ধাপেই পার হয়ে যেত। ‘মোজাম্মেল হক’ এই নাম কোথা থেকে বের হলো কে জানে? হতে পারে তার ছেলেমেয়েরা আজই তার নামটি রাখল। অথবা তার মৃত্যুসংবাদ যে মোয়াজ্জিন ঘোষণা করছিল, সেই রাখতে পারে। একটা লোকের নাম তার মরণ হওয়ার পর রাখা হলো। গ্রামের লোকের প্রথমে বিস্ময় জাগলেও পরে তাদের ভালো লাগে, মজু ঠ্যাং বা ঠ্যাংঠেঙি বা মজু বগলার একটা নাম রাখা হয়েছে বলে, তাতে তার নামটা তার ছেলে-মেয়ে বা মসজিদের মোয়াজ্জিন নিজেই বা যে-ই রাখুন না কেন।

 

তার আরও একটি নাম যা লোকজন দিয়েছিল

পাগল। খ্যাপা। বেঁচে থাকার সময় লোকজন এ নাম দিয়েছিল, কারণ সে গরুদের সাথে কথা বলত, কারণ সে ‘বেঁচে থাকার আগে কেউ বেঁচে থাকে কি না?’ বা ‘মরে যাওয়ার আগে কেউ মরে কি না?’ জাতীয় প্রশ্ন করত। সে মারা যাওয়ার পর তার কবরের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে লোকজন বলত  ‘লোকটার নাম রাখা হয়েছিল কবরে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে মাত্র...’

এরপর বলা শুরু করত তার অন্য কথাগুলো।

যারা এসব গল্প শুনত তারা অনেক সময় ভয় পেত। তারা গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে একটা কবরকে পাগলামি করতে করতে হেঁটে যেতে দেখত বাতাসের ওপর দিয়ে, গরুর হেসে ওঠা দেখতে পেত, গরুর কেঁদে ওঠা দেখতে পেত।