প্রাণিজগতে শুধু মানুষই বই পড়ে, গান শোনে, সিনেমা দেখে কিংবা যেকোনো বিস্ময়ের বিপরীতে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। পাঠ একটি পরিকল্পিত বিষয় এবং পাঠকের নির্দিষ্ট একটা প্রস্তুতি পাঠের পূর্বশর্ত।
এসব বিবিধ বাস্তবতায় দেখা যায় সব লেখা পাঠককে নিরাময় দিতে পারে না। তাই লেখকদের সাহিত্যের একটা সাঁকো তৈরি করে যেতে হয়। একটার সঙ্গে একটা নিবিড়ভাবে জোড়া লাগাতে হয় যেন লেখকের শ্রম ও সততার সাক্ষ্য প্রত্যেকটি লেখা বহন করে। একজন লেখক লিখতে পারেন বলেই অনন্য। এমন লেখাই তিনি লিখতে চান, যা পাঠককে এগিয়ে নেয়। পাঠকের চিন্তাকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যে লেখক নিজেও নড়তে রাজি নন, পাঠককেও নাড়াতে আগ্রহী নন, সেসব লেখক কূপমন্ডূক।
কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে লেখক যদি প্রকাশনা, পুরস্কার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাচর্চার জায়গায় সম্পৃক্ত না থাকেন, সে ক্ষেত্রে একজন লেখকের নিজেকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কি দ্বিগুণ হয়? তারা কি খানিকটা পিছিয়ে পড়েন আলোচনার দৌড়ে? নিষ্ঠাবান তরুণ লেখকদের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতা কি আরও প্রকট? বাস্তবতা হচ্ছে, এটা খারাপ কিংবা ভালো যাহ হোক, কিন্তু বাজার চলতি প্রবণতা।
এর ফলেই দেখা যায়, বইমেলায় প্রকাশিত হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে মানসম্মত বই যথেষ্ট কম থাকে। খোদ বাংলা একাডেমির যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, গড়ে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার বইয়ের বিপরীতে এক-চতুর্থাংশ বইকেও ভালো বই হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বেশির ভাগ বই কাঁচা, বেদিশা ও সচ্ছল লেখক নামধারী মানুষের। অর্থাৎ যারা পাঠক হিসেবেই পরিণত হননি, এমন অনেকেও বই ছাপিয়ে লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন। ফলে অসংখ্য বইয়ের মধ্যে খুব সামান্য কিছু বই-ই লেখকের। তাই নিজ গুণে প্রকৃত লেখকের বই সংগ্রহ করা পাঠকের দায়িত্ব। কারণ অপচয়ের অর্থ অন্য কোনো কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।
একটা ভালো বইয়ের কয়েকশ কপি বিক্রির বিপরীতে প্রচারসর্বস্ব গতানুগতিক একটি বই যখন হাজার কপি বিক্রি হয়, তখন প্রকাশক কোন বইটাকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী, সেটি এক গোলকধাঁধা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকাশক পাঠকদের জন্য ভালো বইটির পেছনে এত বিনিয়োগ না করে বাজার চাহিদার কাছে সমর্পিত হতেই অধিক মনোযোগী হন। ফলে একটা উত্তম বইয়ের সম্ভাবনাকে হাইজ্যাক করে নেয় স্থূল বইয়ের ব্রোকাররা। এই ব্রোকারদের কোনো শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নেই। তারা মূলত বইয়ের বাজারের লোভনীয় প্রোডাক্ট। কিন্তু এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এ দেশের মানুষের মেধার বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছে দিনের পর দিন, এর সুরাহা কীভাবে সম্ভব?
লেখক বলতে সব সময় সিরিয়াস হয়ে সিনেমার ফাইটিং দৃশ্যে অভিনয় করবেন তা নয়। আবার লেখক মানেই সর্বদা হাসিমুখে বইমেলার স্টলের সামনে অটোগ্রাফ দিতে দিতে ঘাম ঝরাবেন তাও নয়। তবু দেখা যায় প্রথাগত ও দুর্বল ঘরানার লেখকরাই সবচেয়ে বেশি কদর পান প্রকাশকের কাছে। কারণ সেসব লেখকের থাকে নিরঙ্কুশ বশ্যতা ও ফরমায়েশ অনুযায়ী লেখা উৎপাদনের লোভ। কিন্তু লেখকের সার্বভৌম ক্ষমতা এতে মøান হয় না। বিশ্ববিখ্যাত লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস গতানুগতিক চিন্তার লেখককে বাজে লেখক বলে আখ্যায়িত করেছিলেন তার এক বক্তব্যে। এটাই সত্য।
বাকি লেখকদের তিনি গতানুগতিক স্টোরিটেলার কিংবা এন্টারটেইনার হিসেবে গণ্য করেন। অর্থাৎ যারা নতুন প্যাকেটে পুরনো কাহিনি মোড়কজাত করেন। মৌলিক লেখকরাই এর মধ্য থেকে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হতে থাকেন সময়ের হাত ধরে। তারা পাঠকের জন্য নতুন কিছু যুক্ত করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ লেখক তাদের নিষ্ঠা ও শ্রমের জায়গায় অধিকমাত্রায় আপস করার কারণেই এ সমস্যাটা তৈরি হয়। দৈনিক পত্রিকা ও বিভিন্ন মিডিয়ার প্রচ্ছন্ন একটা চাপ তাদের প্রলুব্ধ করে। ব্যাপারটা এমন যে, তারা এর চেয়ে বেশি ঝুঁকি কেনই বা নিতে চাইবেনÑ বিষয়টা যখন নিতান্তই প্রচার ও বিজ্ঞাপন সম্পর্কিত।
সাহিত্যের ভাণ্ডারে যদি ক্রমাগতভাবে একই রকম খাবার যুক্ত হতে থাকে, তখন পাঠকের মধ্যে সেগুলো অনীহা তৈরি করে। গড়পড়তা সাহিত্যের প্রধান সমস্যা হচ্ছে, এগুলোতে ভাবনার খোরাক অনুপস্থিত থাকেÑ যেন শুধুই চোখ বুলিয়ে যাওয়া। তারপর পাঠ শেষ হওয়ার পর পাঠকের বোধের জায়গায় পাঠের কোনো প্রভাব পড়ে না।
অথচ লেখকের চিন্তা ও দর্শনের স্বচ্ছতাই লেখক হিসেবে নিজেদের পথচলাকে দীর্ঘ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর খামতি লেখকদের বিদায়কে ত্বরান্বিত করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এ দেশে শিশু-কিশোরদের নিয়ে যারা লেখালেখি করেন, তাদের বড় একটা অংশ মেধাহীন, অশিক্ষিত ও ভূত-প্রেততাড়িত। সাহিত্যের এই মাধ্যমকে তাদের বেছে নেওয়ার কারণ সম্ভবত ভালোবাসা নয়Ñ অদক্ষতা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। দেখা যায় একটা মানসম্পন্ন বইয়ের বদলে অসংখ্য আবর্জনা বই আকারে বাজারে আসে।
মেধাহীন ও সামাজিক সুবিধাভোগী মানুষগুলো যখন সাহিত্যের কেন্দ্র নিয়ে জল ঘোলা করে ও ফায়দা তোলেন, তখন কিছু মেধাবী ও সামাজিকভাবে কোণঠাসা লোক মেধাহীনদের পা চাটতে উদ্বুদ্ধ হন। এটা এই জনপদের সাহিত্যচর্চার চলমান এক বাস্তবতা।
ফলে সন্তুষ্ট রাখার সাহিত্য থেকে বিরত থাকা লেখক ও পাঠক উভয়ের জন্য জরুরি। যে বই বিষয় ও আঙ্গিকে আকর্ষণ করে না, সেই বই নিয়ে অযথা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকাই সততার পরিচয়। আবার বিশেষ কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির লোভে পছন্দের লেখকের তালিকায় শুধু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন লেখকদের স্থান দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাও সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচনার ভার বইতে পারে যে বই, সে বই নিয়েই কথা বলা উত্তম।
লেখক যখন শুধু পোস্টার-লিফলেটে ভর করে পাঠকের দিকে ধাবিত হতে চান, পাঠককে লোভ দেখান, তখন তিনি পিছিয়ে যান। কারণ লেখকের যত বেশি মেধা ও নিষ্ঠা, তত বেশি ক্ষমতা ও জ্ঞানের বিচ্ছুরণের সম্ভাবনা। অন্যদিকে যত বেশি অজ্ঞতা ও অক্ষমতা, তত বেশি আস্ফালন। আর স্থূল চিন্তার লেখকদের আস্ফালন চোখে লাগে। একজন লেখকের তাই ক্রমাগতভাবে লিখে যাওয়া ছাড়া বাদবাকি সবকিছু অর্থহীন। লেখক হিসেবে নিজেদের জীবিত রাখার নিমিত্তেই এই লেগে থাকা জরুরি। যদিও যেকোনো সময় থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েই লেখকের এই নিরন্তর যাত্রা।
দেখা যায়, কাগজে লেখা ছাপানোর যে মোহ, তার সঙ্গে সমকালের লেখকদের একটা খাতির সব সময় থাকে। সাহিত্যের কোনো কোনো মাধ্যমে এর প্রভাব সারা বছর থাকে। দুর্বল বিষয় ও নিম্নমানের বইয়ের প্রকাশনা কখনোই কমে না। শুরুর উত্তেজনা বাদ দিলে আদতে বিষয়গুলো অর্থহীন। ফলত লেখালেখি হওয়া উচিত লেখকের জন্য নির্মোহ একটি অবস্থান। বেঁচে থাকাকে অর্থপূর্ণ করতেই এই লেখালেখি। নিজেকে আবিষ্কার করা, আর প্রতিদিনের পুঞ্জীভূত ক্লেদ ও দর্শনের অনুবাদ করাই লেখকের আরাধ্য।
এটাও সত্য যে, পাঠকের রুচি পরিবর্তনযোগ্য। কিন্তু পাঠককে লেখা দিয়ে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে যখন একজন লেখক কলম ধরেন, তখন লেখকের স্বপ্নটা অনেক বড় থাকা জরুরি। এ দেশের লেখকদের স্বপ্নকে ছেঁটে ফেলতে বাধ্য করা হয়। ফলে ধীরে ধীরে লেখকের মনটাও ছোট হয়ে যায়। ছোট-বড় এত এত লেখকের এত এত বই বেচা-বিক্রির যে উন্মাদনা মেলাকে কেন্দ্র করে ছড়ায়, তার সামান্যই হয়তো পাঠকের মগজে ঢোকে।
লেখক ভালো লিখতে আগ্রহী নাকি মনোরঞ্জনবাদী হতেই অধিক ইচ্ছুক, তা বুঝতে বেশি দিন সময় লাগে না। কারণ যে যেভাবেই লিখুক, লেখালেখি তার কাছে পরম আরাধ্য। ফলে কেউ যখন ভালো লিখতে চান, সিদ্ধান্তটা তাকে দ্রুতই নিতে হয়। কারণ এরপর একসময় ভালো লেখার ক্ষমতাই ফুরিয়ে যায়।
একজন লেখক বেশির ভাগ সময় ভাবনার মধ্যেই থাকেন। তার সামান্যই লিপিবদ্ধ করেন। গ্রন্থভুক্ত করেন তার চেয়েও কম। ফলে কেউ বেশি লেখেন নাকি কম লেখেন, এই ভাবনা আপেক্ষিক। কারও বেশি বা কম লেখার দায় কেউ নেন না। পরিমাণে খুব কম লিখেও সারা জীবন তৃপ্ত থাকার সুযোগ থাকে লেখকের। একইভাবে অধিক লেখাও কখনো কখনো লেখকের তৃপ্তি মেটাতে পারে না। বেশি লেখার স্বপ্ন যেমন খারাপ কিছু নয়, তেমনি কম লিখে তৃপ্ত থাকাও অন্যায় নয়। মৌলিক লেখক হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার নয়। এটা লেখকের চিন্তা ও দর্শনের চূড়ান্ত ফসল। কেউ পরিমাণে কম লিখে সেটা অর্জন করেন। কেউ আবার পরিমাণে বেশি লিখেও অনেক সময় সে ফসল ঘরে তুলতে পারেন না।
তাহলে সাহিত্যকর্মের বহুরৈখিক সম্ভাবনা কীভাবে তৈরি হয়? উত্তম সাহিত্য এমনই যে পাঠককে সহসা মোহগ্রস্ত করে। পাঠক ওই নির্দিষ্ট রচনার ভার এড়াতে পারেন না। কারণ সাহিত্য লেখকের দৃষ্টিভ্রম হওয়ার বিষয় নয়, এটি একান্তই নতুন চিন্তা। ফলে পাঠকের মুখোমুখি হতে তাকে বেগ পেতে হয় ঠিকই, কিন্তু উত্তম লেখা শেষমেশ পাঠকের দরজা ভেদ করে অন্দরে ঢুকে পড়ে সন্তর্পণে।
লেখক যখন পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে প্রভাবিত করেন কিংবা তাদের গতানুগতিক চিন্তা-পদ্ধতিতে বিপর্যয় ঘটাতে শুরু করেন, তখন লেখকের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। পাঠকের প্রথাগত সংস্কার ও আরামের জায়গাটি তিনি সরিয়ে দেন প্রতিনিয়ত।
যেকোনো সাহিত্যকর্মও অন্যান্য শিল্পের মতো প্রকৃতির অনেক অপ্রকাশ্য সৌন্দর্যের মতো, চোখে পড়লেই শুধু তা আবিষ্কৃত হয়। একেকজনের কাছে একেকভাবে। কিন্তু লেখক কোনো গাণিতিক সমাধানের নিমিত্তে লেখেন না। তিনি সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানের মতো লেখাকেও জীবনদান করেন মাত্র। চিন্তার সৌন্দর্য দিয়ে একজন লেখক লেখাটিকে প্রস্ফুটিত করেন। তারপর সেই সাহিত্যকর্ম নিজেই তার প্রস্ফুটিত সৌন্দর্য দিয়ে পাঠকের চিন্তার গভীরে নাড়া দিতে থাকে।
পাঠক ভালো বইয়ের মুখোমুখি হোক, এ দেশের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বই হাতিয়ার হয়ে উঠুক।