মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার আড়ালে ‘এমএলএম’-এর আদলে ‘অনুদান বাণিজ্য’ পরিচালনা করে কয়েক হাজার গ্রাহকের কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক প্রতারক চক্রের মূল হোতাসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে গত ৬ জানুয়ারি দেশ রূপান্তর পত্রিকায় এই প্রতারকদের কর্মকা- নিয়ে ‘এমএলএম আদলে অনুদান বাণিজ্য’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ পায়। এরপরই তদন্তে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন প্রতারক চক্রের মূল হোতা ‘বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার’ প্রেসিডেন্ট মির্জা আবদুল কাদের (৪৪), তার সহযোগী মির্জা নাসির উদ্দিন (২৫), মাহফুজুর রহমান (৫০), এ আর আব্দুল মোমেন (৪৯), মেহেদী হাসান (২৫), আমজাদ হোসেন (৩৪), মঞ্জুরুল হাসান খান (৩৫), আব্দুল বারিক (৩৮), রুহুল আমিন (২৫), মোছা. মুন্নি (৩০) ও নিলুফা ইসলাম নিপা (৩৪)। এ সময় অফিসে আটকে রাখা এক ভুক্তভোগীকেও উদ্ধার করা হয়।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান র্যাব-১ এর অধিনায়ক কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন।
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ‘মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার’ আড়ালে এমএলএম ব্যবসার নামে প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল। অভিযুক্তরা সমাজের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তদের টার্গেট করে মাসিক ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে মাসিক ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সংস্থাটির দাতা সদস্য বানায়। এ জন্য অনুদান হিসেবে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করত। চক্রটি এরই মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
চক্রটির মূল হোতা আব্দুল কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-১ এর অধিনায়ক বলেন, কাজের নামে দাতা সদস্যদের দিয়ে এমএলএমের আদলে নতুন দাতা সদস্য সংগ্রহের কাজ করাতেন আব্দুল কাদের। ভুক্তভোগীদের বলা হতো ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দাতা সদস্য হওয়ার পর বেতন ১০ হাজার টাকা হবে। কাজ দেওয়া হতো সোর্স বা ইনফরমারের। এলাকায় বাল্যবিবাহ হলে, দরিদ্র পরিবার মেয়ে বিয়ে দিতে না পারলে এবং নদীতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তোলা হলে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের জানাতে বলা হতো। এমন সহজ চাকরির আশায় ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দাতা সদস্য হওয়ার পর তাদের জানানো হতো নতুন দাতা সদস্য আনতে হবে। নতুন সদস্য আনতে না পারলে বেতন হবে না। অথচ চক্রটি টাকা নেওয়ার আগে লোক সংগ্রহের বিষয়ে কিছুই বলত না।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগীরা টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়ে বেতন না পেয়ে বাড্ডার অফিসে গেলে তাদের মামলা দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করার ভয় দেখায় চক্রটি। অধিকাংশ সদস্যই সমাজের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
এদিকে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যেও প্রতারণার বিষয়টি উঠে আসে। চাকরির আশায় গত বছর ১৫ নভেম্বর এ চক্রের খপ্পরে পরে ২০ হাজার টাকা দেন টাঙ্গাইলের কালিহাতীর বাসিন্দা রাশিদা আক্তার জানান, তাকে মাসে ১১ হাজার টাকা বেতনে চাকরির কথা বলে দাতা সদস্য বানানো হয়। চাকরি আশায় ঋণ করে টাকা দেন তিনি। তাকে বলা হয়েছিল টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানা এলাকায় কোনো বাল্যবিবাহ হলে কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। সদস্য হওয়ার তিন দিন পর তাকে বলা হয় অনুদান দেওয়ার জন্য লোক সংগ্রহ করতে হবে।