অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ

ধান থেকে চিড়া হয়। চিড়া বানানোর বিশেষ প্রক্রিয়া আছে। এ ক্ষেত্রে এমনভাবে চাপ দেওয়া হয় যাতে চাল ভেঙে গুঁড়ো না হয়ে বরং চ্যাপ্টা হয়ে যায়। অর্থনীতিতেও এমন কিছু চাপ আছে যাতে ক্রেতা বা ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা একেবারে নিঃশেষ হবে না কিন্তু এমন পরিস্থিতি দাঁড়াবে যে সে জীবন্মৃত হয়ে টিকে থাকবে। একে চিঁড়েচ্যাপ্টা দশা বলা যেতে পারে। ক্ষমতাসীনরা বলবেন কই, না খেয়ে মানুষ তো মরেনি। আর সাধারণ মানুষ ভাববেন এভাবে বেঁচে থাকার কষ্ট যদি আপনারা বুঝতেন?   

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি আলোচনা এখন আর শুধু অ্যাকাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। এখন সাধারণ মানুষও জানতে চাইছেন এবং জানতে পারছেন কী হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে, ডলারের রিজার্ভ কত, খেলাপি ঋণ কত, কে বা কারা ঋণ নিচ্ছেন বিপুল পরিমাণে আর তার প্রভাব কী পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। কিন্তু কী করবেন তারা? না জানাটা অজ্ঞতা আর জেনেও কিছু করতে না পারাটা তাদের অসহায়ত্ব। তার পরও জানতে হয় এবং তারা সেটা জানছেন পত্রিকা মারফত। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে গিয়ে গত বছরের মার্চ থেকে দেশে ডলারের চাহিদা আর দাম দুটোই বেড়েছে। ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৬ টাকা। এতে ২০২২ সালে ডলারপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ২০ টাকা। এর ফলে মেটেনি ডলার-সংকট, বরং বেড়ে গেছে টাকার চাহিদা। ব্যাংকগুলো টাকা দিয়ে ডলার কিনে আমদানি বিল পরিশোধ করেছে আর ডলার কিনতে গিয়ে অনেক ব্যাংক টাকার সংকটে পড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। ফলে আমদানি খরচও বেড়েছে ৪.৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৭৩১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৫৮ শতাংশ বেশি। আর জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৪৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৪৮ শতাংশ বেশি। যদিও গত দুই বছরে ১৮ লাখ মানুষ বিদেশে গেছেন, যাদের ৭০ শতাংশই গেছেন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। কিন্তু ওইসব দেশ থেকে বৈধ উপায়ে প্রবাসী আয় তেমন বাড়েনি। এসব সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ (রিজার্ভ) কমে ৩২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১১২ কোটি ডলার পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২৫৭ কোটি ডলার। এর আগে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে রিজার্ভ ৩ হাজার ২৫৭ কোটি ডলার হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে রিজার্ভের ৮০০ কোটি ডলার ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ২ হাজার ৪৫৭ কোটি ডলার। গত নভেম্বর মাসে আকুতে ১৩৫ কোটি ডলার পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছিল। আমদানি দায় মেটাতে কমছে রিজার্ভ। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্ত-আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এশিয়ার ৯টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তা দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি হয়। আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। অর্থনৈতিক সংকটে দেনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলঙ্কা এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

দেশের অভ্যন্তরে ব্যাংকগুলোর আমানত কমছে। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৪৪ শতাংশ। আর ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.৮২ শতাংশ। অর্থাৎ দ্বিগুণের বেশি ঋণ বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। আমানতের সুদ মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম বলে অনেকেই ব্যাংকে টাকা রাখছে না। এর মধ্যে ইসলামি নামের পাঁচ ব্যাংকের অনিয়ম আলোচনায় আসায় গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আবার অনেকে খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন করে সঞ্চয়ও কমে এসেছে। গত ডিসেম্বরে শুধু একটি ইসলামি নামের ব্যাংকেরই আমানত কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে সার্বিকভাবে আমানত কমে গেছে। গত অক্টোবরে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৯০ হাজার ৪৩ কোটি টাকা, নভেম্বরে যা ৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। পাশাপাশি বেশি দামে ডলার কেনা, রেমিট্যান্স কেনা, রপ্তানি বিল নগদায়নে গ্রাহকদের বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। আবার ব্যবসা মন্দার কথা বলে ব্যবসায়ীরাও ঋণ পরিশোধ করতে গড়িমসি করছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছরে (২০২২) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে সব মিলিয়ে ১ হাজার ২৬১ কোটি ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই সময় প্রতি ডলার ৯৮ টাকা ধরলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো থেকে এই পরিমাণ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভোল্টে চলে যাওয়াতেও অর্থসংকট বেড়েছে। এতে কিছু ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে মাঝেমধ্যেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদামতো নগদ জমা (সিআরআর-ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) রাখতে পারছে না কিছু ব্যাংক। ইসলামি নামের পাঁচ ব্যাংকের পাশাপাশি গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক, বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকও চাহিদামতো সিআরআর রাখতে পারেনি। অন্যদিকে গত ৬ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৬৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ধার করেছে বাংলাদেশ সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া এ ঋণের টাকার অর্ধেকের মতো ব্যয় হয়েছে সরকারের বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ৩৩ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকার ঋণ শোধ করতে। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকের কাছে নেওয়া ঋণ কমলেও বেড়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণের পরিমাণ। আমদানি, রপ্তানি, ব্যাংকের তারল্য, ঋণ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকের আমানত সবকিছুর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫.২ শতাংশ হতে পারেএমন পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্ট’ প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশ নয় অন্যান্য দেশ সম্পর্কেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যেমন, ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ২ শতাংশ, নেপালে ৫.১ শতাংশ, ভুটানে ৪.১ শতাংশ, মালদ্বীপে ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিষয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ করে থাকে বিশ্বব্যাংক। ডলার-সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ হলো, ২০২২ সালের জুন মাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ১৮ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ৮০০ কোটি ডলার। এ কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুদকে সহায়তা করতে এবং বিদেশি মুদ্রার চাহিদার চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা চেয়েছে, যা পাওয়া যাবে সাত কিস্তিতে এবং সুদের হার হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ। এই ঋণ এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে, তবে শর্ত পূরণ করা শুরু করে দিয়েছে বাংলাদেশ।

ওপরের স্তরে এসব আলোচনা মানুষকে স্পর্শ না করলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে কিছুদিন ধরেই। বিশেষ করে এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া। ২০২১ সালের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বিপুল পরিমাণ বাড়ানোর পর থেকে মূল্যস্ফীতি যেন মাত্রা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৮৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে ৯.১ শতাংশ হলেও এই দুই মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালের আগস্টে গত ১১ বছর ৩ মাসের (১৩৫ মাস) মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। এর আগে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ১০.২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। ২০১১ সালের মে মাসের পর মূল্যস্ফীতি আর কখনো ৯ শতাংশের বেশি হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হওয়া দরকার। কিন্তু যারা নীতিনির্ধারক তারা কোনো পরামর্শ কানে তুলছেন বলে মনে হচ্ছে না। বরং বিরোধীদের বিরোধিতা করতে তাদের সময় ও শক্তি ব্যয় করছেন।

এরই মধ্যে বছরের শুরুতেই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এরপর বাড়াল গ্যাসের দাম। এত দিন দাম বাড়ানোর জন্য গণশুনানির যে নামকাওয়াস্তে পদ্ধতি ছিল এবার সেটাও আর রক্ষা করা হলো না। বিদ্যুৎ খাতে কী এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে এত দ্রুত দাম না বাড়ালে চলত না? এর ফলে কী হলো? এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তো তাহলে আর কিছু করার থাকল না। সংগত কারণে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে এত কষ্টের টাকা খরচ করে কমিশন নামক প্রতিষ্ঠান রাখার কী প্রয়োজন? শুনানি হলে অন্তত কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারতেন, দুর্নীতি-অনিয়ম ও কোম্পানির অদক্ষতার বিষয়টা আলোচনা এবং জবাবদিহির মধ্যে আসতে পারত। ফলে এটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মানে একটাই, তা হলো যা সিদ্ধান্ত নেব তাই বাস্তবায়ন করব। আর নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর পদ্ধতি চালু হলে বাজারে মনোপলি (একচেটিয়া) তৈরি হবে। এতে লাভবান হবে কোম্পানিগুলো, তারা অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নেবে। আর কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা কমবে, অদক্ষতা ও অপচয় বাড়বে। আর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহন করে জনগণ চ্যাপ্টা হতেই থাকবে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

rratan.spb@gmail.com