তিন সংস্থার শীর্ষদের খুঁজছে ডিবি

জরায়ু ক্যানসারের নকল টিকা নারীদের শরীরে প্রয়োগের সঙ্গে তিনটি বেসরকারি চিকিৎসাসেবা দাতা সংস্থার জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওই তিন সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডা. এ আর খান ফাউন্ডেশনের আবু জাফর, আল নূর ফাউন্ডেশনের কাদের সিদ্দিকী ও পপুলার ভ্যাকসিনেশন সেন্টারের সাইফুল এবং বাবুকে গ্রেপ্তার করতে পারলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাবে। তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন।

এ ছাড়া আমদানি নিষিদ্ধ হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন চোরাই পথে এনে সেগুলোতে পানি মিশিয়ে জরায়ু ক্যানসারের নকল টিকা তৈরির অন্যতম হোতা ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক হিমেলকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এর আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যকরী কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় হিমেলকে।

গত দুই বছরে চক্রটি দেশে চিকিৎসা সেবাদানকারী বেসরকারি কিছু সংস্থার মাধ্যমে ঢাকা ও পাশর্^বর্তী এলাকার দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্প করে ছয় হাজারের বেশি নারীকে নকল টিকা দিয়েছে। এই চক্রের সাইফুল ইসলাম শিপন, ফয়সাল আহমেদ, আল আমিন, নুরুজ্জামান সাগর ও আতিকুল ইসলাম গত বুধবার গ্রেপ্তার হন। এরপর রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের অন্যদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে তারা।

জানতে চাইলে ডিবি তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আনিচ উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তিনটি সংস্থার শীর্ষ চারজনকে খুঁজছি। এই নকল টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমদানি নিষিদ্ধ টিকা কীভাবে দেশে ঢুকেছে। জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধক ‘সারভারিক্স’ টিকা গত তিন বছর বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে না। এরপরও কীভাবে তারা এই টিকা দিয়েছে, সবকিছুই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

থানায় জিডি : ডিবির তদন্তে যখন উঠে আসে নকল টিকা দেওয়ার সঙ্গে এ আর খান ফাউন্ডেশন জড়িত, তখন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. এ আর খান শেরেবাংলা নগর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। ১৭ মার্চ করা ওই জিডিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ডা. এ আর খান ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন থেকে সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারলাম ডা. এ আর খান ফাউন্ডেশনের নাম ব্যবহার করে কিছু কুচক্রী মহল নকল ভ্যাকসিন প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যাদের কার্যক্রমের সঙ্গে ডা. এ আর খান ফাউন্ডেশনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

তবে ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এ আর খান ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি আবু জাফর। তিনি ডা. এ আর খানের মামাতো ভাই বলে পরিচয় দেন। এই আবু জাফরের মাধ্যমেই নকল টিকার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার এ আর খান হাসপাতাল থেকে তিন বস্তা নকল টিকা সরিয়ে ফেলেন আবু জাফর। এ ছাড়া নকল টিকা তৈরির দায়ে গ্রেপ্তার শিপন (২৬) ২০১৭ সাল থেকে এ আর খান ফাউন্ডেশনে চাকরি করছেন।

দারুস সালামের এ আর খান হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকার কার্যক্রম দেখভাল করতেন আবু জাফর। তিনি গাজীপুরে এই কার্যক্রম চালাতেন। হাসপাতালে নিজেকে এ আর খান ফাউন্ডেশনের পরিচালক পরিচয় দিতেন। সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, গত শুক্রবার হাসপতাল থেকে তিন বস্তা টিকা নিয়ে গেছেন জাফর।

নকল টিকা প্রদান ও থানায় জিডির বিষয়ে জানতে ডা. এ আর খানকে ফোন করলে তার ব্যক্তিগত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নকল টিকার কারখানা : ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে টিনের ঘরে নকল টিকার কারখানা তৈরি করেন যুবলীগ নেতা হিমেল। সেখান থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারা দেশে। অনুসন্ধানে এমন তথ্য পেয়েছে ডিবি। হিমেলকে গতকাল রবিবার রাতে কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। আজ সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে। হিমেল আর শিপন মিলে নকল টিকা তৈরি করতেন।