লেক মিশিগানের সমুদ্রতট
কেটিডিডস পরিত্যক্ত নিষ্প্রভ গাছে
আর আমি ভাবছিলাম তারা ছিল সাদা কংকাল
বেহালা বাজাচ্ছিল একজোড়া আঙুলের হাড়ে
কতদিন হলো রেড ইন্ডিয়ানরা এখানে হেঁটেছিল
নরম পায়ে বালির ধারে
কতদিন হলো ইন্ডিয়ানরা এখানে মরে আছে
আর সরে যাওয়া বালি তাদের পরিত্যক্ত করেছিল হাড় থেকে হাড়ে।
মৃত রেড ইন্ডিয়ানরা বালির নিচে...
(কেটিডিডস, এ্যামি লাওলের কবিতা; অনুবাদ : আয়শা ঝর্না)
এ কবিতাটি উল্লেখ করার একটি প্রেক্ষাপট আছে, কারণ গল্পকার ফয়জুল ইসলামের জমিন বইয়ের প্রথম গল্পটিই রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে গল্প, যারা নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, তাদের জমিন দখল করে নিয়েছে শ্বেতাঙ্গরা। এই ভূমিহীন রেড ইন্ডিয়ানরা নিজের জমিন থেকে উচ্ছেদ হতে হতে এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
বঞ্চনা তাদের নিত্যসঙ্গী। তারা তাদের নিজেদের গোষ্ঠীর ঘেরাটোপে থাকতেই পছন্দ করে। ফয়জুল ইসলাম গল্প লেখেন আশির দশক থেকে, কিন্তু প্রকাশ করেন অনেক পরে। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘খোয়াজ খিজিরের সিন্ধুক’ অসম্ভব ভালো এবং আলোচিত একটি গল্পগ্রন্থ, যা পরে পুরস্কৃতও হয়। এ যাবৎ তার পাঁচটি গল্পগ্রন্থ, একটি উপন্যাস এবং এবারের বইমেলায় এই ছোট গল্পের বই জমিন প্রকাশিত হয়েছে।
গল্পকার ফয়জুল ইসলাম একজন ভিন্ন ধরনের কথাকার। অনেকটাই ধ্রুপদি ধাঁচের কিন্তু এ সময়ের কথা বলেন কিংবা পূর্বজন্মের কোনো স্বপ্ন নিয়ে তিনি মেলে ধরেন তার গল্পের ডানা। পাঠক সেই ডানার নিচে বসে তার গল্পগুলোকে নিজেদের করে নেয় অনায়াসে। এটি একজন বড় কথাকারের লক্ষণ।
তাকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উত্তসূরি বলা যায়। সুনিপুণ দক্ষতায় গল্পের জমিন রচিত হতে থাকে, প্রতিটি চরিত্র উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার গল্পগাঁথায়। তারা যেন আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে রক্তমাংসের একজন মানুষ তার সুখ-দুঃখ-বিষণœতা নিয়ে ধরা দেয় পাঠকের কাছে।
জমিন ছোট গল্পের বইটি একটা নির্ভার জমিনের ওপরই রচিত, যার ভিত রয়েছে বিদেশি মাটির আলো হাওয়াতে, তবু যেন এ গল্প গ্লোবাল, এ সংকট সব ভূমিহীন মানুষের গল্পগাঁথা। সব আদিবাসী মানুষের নীরব আর্তনাদ তাদের অস্তিত্বের সংকট এই ভূমি গল্পে লেখক তুলে এনেছেন নিজ দক্ষতায়। এ গল্পটি পড়ে চুপচাপ কিছুটা সময় থমকে যেতে হয়। মনে পড়ে গল্প শুধু গল্প নয়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তিক মানুষের স্ট্রাগলেরও গল্প। রেড ইন্ডিয়ান লিটল বুল যেন ভূমি হারানো সমগ্র আদিবাসীদের প্রতিভূ হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে গিয়াসউদ্দিনও সেই উন্মুল মানুষ, ভাগ্যান্বেষণে সেও নিজের দেশ, মাটি ছেড়ে বহুদূর আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। পিটবুল এক কালোকাক ঘাড়ে নিয়ে ঘোরে, গাঢ় মন্ত্র উচ্চারণে সে ডাকে তার পূর্বপুরুষদের যারা শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন! অসম্ভব ভালো এই গল্পটির বয়ন এবং দৃশ্যকল্প অসম্ভব চিত্রময়।
দ্বিতীয় গল্পটি চোখ। অসাধারণ এক গল্প, যা ছোট গল্পকে অন্যমাত্রার দ্যোতনা এনে দেয়। একজন আর্টিস্টের চোখ হারানোর গল্প কী মায়া জড়ানো, চোখ হারিয়ে একজন আর্টিস্ট সুমিত আর আঁকতে পারছে না। যে কী না প্যারিস, জেনেভা কিংবা ঢাকা যেখানেই পেরেছে চোখের ছবি এঁকেছে। প্যারিসের রাস্তায় বসে গভীর নীল চোখের মেয়েটার পাশে বসে এঁকেছে ট্যুরিস্টদের ছবি। কিন্তু তার পোর্ট্রেটের বেশির ভাগ ছবিই চোখের। কিংবা অভিনেত্রী রেখা গণেশেনের মতো ঝকঝকে এক জোড়া কালো চোখ। এই গল্পটির বিন্যাস অনেকটা কবিতার মতো রূপকল্প, অদ্ভুত তার ভাষা দক্ষতা। কিন্তু সুমিত ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি হারিয়ে ফেলছে, প্রায় অন্ধ হয়ে যাচ্ছে সে। কী অসম্ভব বিষন্ন এই গল্প। কিছুটা সময় চুপচাপ বসে থমকে যেতে হয় এই গল্প পড়ে।
মারিও রুপোকল্লোকে আপনি চেনেন? এই গল্পটির ভিত প্রোথিত হয়েছে সুদূর জেনেভাতে, তবু কেন যেন মন বিষণœ হয়, সেই না দেখা মানুষগুলোর জন্য, এটাই একজন গল্পকারের দক্ষতা। সেখানেই ফয়জুল ইসলাম কথাকার হয়ে ওঠেন। গল্পগুলো বিদেশি জমিন, আলো হাওয়ায় বেড়ে উঠলেও গল্পকার সে গল্পের চরিত্রগুলোকে আপন দক্ষতার পাঠকের কাছে তাদের নিজস্ব উপস্থিতির নিকটেরই বলে জানান দেন। এই গল্প একজন লেখকের, যিনি খুব কম গল্প লেখেন তবে তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গল্পের ডালপালা। কেননা সে তার প্রেমিকার সঙ্গে প্যারিস ছেড়ে চলে গেছে দূরের কোনো শহরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তার প্রেমিকার খোঁজ করতে থাকে লেখক, যখনই সময় পায় কেননা তার অধ্যাপকের কাছে সে মারিওর গল্প শুনেছে। শেষে সে মারিওর প্রেমিকার ফোন পায় নাপোলিতে এসে কোনো গ্রীষ্মের ছুটিতে। মারিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় লেখকের। সেটা বেশ চমকপ্রদ, সাহিত্যের সব বিষয়-আশয় সেখানে ধরা দেয়।
চাঁদ ডাকছে চিতাকাঠ ডাকছে এ গল্পটি সুদূর জেনেভার, সেখানকার নদী, পাহাড় হাতছানি দেয়, পাঠকরাও ভ্রমণ করে লেখকের চোখ দিয়ে দেখে নিতে পারেন জেনেভা। হ্যারিয়েটকে অনেক দিন আগে রেখে চলে এসেছিলেন লেখক। আবার অনেক দিন পর সে জেনেভাতে গিয়ে তার প্রিয় জায়গাগুলোকে খুঁজে বের করে, তার বন্ধুদের খোঁজ করে। চেনা জায়গাগুলো, বন্ধুদের মুখ খোঁজে। পেয়েও যায়। কিন্তু হ্যারিয়েটের জন্য পাঠকের মন বিষণœ হয়ে ওঠে।
জেনেভার হ্যারিয়েট যেন বাঙালি কোনো নারী, তার চলে যাওয়ার পথে অদ্ভুত এক মায়া তৈরি হয়। অনেক বেশি সেনসেটিভ এ গল্পগুলো লেখকের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। বলা যায়, পাঁচটি গল্প একটি করে নভেলার জন্ম দিয়েছে। এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা টের পাবেন প্রস্তুত পাঠক।
বাংলাদেশের ছোট গল্প নিজস্ব জমিন, ভাষা তৈরি করেছে। যে ভাষা জল, জমিন, হাওয়া একান্তই বাংলাদেশের হয়েও বৈশ্বিক। কেননা সব গল্পই বিদেশের মাটিতে প্রোথিত। নান্দনিক প্রচ্ছদের বইটি হাতে নিতেও ভালো লাগে। কথাপ্রকাশ প্রকাশিত বইটির দাম ৩০০ টাকা।