সুবিমলঝামেলা

‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’ শব্দবন্ধ আদতে কী অর্থ প্রকাশ করতে চায় তা এখনো বুঝতে না পারলেও সুবিমল মিশ্রকে সেই বিরোধিতার আইকনিক ক্যারেক্টার মনে হতো। ‘প্রথাবিরোধী’ আরেকটা শব্দবন্ধ, যেটা মিশ্রের চেহারা সিগনিফাই করে। আমার বন্ধুদের সুবিমল মিশ্র পাঠের উদগ্র আগ্রহের প্রধান কারণ ছিল মিশ্র সম্পর্কিত প্রচলিত কিছু বয়ান। যেমন ধরা যাক‘সফলতা এলে আমি ভয় পাই। কারণ নতুন কিছু করলে সফলতা সঙ্গে সঙ্গে আসবে না। আমি যদি সফলতা পাই তার মানে হলো আমি এমন কিছু করছি যা তত নতুন নয়’; বা তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত বা বৃহৎ পত্রিকায় লেখেননি, লিখেছেন লিটল ম্যাগে, বই প্রকাশ করেছেন নিজে এবং বিক্রি করেছেন ইত্যাদি। তার আইডিওলজিক্যাল অবস্থান পাশে রেখেও, প্রশংসা বা বাহবাকে প্রত্যাখ্যান করার স্পর্ধা আমাদের দারুণ আগ্রহ জাগিয়েছে। তার কথাবার্তা ও গল্পের চরিত্র আমাদের অনেক রকম অ্যানালাইসিসের জন্য রেডি ফ্রেমওয়ার্ক সরবরাহ করেছে। মধ্যবিত্ত মননে বেড়ে উঠতে থাকা আমাদের যৌনতাবিষয়ক নরমেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি ভাঙতেও তিনি ছিলেন একটা বড় গেটওয়ে। তবুও, সেটা যেন সেই ইন্ট্রোডাকশন অব্দিই থেকে যায়; ব্যক্তি সুবিমল আর তার সাহিত্যজীবন গুরুত্বপূর্ণ একটা বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হয়ে আমাদের মধ্যে থেকে যায়। ১. মিশ্র একটা প্রবণতা। তার প্রতি উদগ্র আগ্রহে আমার ভাটা পড়ল কেন? বছর-বিশেক আগে আমার পড়ার লিস্টের মিশ্র তো একটা আইডিওলজিক্যাল গেটওয়ে হিসেবে ছিলেন। যদি আমি তাকে ডিজওন নাও করি বলতে তো দ্বিধা নেই যে তিনি আর আমার পড়ার লিস্টে থাকেননি। আলাপের লিস্টেও না। সম্ভবত, একজন বিপন্ন দশায় উপস্থিত শিল্পীর প্রতি যে রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি তা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। ২. মারা যাওয়ার আগে তার কোনো খোঁজ জানতাম না। দু-একবার দেখেছি লোকে তার বাড়ি যায়, ভিডিও করেন, আলাপ-সালাপ করেন। তিনি ঘরময় বইপত্র নিয়ে বসে আছেন। আর হ্যাঁ, পেছনে ঋত্বিক ঘটকের একটা ফটো। কী বইপত্র পড়ছেন বা ২২টা করে ওষুধ খাচ্ছেন সেগুলো বলেন। টাকাপয়সার তো কিছু টানাটানি থাকারই কথা। না থাকলেই তো তিনি আর মিশ্র থাকেন না। যেনবা তার এইটাই ব্রত। এসবের মধ্যে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্পর্ধা খুঁজতে থাকি তার চেহারায় বা কথাবার্তায়। ৩. সাহিত্য বা সিনেমা ব্যাপারগুলার প্রধান কনজুমার তো মধ্যবিত্ত মনন। প্রতিষ্ঠানবিমুখ হয়ে এগুলো কোন রাস্তায় চলবে? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেন, প্রতিষ্ঠানবিমুখতা একটা টোটাল ব্যাপার। মানে এতটাই টোটাল যে, সে এপ্রিসিয়েশনও নেয় না। মিশ্র আমাদের অলটারনেটিভ কী দিতে চেয়েছিলেন? আমার ঘরে তিনি বই নিয়ে হাজির হন নাই তো। আমি একটা অভিজাত বইয়ের দোকান থেকে তার বই কিনেছিলাম। জানা যায়, তিনি লেখার মধ্যে অনেক রকম সিনেমেটিক টেকনিক ব্যবহার করতেন। গদার আর বুনুয়েলরা তো সিনেমা নিয়ে তার ঘরে এসে দিয়ে যান নাই। তিনি তো বৈশ্বিক বিপণন সিস্টেমের মাধ্যমেই বই বা সিনেমা পেয়ে থেকেছেন। গদার তাকে সাহিত্যের গদার বলেছেন বলে জানা যায়। তিনি নিজেও দারুণ গদার আর বুনুয়েল দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আমি তো চাইতামতিনিও, মানে সাহিত্যের গদারও, গদারের মতো সেলিব্রেটেট লাইফ লিড করুন। বড় কাগজ বা বড় প্রকাশনী বা এই টোটাল বিপণনব্যবস্থাকে তিনি যেভাবে স্পর্ধার সঙ্গে ডিনাই করেছেন তা দেখতে দারুণ, একটা নান্দনিক ব্যাপার আছে। হতেই পারে আমি সম্ভবত তার সাহিত্যকে সাহিত্যজীবন থেকে আলাদা করে দেখতে চাইছি। তিনি হয়তো সবটা মিলে, মানে তার অমোঘ পরিণতিসহ টোটাল ব্যাপারটাকেই একটা সাহিত্য প্রজেক্ট বানিয়েছেন। যেমন একটা আইকন তিনি সব সময় ঘরে ঝুলিয়ে রাখতেন। মানে, ঋত্বিক ঘটক।