‘মানবতাবাদী’ সাহিত্যের বিপক্ষে মাসরুর আরেফিন; ইকতিজা আহসানের সঙ্গে আলাপ। সাক্ষাৎকারের এই বইটি বইমেলা ২০২৩-এ প্রকাশিত। মাসরুর আরেফিনের এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইকতিজা আহসান দুই পর্বে।
১. প্রথম পর্ব-২০২০, জুন-ডিসেম্বর। ২. দ্বিতীয় পর্ব-২০২২, অক্টোবর-ডিসেম্বর। সম্পাদনার সময় পুরো সাক্ষাৎকারের ৪ ভাগের ১ ভাগ অর্থাৎ প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার মতো লেখা ফেলে দেওয়া হয়েছে এই বই থেকে।
‘মানবতাবাদী’ সাহিত্যের বিপক্ষে বলে এই বইকে একটা শেপে রাখার, দেখানোর মানে দেখি না। এটা কি মার্কেটিংয়ের টুল? একটা ধাক্কা দেওয়া পাঠককে? ধাক্কা দিয়ে কি আগ্রহী করা যায় পাঠককে পাঠে? কেন এটা বলছেন মাসরুর আরেফিন? ২৯৬ পৃষ্ঠার এই বইয়ে প্রবেশের জন্য এই ধাক্কাটা আমার প্রয়োজন নেই। বইয়ের নাম ‘মাসরুর আরেফিনের সাক্ষাৎকার’ই যথেষ্ট ছিল।
সাক্ষাৎকারের ‘র’ ফ্লেবার আপনি এখানে পাবেন না। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্পাদনা করে এই বইকে এমন একটা মার্জিত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে বইটাকে সাক্ষাৎকারের বই মনে হয় না বা এরকম সাক্ষাৎকার পড়তে আমরা অভ্যস্তও নই, এ দেশে এমন বইয়ের উদাহরণও কম। বইয়ের প্রথম পর্বে সাক্ষাৎকার গ্রহীতার ভূমিকা খালি চোখে নিরালম্ব মনে হয়। মনে হয় মাসরুর আরেফিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে বলছেন, নিজের এতদিনের কংক্রিট জার্নির রাস্তা নিজে পরখ করে দেখছেন, নিজের ভাবনায় শান দিচ্ছেন, নিজের অবস্থানটা একটা সার্কেলে এঁটে দিচ্ছেন কিংবা নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন। আবার দ্বিতীয় পর্বে ইকতিজা আহসানকে জেগে উঠতে দেখি। সেখানে তার ভূমিকা একদম পাল্টে যায়। দ্বিতীয় পর্বে মনে হয় মাসরুর আরেফিন আয়নার সামনে কথা বলা ছেড়ে পৃথিবীতে নেমে এসে হাঁটছেন ইকতিজা আহসানের সঙ্গে আর ইকতিজা আহসানও একটা উপায় পেয়ে গিয়েছেন মাসরুর আরেফিনের ভয়াবহ কথার ফ্লোকে কিছুটা দিকে রাখার। নিছক সাক্ষাৎকারের বই না হয়ে বইটা হয়ে উঠেছে রেফারেন্স বুক, বিশ্বসাহিত্য নিয়ে, বাংলা সাহিত্যের বিশ্বমানের লেখা নিয়ে জানতে চাওয়া পাঠকদের জন্য একরকম টেক্সটবুক, মাসরুর আরেফিনের লেখক ও পাঠক সত্তার আত্মজীবনী। এই বইটার প্ল্যানিং প্রায় ৩ বছর আগে হলেও মাসরুর আরেফিনের এমন এক বইয়ের অপেক্ষায় আমি তারও আগে থেকে।
বইটা আমার জন্যই। ২০১৯ এ মাসরুর আরেফিনের ‘আগস্ট আবছায়া’ পাঠের পর আমি খুব আগ্রহী হয়ে উঠি মাসরুর আরেফিনের সাহিত্য যাত্রা নিয়ে জানতে। শুধু তার লেখা নয় তার পাঠ জীবন নিয়েও জানতে, তার ফিলোসফি জানতে।
ইকতিজা আহসান নিজেও মাসরুর আরেফিনের লেখার মুগ্ধ পাঠক বলেই ইচ্ছাকৃতভাবে সাক্ষাৎকারে নিজের সাক্ষাৎকার গ্রহীতার অবস্থান থেকে অনেকটা গুটিয়ে এনে প্রথম পর্বে নিজেকে অলমোস্ট শ্রোতার আসনে বসিয়ে ফুল স্পেস দিয়েছেন মাসরুর আরেফিনকে। এই স্পেসটা ছিল বলেই এই বইয়ে মন খুলে মাসরুর আরেফিন তার কথাগুলো বলে গেছেন। সাক্ষাৎকার শেষে ওয়েল ডিজাইন করা গেছে বইটির এবং আমার জন্য ঠিক এই প্রসেসে বের হওয়া মাসরুর আরেফিনের কথাগুলো শোনার প্রয়োজন ছিল দীর্ঘদিন ধরেই।
এই বইতে যাওয়ার আগে মাসরুর আরেফিনের সাহিত্য যাত্রার এক সামারি করা যাক। মাসরুর আরেফিনের জন্ম ১৯৬৯ সালের ৯ অক্টোবর। প্রথম বই; যেটা কবিতার বই, ‘ঈশ্বরদী মেয়র ও মিউলের গল্প’ প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। সেই একই দিনে একই সন্ধ্যায় মাসরুর আরেফিনের প্রিয় বন্ধু; যার সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল হয়নি কোনোদিন সেই ব্রাত্য রাইসুরও প্রথম কবিতার বই ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি বের হয়।
একজন লেখকের প্রথম যখন বই প্রকাশিত হয় তখনই কি কেবল তিনি লেখক হন? মোটেও না। একজন লেখক প্রথমে হন পাঠক। পাঠ করতে করতেই একসময় লেখক সত্তার বীজ আসে ভেতরে। সেটা ধীরে ধীরে লিখতে লিখতে, পড়তে পড়তেই বাড়তে থাকে। এই বীজটা প্রথম যেদিন আসে সেদিন থেকেই তিনি লেখক। সম্ভবত বরিশাল ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময়ই মাসরুর আরেফিনের ভেতর এই বীজ আসে। সবার সামনে লেখক হিসেবে প্রকাশিত হন কবিতার বই প্রকাশের মাধ্যমে ২০০১ সালে।
এরপর ২০১৩ সালে তার প্রথম অনুবাদ ‘ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র’ প্রকাশিত হয়। এর দুই বছর পর প্রকাশিত হয় তার অনুবাদে হোমারের ‘ইলিয়াড’। এরপর ২০১৯ সালে এক বিস্ফোরণ ঘটান বাংলা সাহিত্যে তার প্রথম উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া’ দিয়ে। এর পরের বছর ২০২০ সালে প্রকাশ করেন তার দ্বিতীর উপন্যাস ‘আলথুসার’ ও দ্বিতীয় কবিতার বই ‘পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়’। তার পরের বছর ২০২১ সালে প্রকাশিত হয় মাসরুর আরেফিনের তৃতীয় উপন্যাস ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ ও তৃতীয় কবিতার বই ‘পরিস্থিতি যেহেতু আগুন হয়ে আছে।’ এর পরের বছর ২০২২ এ প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ উপন্যাস ‘আড়িয়াল খাঁ’। এই বইমেলায় (২০২৩) প্রকাশিত হলো এই সাক্ষাৎকার গ্রন্থ।
৪টি উপন্যাস, ৩টি কবিতার বই, দুটি ঢাউস অনুবাদ গ্রন্থ আর এই সাক্ষাৎকার গ্রন্থ মিলে অবাক কি লাগে না যে, ২০০১ এ প্রথম কবিতার বই প্রকাশের পর তার মৌলিক গ্রন্থ নিয়ে ১৮ বছর পর কেন এলেন একজন মাসরুর আরেফিন?
এই ১৮ বছর মাসরুর আরেফিন নিবিড় প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছেন। তিনি কখনো একদিনের জন্য সরে আসেননি তার প্রবল পাঠ ও নিয়ম করে বসে লেখালেখি থেকে। আপনাদের অনেকের কাছে মাসরুর আরেফিনের ব্যাংক এমডি পরিচয় মুখ্য মনে হলেও আমার কাছে তিনি সাধক, সাহিত্যের সাধক। তিনি চাইলেই প্রতি বছর ১টা করে ১৮ বছরে ১৮টি বই বের করতে পারতেন। করেননি। তিনি সময় নিয়েছেন নিজেকে শাণিত করতে, পাঠে নিমগ্ন থেকেছেন জীবনের অপার প্রয়োজনে, নিজেকে বৈশ্বিক পরিসরে বিশ্বমানে প্রকাশ করতে।
এই দীর্ঘ বিরতির পর তিনি যখন ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিত হলেন ঘনবদ্ধ হয়ে, নিশ্চিত হয়ে, তখন যারা সাহিত্যের এই ফিল্ডে বিচরণ করছেন তাদের অনেকে হঠাৎ করে বাংলা সাহিত্যের বড় একটা অংশে নিজেকে বসিয়ে দেওয়া মাসরুর আরেফিনকে নিতে নারাজ। তারা বিবিধ দোষ পেতে থাকেন মাসরুর আরেফিনে। বিনয় পান না, এলিট শ্রেণির, ব্যাংক এমডি ইত্যাদি ইত্যাদি। তা পেতে থাকুন তারা, কিন্তু ২০১৯ সালকে আমার অস্বীকার করার জো নেই কারণ এই বছর দীর্ঘ সাধনার পর সাড়ে চার বছর ধরে লেখা ‘আগস্ট আবছায়া’ বাংলা সাহিত্যে অবতরণ করে। এক ইলিয়াডের অনুবাদ বাদে মাসরুর আরেফিনের সব লেখাই আমার পড়া। সব সাক্ষাৎকারও দেখা (ইউটিউবে যেগুলো পাওয়া যায়)। মাসরুর আরেফিনের শুধু লেখা নয়, তার এই সাহিত্যের এই টোটাল যাত্রাপথ আমার আগ্রহের বিষয়। আমার ধারণা ছিল একজন ব্যাংকার ভালো সাহিত্যিক হতে পারেন না যেহেতু তাকে স্ট্রেসড, স্ট্রাকচার্ড একটা জীবনের ভেতর গেঁথে থাকতে হয়। সেখানে সময় খুব হিসেবের, বেহিসেবী হওয়ার সুযোগ নগণ্য। এইদিক দিয়ে সাহিত্যে মাসরুর আরেফিনের সবল উপস্থিতি আমার ধারণা পাল্টে দিয়েছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য, শহীদুল জহিরের সাহিত্য মাসরুর আরেফিনকে অ্যাট্রাক্ট করে না জেনেও শওকত আলীর ‘পিঙ্গল আকাশ’ আর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ কিংবা মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন এর কোনো উল্লেখ না দেখাটা রীতিমতো কষ্টের ছিল। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে যেভাবে খারিজ করেছেন তাতে ছুরি দিয়ে কেউ আমার হৃদয়ে আঘাত দিয়ে গিয়েছে যেন। এই বইতে ইন্টারেস্টিংলি দেখতে পাওয়া যায় লেখক তার নিজের বই নিয়ে বলতে যতটা না উৎসাহিত তার চেয়ে ঢের উৎসাহী বলতে তার পছন্দের দেশি ও বিদেশি সাহিত্যিকদের নিয়ে। এতটা ইনভলভড আর অ্যাটাচড হয়ে বলা যে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়, ঘোরে পড়ে যেতে হয়। আমি বইটা পড়ার সময় আমার সুবিধার জন্য কোট করছিলাম বই আর লেখকদের নাম। বইয়ের বেলায় ৯৫টা নাম লিখে থেমে যাই আর লেখকদের নাম ১০০-এর মতো লিখে দমে যাই।
যে সব লেখক ও যেসব বই লেখকের পছন্দের তা নিয়ে এমনভাবে বলে গেছেন যে, এমনভাবে উসকে দিয়েছেন আপনি না পড়ে থাকলে ব্যর্থ ভাববেন নিজেকে, লো ফিল করবেন। আবার আপনি চাইলে এই বইয়ের মণি-মুক্তো নিয়ে আাগামী কয়েক বছরের পাঠের একটা দিকরেখা তৈরি করে ফেলতে পারেন যদি বৈশ্বিক লেখক হতে চান, যদি বৈশ্বিক নিবিড় পাঠক হতে চান বা এই যে আমাদের চোখের সামনের পৃথিবী তার ঢাকনাটা খুলে পৃথিবীর ভয়ংকর সত্যটা জানতে চান।
এই বই আমার জন্য এক দুর্দান্ত সংগ্রহ, মাঝে মাঝে উল্টে পাল্টে দেখার জন্যও এবং যেকোনো পাঠকের জন্যও তাই হবে।